
মুফতি নাজমুল ইসলাম ফারুক
হেবা (الهبة) ও মিরাস (الميراث)—উভয়ই সম্পত্তি হস্তান্তরের সঙ্গে সম্পর্কিত হলেও ইসলামী শরিয়তে এ দুটির প্রকৃতি, সময়, কারণ ও বিধান সম্পূর্ণ ভিন্ন। একজন মুসলমানের জন্য এ পার্থক্য জানা অত্যন্ত জরুরি; কারণ জীবদ্দশায় বৈধভাবে সম্পত্তি হেবা করা শরিয়তসম্মত হলেও মৃত্যুর পর উত্তরাধিকারীদের জন্য আল্লাহ তাআলা যে অংশ নির্ধারণ করেছেন, তা ইচ্ছামতো পরিবর্তন করার অধিকার কারও নেই।
১. হেবা কী?
হেবা (الهبة) ইসলামী শরিয়তে সম্পত্তি হস্তান্তরের একটি স্বীকৃত পদ্ধতি। আরবি ‘হেবা’ শব্দের অর্থ হলো কাউকে কোনো কিছু স্বতঃস্ফূর্তভাবে প্রদান করা। ফিকহের পরিভাষায় হেবা বলতে বোঝায়—কোনো বিনিময় বা প্রতিদানের শর্ত ছাড়াই জীবিত অবস্থায় স্বেচ্ছায় নিজের মালিকানাধীন সম্পত্তি অন্য ব্যক্তির মালিকানায় হস্তান্তর করা।
অর্থাৎ, হেবার মূল উদ্দেশ্য শুধু কাউকে কোনো সম্পত্তি ব্যবহার করার অনুমতি দেওয়া নয়; বরং শরিয়তসম্মত পদ্ধতিতে মালিকানা হস্তান্তর করা। এ কারণে হেবা জীবদ্দশায় সম্পাদিত একটি স্বেচ্ছামূলক মালিকানা হস্তান্তর।
হেবার শরয়ী ভিত্তি
কুরআনুল কারিমে আল্লাহ তাআলা পারস্পরিকভাবে সম্পদ প্রদান ও সদাচরণের ব্যাপারে নির্দেশনা দিয়েছেন। আল্লাহ বলেন—
وَآتَى الْمَالَ عَلَىٰ حُبِّهِ ذَوِي الْقُرْبَىٰ وَالْيَتَامَىٰ وَالْمَسَاكِينَ وَابْنَ السَّبِيلِ وَالسَّائِلِينَ وَفِي الرِّقَابِ
“আর আল্লাহর ভালোবাসায় (তাঁর সন্তুষ্টির জন্য) আত্মীয়স্বজন, এতিম, মিসকিন, মুসাফির, সাহায্যপ্রার্থী ও দাসমুক্তির জন্য সম্পদ দান করে।” —সূরা আল-বাকারা, ২:১৭৭
যদিও আয়াতটি বিশেষভাবে সদকা ও আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য সম্পদ ব্যয়ের প্রসঙ্গেও এসেছে, তবু ইসলামে জীবিত অবস্থায় সম্পদ স্বেচ্ছায় প্রদান করার ব্যাপক নীতিকে এটি সমর্থন করে।
হেবার বৈধতার আরও সুস্পষ্ট প্রমাণ পাওয়া যায় রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সুন্নাহতে। তিনি নিজে সাহাবিদের উপহার গ্রহণ করতেন এবং উপহার দেওয়ার ব্যাপারে উৎসাহিত করতেন। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন—
تَهَادَوْا تَحَابُّوا
“তোমরা একে অপরকে উপহার দাও; এতে তোমাদের মধ্যে ভালোবাসা বৃদ্ধি পাবে।”
এ হাদিসটি আল-আদাবুল মুফরাদ, হাদিস ৫৯৪-এ বর্ণিত হয়েছে। হাদিসটির অর্থ হেবা ও উপহারের সামাজিক ও নৈতিক গুরুত্বকে স্পষ্ট করে।
হেবার প্রথম বৈশিষ্ট্য: জীবদ্দশায় সম্পাদন
হেবা মূলত জীবিত অবস্থায় সম্পাদিত হয়। একজন ব্যক্তি জীবিত থাকা অবস্থায় নিজের মালিকানাধীন সম্পত্তি অন্যকে হেবা করতে পারেন। কিন্তু মৃত্যুর পর তার সম্পত্তি কারা পাবে—এটি আর হেবার বিষয় থাকে না; তখন মিরাসের বিধান কার্যকর হয়।
