Dhaka ০৭:৫৭ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ০৯ জুলাই ২০২৬, ২৫ আষাঢ় ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
শিরনাম:
১৫ মিনিটে ৩ গোল দিয়ে আর্জেন্টিনার বিজয় বারুইপুর কাণ্ডে মোমবাতি হাতে শত শত মানুষের প্রতিবাদ, রাজনীতি নয়- দোষীর ফাঁসি চাই। দিনাজপুর বীরগঞ্জে চিরনিদ্রায় শায়িত হলেন বীর মুক্তিযোদ্ধা মোফাজ্জাল হোসেন অধ্যাপক আবুল কাসেম ফজলুল হক ছিলেন সহজ-সরল, কৃষক-শ্রমিক, মজলুম এবং মেহনতি মানুষের মুক্তির কণ্ঠস্বর ও আলোকবর্তিকা নরসিংদীর গ্রীন লাইফ (প্রা:)হাসপাতালে মোবাইল কোর্ট। অর্থ দন্ড,এক্সরে কক্ষটি সিলগালা নবীনগরে স্কুলকক্ষে অভিযান, মাদক সেবনের অভিযোগে আটক ১ দেশকে বাঁচাতে প্রগতিশীল সাংবাদিকদের লেখনী গুরুত্বপূর্ণ ভুমিকা রাখবে-মহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেল টেকনাফে কোস্ট গার্ডের বিশেষ অভিযানে আগ্নেয়াস্ত্র, গোলাবারুদ ও গান পাউডার উদ্ধার তৃণমূলের প্রতিবাদ মিছিলে সহিত বিজেপি কর্মীদের সংঘর্ষ ও চোর চোর স্লোগান টানা বর্ষণে মুক্তাগাছা শহরে জলাবদ্ধতা, চরম দুর্ভোগে জনজীবন
বিজ্ঞাপন :
জেলা-উপজেলা ও বিভাগীয় চীফ নিয়োগ দেয়া হচ্ছে। সাংবাদিকতায় আগ্রহীরা দ্রুত যোগাযোগ করুন। পরীক্ষামূলক সম্প্রচার ও নিবন্ধন প্রক্রিয়াধীন । সম্পদক-ইমদাদুল হক তৈয়ব-01711576603, সিভি পাঠান এই ইমেইলে- editor.manobjibon@gmail.com

অধ্যাপক আবুল কাসেম ফজলুল হক ছিলেন সহজ-সরল, কৃষক-শ্রমিক, মজলুম এবং মেহনতি মানুষের মুক্তির কণ্ঠস্বর ও আলোকবর্তিকা

  • Reporter Name
  • সময়: ১০:২৯:৫৫ অপরাহ্ন, বুধবার, ৮ জুলাই ২০২৬
  • ১৮ Time View

এম এ আলীম সরকার :

 

অধ্যাপক আবুল কাসেম ফজলুল হক ছিলেন একজন সহজ-সরল সাদামাটা জীবনযাপনে অভ্যস্ত, বিনয়ী এবং মানবপ্রেমী মানুষ।

 

অধ্যাপক আবুল কাসেম ফজলুল হক ১৯৪০ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর কিশোরগঞ্জ জেলার পাকুন্দিয়া গ্রামের সম্ভ্রান্ত পন্ডিত পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা মুহাম্মদ আবদুল হাকিম, মা জাহানারা খাতুন এবং তাঁর স্ত্রী ফরিদা প্রধান। তাঁর দুই সন্তানের নাম যথাক্রমে শুচিতা শরমিন ও ফয়সল আরেফিন দীপন। তাঁর মেয়ে শুচিতা শরমিন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উন্নয়ন অধ্যয়ন বিভাগের অধ্যাপক (সাবেক বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম নারী উপাচার্য) হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন । ছেলে ফয়সল আরেফিন দীপন জাগৃতি প্রকাশনীর স্বত্বাধিকারী ছিলেন। ২০১৫ সালের ৩১ অক্টোবর দীপনকে দুবৃত্তরা হত্যা করে। যেদিন দীপন ভাইকে হত্যা করে সেদিন আমি স্যারকে সান্ত্বনা দেওয়ার জন্য বাসায় গিয়েছিলাম। স্যার আমাকে দেখেই বলে যে “আলীম’ দেশতো অন্ধকারের দিকে যাচ্ছে তুমি আলোর মুখ দেখাবে কিভাবে?” তখন আমি বললাম স্যার আজকের দিনে এসব কথা থাক। সেদিনও দেখেছি তিনি সন্তানের কথা বলেননি, দেশের কথা, জনগণের কথা বলেছেন। তিনি ছেলে হত্যার বিচার চাননি বলেছিলেন “রাষ্ট্রের শুভবুদ্ধির উদয় হোক”। আসলে স্যার ছিলেন সাম্প্রতিক সময়ের মহামানব। তাঁর মতো মহৎ হৃদয়ের মানুষ

বর্তমান বিশ্বে বিরল।

 