আল্লাহ তাআলা উত্তরাধিকারীদের অংশ নির্ধারণ করে বলেছেন—
يُوصِيكُمُ اللَّهُ فِي أَوْلَادِكُمْ
“আল্লাহ তোমাদের সন্তানদের ব্যাপারে তোমাদের নির্দেশ দিচ্ছেন…” —সূরা আন-নিসা, ৪:১১
অতএব, জীবদ্দশায় বৈধভাবে সম্পন্ন হেবা এবং মৃত্যুর পর কার্যকর মিরাস—দুটি পৃথক শরয়ী ব্যবস্থা।
হেবার দ্বিতীয় বৈশিষ্ট্য: বিনিময়হীন প্রদান
হেবার মূল বৈশিষ্ট্য হলো এটি সাধারণভাবে কোনো বিনিময়ের বিনিময়ে নয়। দাতা নিজের সম্পত্তি স্বেচ্ছায় গ্রহীতাকে প্রদান করেন। তবে ইসলামী ফিকহে হিবা বিল-ইওয়াজ (هبة بالعوض) বা প্রতিদানযুক্ত হেবার পৃথক আলোচনা রয়েছে। তাই “হেবা কখনোই কোনো প্রতিদানযুক্ত হতে পারে না”—এমন সার্বিক বক্তব্য না দিয়ে বলা অধিক নির্ভুল যে সাধারণ হেবার প্রকৃতি হলো বিনিময়হীন স্বেচ্ছামূলক দান।
হেবার তৃতীয় বৈশিষ্ট্য: মালিকানা হস্তান্তর
হেবার কেন্দ্রীয় বিষয় হলো মালিকানা (ملكية)। কোনো ব্যক্তিকে শুধু কোনো সম্পত্তি ব্যবহার করার অনুমতি দেওয়া আর তাকে সম্পত্তির মালিক করে দেওয়া এক বিষয় নয়।
হানাফি ফিকহে হেবার পূর্ণতা ও কার্যকারিতার ক্ষেত্রে কবজা (قبض) বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। অর্থাৎ, দাতা হেবা করার পর গ্রহীতার কাছে সম্পত্তির দখল ও নিয়ন্ত্রণ বাস্তবভাবে হস্তান্তরিত হওয়ার বিষয়টি বিবেচ্য।
এ বিষয়ে সহিহ বুখারিতে উম্মুল মুমিনীন হযরত আয়িশা রাদিয়াল্লাহু আনহা থেকে বর্ণিত হয়েছে যে, আবু বকর সিদ্দিক রাদিয়াল্লাহু আনহু তাঁর জীবদ্দশায় আয়িশা রাদিয়াল্লাহু আনহাকে কিছু সম্পদ দেওয়ার ইচ্ছা প্রকাশ করেছিলেন; পরে তিনি যখন মৃত্যুশয্যায় ছিলেন, তখন বলেন—যদি তুমি তা গ্রহণ করে দখলে নিতে, তাহলে তা তোমার হতো; কিন্তু যেহেতু তুমি তা গ্রহণ করে দখলে নাওনি, তাই এখন তা উত্তরাধিকারীদের সম্পদ। —সুনান আবু দাউদ, হাদিস ৩৫৪২।
এই ঘটনা হেবার ক্ষেত্রে কবজা ও বাস্তব মালিকানা হস্তান্তরের গুরুত্ব বোঝাতে ফিকহের আলোচনায় বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।
সারকথা
সুতরাং হেবা হলো—জীবিত অবস্থায়, স্বেচ্ছায়, সাধারণত বিনা বিনিময়ে, নিজের মালিকানাধীন সম্পত্তি অন্যের মালিকানায় শরিয়তসম্মতভাবে হস্তান্তর করা। হেবার ক্ষেত্রে শুধু দানের ঘোষণা যথেষ্ট কি না, বরং ইজাব-কবুল, মালিকানা ও কবজা—এসব বিষয়ও ফিকহের আলোচনায় গুরুত্বপূর্ণ।
এ কারণে “সম্পত্তি ব্যবহার করতে দেওয়া”, “ভোগাধিকার দেওয়া” এবং “সম্পত্তির মালিকানা হেবা করা”—তিনটি বিষয়কে একই অর্থে ব্যবহার করা শরয়ী দৃষ্টিকোণ থেকে যথার্থ নয়। বিশেষত কোনো ব্যক্তি যদি সম্পত্তির মালিকানা অন্যের কাছে হস্তান্তর করার পর নিজের জন্য আজীবন ভোগাধিকার সংরক্ষণ করেন, তাহলে সেটিকে সাধারণ হেবা হিসেবে ধরে নেওয়ার আগে এর পৃথক ফিকহি প্রকৃতি বিশ্লেষণ করা জরুরি।
২. মিরাস কী?
মিরাস হলো কোনো ব্যক্তি মৃত্যুবরণ করার পর তাঁর রেখে যাওয়া সম্পত্তিতে শরিয়ত নির্ধারিত উত্তরাধিকারীদের অধিকার প্রতিষ্ঠিত হওয়া।
ফকীহদের পরিভাষায় মিরাস
ফকীহদের পরিভাষায় মিরাস (الميراث) বলতে বোঝায়—
هُوَ اسْتِحْقَاقُ الْوَارِثِ مَالَ الْمُوَرِّثِ بَعْدَ مَوْتِهِ بِسَبَبٍ مِنْ أَسْبَابِ الْإِرْثِ
অর্থাৎ, উত্তরাধিকারীর জন্য উত্তরাধিকারসূত্রে মৃত ব্যক্তির সম্পত্তির ওপর অধিকার প্রতিষ্ঠিত হওয়াকে মিরাস বলা হয়।
আল্লাহ তাআলা বলেন—
> يُوصِيكُمُ اللَّهُ فِي أَوْلَادِكُمْ
“আল্লাহ তোমাদের সন্তানদের সম্পর্কে নির্দেশ দিচ্ছেন…” —সূরা আন-নিসা, ৪:১১
এই আয়াতেই সন্তানদের উত্তরাধিকার অংশসহ বিভিন্ন উত্তরাধিকার বিধান বর্ণিত হয়েছে।
অতএব মিরাস মানুষের তৈরি কোনো ঐচ্ছিক ব্যবস্থা নয়; এটি আল্লাহ তাআলার নির্ধারিত বিধান।
৩. হেবা ও মিরাসের মৌলিক পার্থক্য:
হেবা ও মিরাস—উভয়ই সম্পত্তির মালিকানা ও অধিকার-সংক্রান্ত ইসলামী বিধানের গুরুত্বপূর্ণ দুটি অধ্যায়। তবে দুটির প্রকৃতি, কার্যকর হওয়ার সময়, ভিত্তি, গ্রহীতা এবং আইনগত-শরয়ী পরিণতি এক নয়। তাই হেবাকে মিরাসের বিকল্প হিসেবে দেখার কোনো সুযোগ নেই।
হেবা হলো কোনো ব্যক্তি জীবিত অবস্থায় স্বেচ্ছায় ও বিনা বিনিময়ে নিজের মালিকানাধীন সম্পত্তি অন্য ব্যক্তির কাছে হস্তান্তর করা। এতে দাতার ইচ্ছা, গ্রহীতার গ্রহণ এবং শরিয়তসম্মতভাবে দখল বা কবজা (قبض) প্রতিষ্ঠা গুরুত্বপূর্ণ। অর্থাৎ হেবার মূল বৈশিষ্ট্য হলো—এটি ব্যক্তির জীবদ্দশায় সম্পন্ন হয় এবং বৈধভাবে সম্পন্ন হলে সম্পত্তির মালিকানা গ্রহীতার কাছে চলে যায়।
অন্যদিকে মিরাস হলো কোনো ব্যক্তি মৃত্যুবরণ করার পর তার রেখে যাওয়া সম্পত্তিতে শরিয়ত নির্ধারিত উত্তরাধিকারীদের অধিকার প্রতিষ্ঠিত হওয়া। এখানে মৃত ব্যক্তির ব্যক্তিগত ইচ্ছা নয়; বরং কুরআন ও সুন্নাহর বিধানই মূল ভিত্তি। আল্লাহ তাআলা বলেন—
«يُوصِيكُمُ اللَّهُ فِي أَوْلَادِكُمْ
“আল্লাহ তোমাদের সন্তানদের ব্যাপারে তোমাদের নির্দেশ দিচ্ছেন।” —সূরা আন-নিসা, ৪:১১»
অতএব, হেবায় দাতা জীবিত অবস্থায় শরিয়তসম্মতভাবে কাউকে সম্পত্তির মালিক বানাতে পারেন; কিন্তু মিরাসে মৃত্যুর পর কারা উত্তরাধিকারী হবে এবং কে কতটুকু পাবে—তা শরিয়ত নির্ধারণ করে। এ কারণেই মিরাসের অংশকে ব্যক্তিগত পছন্দ-অপছন্দের ভিত্তিতে কমানো-বাড়ানোর অধিকার কারও নেই।