অধ্যাপক আবুল কাসেম ফজলুল হক ১৯৫৯ খ্রিষ্টাব্দে ময়মনসিংহ জিলা স্কুল থেকে প্রবেশিকা পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। ১৯৬১ খ্রিষ্টাব্দে আনন্দমোহন কলেজ থেকে বিজ্ঞানে উচ্চমাধ্যমিক পাস করেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ১৯৬৫ সালে তিনি স্নাতক (সম্মান) এবং ১৯৬৬ সালে একই বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতকোত্তর পাশ করেন। শিক্ষাজীবনে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র থাকাকালীন তিনি মুনির চৌধুরী, আহমদ শরীফ, হুমায়ুন আজাদ, নীলিমা ইব্রাহিমের সংস্পর্শে আসেন এবং প্রগতিশীল ভাবধারায় নিজেকে যুক্ত করেন।

 

শৈশব থেকেই তিনি দেশ ও দেশের মানুষকে নিয়ে ভাবতেন। চতুর্থ শ্রেণিতে থাকাকালীন ভাষা আন্দোলনের সময় অন্যদের সাথে তিনিও “রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই , নুরুল আমিনের কল্লা চাই” এই স্লোগান দেন। তখন থেকেই তাঁর রাজনৈতিক জীবনের সূচনা। ছাত্রজীবনে ছাত্র ইউনিয়ন করতেন এবং পরবর্তীতে মাও সেতুঙের আদর্শে অনুপ্রাণিত হন।

আবুল কাসেম ফজলুল হক ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগে দীর্ঘ চার দশক শিক্ষকতা করেছেন। তিনি তাঁর লেখা ও কথায় কৃষক-শ্রমিক, মজলুম ও মেহনতির মানুষের মুক্তির কথা লিখেছেন । তিনি মানুষের মধ্যে শুভবোধের জাগরণ কামনা করেছেন। তিনি জনগণকে শ্রদ্ধা করেছেন এবং কাউকে তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করেননি। তিনি সবাইকে আপন মনে করে নিতেন নিজের সন্তানের মতো। তাঁর বাসায় থেকে কেউ না খেয়ে আসতে পারতো না। তাঁর অতিথিপরায়ণতা ছিল অতুলনীয়। দীপন ভাই মারা যাওয়ার পর থেকে আমাকে সন্তানের মতো ভালোবাসতেন। আমি আমার বাবা-মার চেয়ে বেশি ভালোবাসা পেয়েছি। স্যার আমার পিতৃসমতুল্য ছিল। স্যারের চিন্তা-চেতনায় ও আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে আমি ২০০৬ সাল থেকে স্যারের সান্নিধ্য পেয়েছি। এটা আমার জীবনের সবচেয়ে বড় পাওয়া। স্যার আমাকে লেখার জন্য সবসময় উৎসাহ দিতেন।

আরও পড়ুনঃ  বগুড়ায় গড়ে উঠছে সামরিক ড্রোন কারখানা, তিন বাহিনীর আধুনিকায়নে বড় পরিকল্পনা

তিনি ‘ লোকায়ত নামক একটি মননশীল পত্রিকা ১৯৮২ খ্রিষ্টাব্দ থেকে সম্পাদনা করছেন। একুশটিরও অধিক গ্রন্থের প্রণেতা অধ্যাপক আবুল কাসেম ফজলুল হক। নজরুল রচনাবলীর সম্পাদনা পরিষদের সদস্য হিসাবেও দায়িত্ব পালন করেছেন। পত্র-পত্রিকায় তিনি নিয়মিত কলাম লিখেছেন। তিনি ২০০০ সাল থেকে ২০১৩ সাল পর্যন্ত স্বদেশ চিন্তা সংঘের সভাপতির দায়িত্ব পালন করেছেন। এই সংগঠনটিকে সৃষ্টি করেছিলেন বাংলাদেশের প্রধান মুক্তচিন্তক আহমদ শরীফ। এছাড়াও এ সংগঠনটি ‘বাংলাদেশের মুক্তি ও উন্নতির কর্মনীতি আটাশ দফা’ ১ জানুয়ারি, ২০০৫ থেকে প্রচার করে যেটির রচয়িতা ছিলেন তিনি। তাঁর স্বপ্ন ছিল ২৮ দফার পর ওপর একটি নতুন রাজনৈতিক দল গড়ে উঠবে এবং নতুন নেতৃত্ব সৃষ্টি হবে। তাঁর আটাশ দফার ওপর ভিত্তি করেই বাংলাদেশ গণমুক্তি পার্টি (বিজিপি) নামে একটি রাজনৈতিক দল আত্মপ্রকাশ করে ২০২৩ সালের ২৫ আগস্ট। তিনি নিজেই এ পার্টি ঘোষণা করেন এবং তাত্ত্বিক ও প্রধান উপদেষ্টা হিসেবে ছিলেন। ২০২৩ সালের ৬ অক্টোবর জাতীয় প্রেসক্লাবে বাংলাদেশ গণমুক্তি পার্টির এক আলোচনা সভায় ২৮ দফার রূপরেখাকে সর্বজনীন গণতন্ত্র হিসেবে রূপদান করা হয়। অন্তর্বর্তীকালীন সরকার তাকে বাংলা একাডেমির সভাপতি হিসেবে নিয়োগ প্রদান করে।