হেবা ও মিরাসের আরেকটি মৌলিক পার্থক্য হলো গ্রহীতার পরিচয়। হেবায় দাতা শরিয়তসম্মত সীমার মধ্যে যাকে ইচ্ছা সম্পত্তি দিতে পারেন। তিনি সন্তান, আত্মীয় কিংবা অন্য কোনো ব্যক্তিকে হেবা করতে পারেন। কিন্তু মিরাসের ক্ষেত্রে উত্তরাধিকারী নির্ধারিত হয় রক্তসম্পর্ক, বৈবাহিক সম্পর্ক ও শরিয়তের অন্যান্য স্বীকৃত কারণের ভিত্তিতে। ফলে উত্তরাধিকারী হওয়া ব্যক্তির ব্যক্তিগত পছন্দ বা মৃত ব্যক্তির পছন্দের ওপর নির্ভরশীল নয়।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য হলো অংশের প্রকৃতি। হেবার ক্ষেত্রে মিরাসের মতো নির্দিষ্ট ফরজ অংশ নেই। একজন ব্যক্তি জীবিত অবস্থায় নিজের মালিকানাধীন সম্পত্তি শরিয়তসম্মতভাবে কাউকে হেবা করতে পারেন। পক্ষান্তরে মৃত্যুর পর মিরাস বণ্টনের ক্ষেত্রে আল্লাহ তাআলা বিভিন্ন উত্তরাধিকারীর অংশ নির্ধারণ করে দিয়েছেন। কুরআনে পিতা-মাতা, সন্তান ও স্বামী-স্ত্রীর অংশ বিস্তারিতভাবে বর্ণিত হয়েছে। এরপর আল্লাহ তাআলা বলেন—
«تِلْكَ حُدُودُ اللَّهِ
“এগুলো আল্লাহর নির্ধারিত সীমারেখা।”
—সূরা আন-নিসা, ৪:১৩»
এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—জীবিত অবস্থায় প্রকৃত ও বৈধ হেবা সম্পন্ন হয়ে গেলে সেই সম্পত্তি সাধারণত দাতার মৃত্যুকালীন সম্পত্তির অন্তর্ভুক্ত থাকে না। ফলে তা মিরাসের সম্পত্তি হিসেবে বণ্টিত হয় না। কিন্তু কোনো ব্যক্তি জীবদ্দশায় কার্যকর হেবা না করে শুধু মৃত্যুর পর সম্পত্তি কারা পাবে সে বিষয়ে নির্দেশ দিয়ে গেলে বিষয়টি হেবার নয়; বরং ওসিয়ত ও মিরাসের বিধানের সঙ্গে সম্পর্কিত হয়ে যায়।
এ কারণেই জীবিত অবস্থায় হেবা এবং মৃত্যুর পর মিরাস—দুটি পৃথক শরয়ী ব্যবস্থা। হেবা করার মাধ্যমে কেউ নিজের জীবদ্দশায় সম্পত্তির মালিকানা বৈধভাবে অন্যের কাছে হস্তান্তর করতে পারেন; কিন্তু মৃত্যুর পর অবশিষ্ট সম্পত্তির ওপর উত্তরাধিকারীদের যে অধিকার সৃষ্টি হয়, তা আল্লাহ তাআলার নির্ধারিত বিধান অনুযায়ী প্রতিষ্ঠিত হয়।
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উত্তরাধিকার বণ্টনের ক্ষেত্রে নির্ধারিত অধিকার যথাযথভাবে দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন। তিনি বলেছেন—
«أَلْحِقُوا الْفَرَائِضَ بِأَهْلِهَا، فَمَا بَقِيَ فَلِأَوْلَى رَجُلٍ ذَكَرٍ»
“নির্ধারিত অংশগুলো তাদের প্রাপ্যদের দিয়ে দাও; এরপর যা অবশিষ্ট থাকে তা নিকটতম পুরুষ আত্মীয়ের জন্য।” —সহিহ আল-বুখারি, হাদিস ৬৭৩২; সহিহ মুসলিম, হাদিস ১৬১৫a।
সুতরাং ইসলামের দৃষ্টিতে হেবা হলো জীবদ্দশার মালিকানা হস্তান্তরের বিধান, আর মিরাস হলো মৃত্যুর পর সম্পত্তি বণ্টনের বিধান। একজন ব্যক্তি জীবিত অবস্থায় নিজের সম্পত্তি নিয়ে শরিয়তসম্মত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে পারেন; কিন্তু সেই সিদ্ধান্ত এমন হতে পারে না যার উদ্দেশ্য হয় আল্লাহ তাআলার নির্ধারিত মিরাসের অধিকারকে অন্যায়ভাবে নস্যাৎ করা বা কোনো বৈধ উত্তরাধিকারীকে বঞ্চিত করা।
এই মৌলিক পার্থক্যটি ২০২৬ সালের সম্পত্তি হস্তান্তর-সংক্রান্ত নতুন আইন বিশ্লেষণের ক্ষেত্রেও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ মালিকানা হস্তান্তর, আজীবন ভোগাধিকার সংরক্ষণ, হেবা এবং মিরাস—এই চারটি ধারণাকে এক করে দেখলে শরিয়ত ও আইনের উভয় ক্ষেত্রেই বিভ্রান্তি সৃষ্টি হতে পারে।
৪. হেবা করা কি বৈধ?
হ্যাঁ। ইসলামে বৈধভাবে হেবা করা সম্পূর্ণ অনুমোদিত।
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিজে সাহাবিদের পারস্পরিক উপহার আদান-প্রদানে উৎসাহিত করেছেন।
হযরত আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন—
«تَهَادَوْا تَحَابُّوا»
“তোমরা পরস্পর উপহার আদান-প্রদান করো, এতে তোমাদের মধ্যে ভালোবাসা সৃষ্টি হবে।”
এটি আল-আদাবুল মুফরাদ, হাদিস ৫৯৪-এ বর্ণিত; হাদিসটির সনদ নিয়ে মুহাদ্দিসদের মধ্যে আলোচনা রয়েছে।
তবে হেবা শুধু ভালোবাসা প্রকাশের বিষয় নয়; এটি একটি মালিকানা-হস্তান্তরকারী চুক্তি। তাই এর ফিকহি শর্তও রয়েছে।
৫. হেবায় কবজার গুরুত্ব:
হেবার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো কবজা (قبض)।
দাতা শুধু মুখে বললেন, “আমি এই জমি তোমাকে দিয়ে দিলাম”—এতেই প্রত্যেক পরিস্থিতিতে হেবা সম্পূর্ণ হয়ে যায় না। সম্পত্তির প্রকৃতি ও ফিকহি বিধান অনুযায়ী গ্রহীতার কাছে দখল/কবজা হস্তান্তরের বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ।
বিশেষ করে হানাফি ফিকহে হেবা সম্পূর্ণ হওয়ার ক্ষেত্রে ইজাব, কবুল ও কবজা গুরুত্বপূর্ণ আলোচ্য বিষয়।
সুতরাং—দলিলের পাশাপাশি বাস্তব মালিকানা ও কবজার অবস্থাও দেখতে হবে।
৬. সন্তানদের মধ্যে হেবা করার ক্ষেত্রে ন্যায়নীতি:
বাবা-মা সন্তানদের হেবা করতে পারেন। কিন্তু সন্তানদের মধ্যে অন্যায় পক্ষপাত সৃষ্টি করা শরিয়তের আদর্শের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
নু‘মান ইবনু বশীর রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, তাঁর পিতা তাঁকে একটি বিশেষ দান করেছিলেন। তখন তাঁর মা রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে সাক্ষ্য দেওয়ার অনুরোধ করেন।
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জিজ্ঞেস করলেন—
«أَكُلَّ وَلَدِكَ نَحَلْتَ مِثْلَ هَذَا؟»
“তুমি কি তোমার প্রত্যেক সন্তানকে এর অনুরূপ দিয়েছ?”
তিনি বললেন, না।
তখন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন—
«فَاتَّقُوا اللَّهَ وَاعْدِلُوا بَيْنَ أَوْلَادِكُمْ»
“আল্লাহকে ভয় করো এবং তোমাদের সন্তানদের মধ্যে ন্যায়বিচার করো।” —সহিহ আল-বুখারি, হাদিস ২৫৮৭; সহিহ মুসলিম, হাদিস ১৬২৩।
এ হাদিস সন্তানদের মধ্যে হেবা প্রদানের ক্ষেত্রে ন্যায়নীতির অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দলিল।
৭. মিরাসের অংশ মানুষ নির্ধারণ করতে পারে না:
মৃত্যুর পর কার কত অংশ হবে—এটি কোনো বাবা, মা, সন্তান, আত্মীয় বা সমাজ নিজের ইচ্ছামতো নির্ধারণ করতে পারে না।
আল্লাহ তাআলা বলেন—
> تِلْكَ حُدُودُ اللَّهِ
“এগুলো আল্লাহর নির্ধারিত সীমারেখা।” —সূরা আন-নিসা, ৪:১৩
এর পরের আয়াতে আল্লাহ তাআলা তাঁর বিধান অমান্য করার ব্যাপারে কঠোর সতর্কবাণী উচ্চারণ করেছেন।
অতএব মিরাসের বিধানকে সামাজিক পছন্দ, পারিবারিক আবেগ বা ব্যক্তিগত ইচ্ছা দিয়ে পরিবর্তন করা বৈধ নয়।
৮. কন্যার উত্তরাধিকার:
আল্লাহ তাআলা কন্যাদের উত্তরাধিকারও সুস্পষ্টভাবে নির্ধারণ করেছেন।
> فَإِنْ كُنَّ نِسَاءً فَوْقَ اثْنَتَيْنِ فَلَهُنَّ ثُلُثَا مَا تَرَكَ ۖ وَإِنْ كَانَتْ وَاحِدَةً فَلَهَا النِّصْفُ
“তারা যদি দুইয়ের অধিক কন্যা হয়, তবে তাদের জন্য পরিত্যক্ত সম্পত্তির দুই-তৃতীয়াংশ; আর যদি একজন কন্যা হয়, তবে তার জন্য অর্ধেক।”—সূরা আন-নিসা, ৪:১১
তবে বাস্তব মিরাসের হিসাব শুধু একজন উত্তরাধিকারীর উপস্থিতির ওপর নির্ভর করে না। মৃত ব্যক্তির পিতা-মাতা, স্বামী/স্ত্রী, পুত্র-কন্যা এবং অন্যান্য ওয়ারিশ কারা জীবিত আছেন—তার ওপর হিসাব পরিবর্তিত হয়।
৯. মিরাস বণ্টনের আগে কী হবে?
কোনো ব্যক্তি মারা গেলে তাঁর সম্পত্তি সরাসরি উত্তরাধিকারীদের মধ্যে ভাগ করা হয় না। প্রথমে মৃত ব্যক্তির সম্পত্তির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট অধিকারগুলো নিষ্পত্তি করতে হয়।
সাধারণভাবে— কাফন-দাফনের প্রয়োজনীয় ব্যয় , ঋণ , বৈধ ওসিয়ত এরপর মিরাস বণ্টন।
ওসিয়তের ক্ষেত্রেও শরিয়ত সীমা নির্ধারণ করেছে।
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন
«الثُّلُثُ، وَالثُّلُثُ كَثِيرٌ»
“এক-তৃতীয়াংশ; আর এক-তৃতীয়াংশও অনেক।”
—সহিহ আল-বুখারি, হাদিস ২৭৪২; সহিহ মুসলিম, হাদিস ১৬২৮।
অর্থাৎ সাধারণভাবে এক-তৃতীয়াংশ পর্যন্ত ওসিয়তের সুযোগ রয়েছে, তবে ওয়ারিশের অধিকার সংক্রান্ত পৃথক বিধানও প্রযোজ্য।
১০. “কোনো ওয়ারিশের জন্য ওসিয়ত নেই”
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন—
> «إِنَّ اللَّهَ قَدْ أَعْطَى كُلَّ ذِي حَقٍّ حَقَّهُ، فَلَا وَصِيَّةَ لِوَارِثٍ»
“নিশ্চয়ই আল্লাহ প্রত্যেক হকদারকে তার অধিকার দিয়েছেন; অতএব কোনো ওয়ারিশের জন্য ওসিয়ত নেই।” —সুনান আবু দাউদ, হাদিস ২৮৭০; জামে‘ আত-তিরমিজি, হাদিস ২১২০; সুনান ইবন মাজাহ, হাদিস ২৭১৩।
এই হাদিস সম্পত্তি-ব্যবস্থাপনার একটি গুরুত্বপূর্ণ মূলনীতি শিক্ষা দেয়—মৃত্যুর পর শরিয়ত যাকে যে অধিকার দিয়েছে, তা অন্যায়ভাবে বাতিল করা যাবে না।
১১. তাহলে জীবিত অবস্থায় সব সম্পত্তি হেবা করা যাবে?
একজন ব্যক্তি জীবিত অবস্থায় তাঁর মালিকানাধীন সম্পত্তি শরয়ী নিয়মে হেবা করতে পারেন। কিন্তু এখানে উদ্দেশ্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
যদি উদ্দেশ্য হয়— “আমি জীবিত থাকা অবস্থায় প্রকৃতভাবে সম্পত্তি দিয়ে দিচ্ছি।”
তাহলে সেটি হেবার আওতায় আসতে পারে। কিন্তু যদি উদ্দেশ্য হয়—“আমার মৃত্যুর পর অমুক ওয়ারিশ যেন কিছু না পায়; তাই এখন শুধু কাগজে সম্পত্তি দিয়ে রাখছি।”
তাহলে বিষয়টি অত্যন্ত গুরুতর। কারণ এটি কার্যত শরিয়তের মিরাস বিধানকে পাশ কাটানোর কৌশলে পরিণত হতে পারে।
১২. হেবা ও মিরাসের মাঝখানে ‘উদ্দেশ্য’ একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়:
একই দলিল বাহ্যিকভাবে বৈধ মনে হলেও এর প্রকৃত উদ্দেশ্য ভিন্ন হতে পারে।
তাই ফিকহে শুধু বাহ্যিক শব্দ নয়, চুক্তির প্রকৃতি ও বাস্তবতাও গুরুত্বপূর্ণ।
“হেবা” নাম দিলেই হেবা হয় না।
দলিলের প্রকৃত শর্ত, মালিকানা, কবজা, অধিকার এবং উদ্দেশ্য পরীক্ষা করতে হবে।
বিশেষ করে এমন ব্যবস্থায় যেখানে দাতা বলেন—
“সম্পত্তি তোমার নামে দিলাম, কিন্তু আমি জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত এর সবকিছু নিজের মতো ব্যবহার করব এবং তুমি আমার মৃত্যুর আগে কার্যত কোনো মালিকানাগত অধিকার প্রয়োগ করতে পারবে না।”
তখন সেটি সাধারণ হেবার সঙ্গে অভিন্ন কি না—তা নির্দিষ্ট দলিলের শর্ত ও ফিকহি কাঠামো দেখে বিচার করতে হবে।
উপসংহার:
হেবা হলো জীবিত মানুষের স্বেচ্ছায় সম্পত্তি দেওয়ার অধিকার; মিরাস হলো মৃত ব্যক্তির সম্পত্তিতে আল্লাহ নির্ধারিত উত্তরাধিকারীদের অধিকার।
একটি মানুষের ইচ্ছার সঙ্গে সম্পর্কিত; অন্যটি আল্লাহর নির্ধারিত বিধানের সঙ্গে সম্পর্কিত।
তাই একজন মুসলমানের সম্পত্তি-ব্যবস্থাপনার মূলনীতি হওয়া উচিত— জীবিত অবস্থায় হেবা করো—কিন্তু হেবাকে মিরাসের বিকল্প বানিও না।
সম্পত্তি দাও—কিন্তু আল্লাহর নির্ধারিত অধিকার নষ্ট করো না।
দলিল করো—কিন্তু দলিলের চেয়েও শরিয়তের সীমারেখাকে বড় মনে করো।
সবশেষে মনে রাখা দরকার—
সম্পত্তির মালিক মানুষ হতে পারে;
কিন্তু মিরাসের বিধানদাতা আল্লাহ।
মানুষ সম্পত্তি হস্তান্তর করতে পারে;
কিন্তু আল্লাহর নির্ধারিত অধিকার বাতিল করতে পারে না।
লেখক, প্রাবন্ধিক ও ইসলামি গবেষক
সহ সুপার, আল ফালাহ দাখিল মাদ্রাসা
পশ্চিম দৌলতপুর, সোনাইমুড়ী, নোয়াখালী
Reporter Name 

