তার সম্পাদিত গ্রন্থের মধ্যে রয়েছে মুক্তিসংগ্রাম (১৯৭২); কালের যাত্রার ধ্বনি (১৯৭৩); একুশে ফেব্রুয়ারি আন্দোলন (১৯৭৬); উনিশশতকের মধ্যশ্রেণি ও বাঙলা সাহিত্য (১৯৭৯); নৈতিকতা : শ্রেয়োনীতি ও দুর্নীতি (১৯৮১) ; যুগসংক্রান্তি ও নীতিজিজ্ঞাসা (১৯৮৪); মাও সেতুঙের জ্ঞানতত্ত্ব (১৯৮৭); মানুষ ও তার পরিবেশ (১৯৮৮); রাজনীতি ও দর্শন (১৯৮৯); বাঙলাদেশের প্রবন্ধ সাহিত্য (১৯৮৯); আশা-আকাক্সক্ষার সমর্থনে (১৯৯৩); সাহিত্যচিন্তা (১৯৯৫); বাঙলাদেশের রাজনীতিতে বুদ্ধিজীবীদের ভূমিকা (১৯৯৭); অবক্ষয় ও উত্তরণ (১৯৯৮); রাজনীতি ও সংস্কৃতি : সম্ভাবনার নবদিগণ্ত (২০০২); সাহিত্য ও সংস্কৃতি প্রসঙ্গে (২০০২); সংস্কৃতির সহজ কথা (২০০২); আধুনিকতাবাদ ও জীবনানন্দের জীবনোৎকণ্ঠা (২০০৪); মানুষের স্বরূপ (২০০৭); রাষ্ট্রচিন্তায় বাংলাদেশ (২০০৮);

প্রাচুর্যে রিক্ততা (২০১০); শ্রেষ্ঠ প্রবন্ধ (২০১১)। তার অনুদিত গ্রন্থ বার্ন্ট্রান্ড রাসেল প্রণীত : রাজনৈতিক আদর্শ (১৯৭২); বার্ন্ট্রান্ড রাসেল প্রণীত : নবযুগের প্রত্যাশায় (১৯৮৯)। তার সম্পাদিত গ্রন্থ ইতিহাসের আলোকে বাঙলাদেশের সংস্কৃতি (১৯৭৮); স্বদেশচিন্তা (১৯৮৫); বঙ্কিমচন্দ্র : সার্ধশত জন্মবর্শে (১৯৮৯); বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় প্রণীত : সাম্য (২০০০); মোহাম্মদ এয়াকুব আলী চৌধুরী : মানবমুকুট (২০০০); এস ওয়াজেদ আলি প্রণীত: ভবিষ্যতের বাঙালি (২০০০); আকবরের রাষ্ট্রসাধনা (২০০২)। তার সম্পাদিত সাময়িকপত্র সুন্দরম (১৯৬২-৬৩); লোকায়ত (১৯৮২ থেকে চলছে)।

আরও পড়ুনঃ  দিনাজপুর বীরগঞ্জে চিরনিদ্রায় শায়িত হলেন বীর মুক্তিযোদ্ধা মোফাজ্জাল হোসেন

 

 

তিনি বিশ্বাস করতেন, একজন মানুষের প্রকৃত মর্যাদা তার পদ-পদবিতে নয়, বরং মানুষের প্রতি তাঁর ভালোবাসা, সততা এবং সমাজের প্রতি দায়বদ্ধতায়। তাই তিনি জীবনের প্রতিটি অধ্যায়ে কৃষক-শ্রমিক, মজলুম ও মেহনতি মানুষের সুখ-দুঃখের বিপ্লবী কণ্ঠস্বর হয়ে উঠেছিলেন।

সমাজের অবহেলিত ও বঞ্চিত মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠায় তিনি নিরলসভাবে কাজ করেছেন। তাঁর চিন্তা, আদর্শ ও কর্মে প্রতিফলিত হয়েছে ন্যায়বিচার, মানবিকতা এবং সাম্যের মূল্যবোধ। তিনি মনে করতেন, একটি রাষ্ট্র তখনই সত্যিকার অর্থে উন্নত হতে পারে, যখন তার কৃষক ও শ্রমিক শ্রেণি সম্মান, অধিকার এবং ন্যায্য প্রাপ্য নিশ্চিত করতে পারে।

 

অধ্যাপক ফজলুল হক শিক্ষা ক্ষেত্রেও ছিলেন একজন অনন্য ব্যক্তিত্ব। তিনি শুধু পাঠ্যবইয়ের জ্ঞান বিতরণ করেননি, বরং শিক্ষার্থীদের মধ্যে নৈতিকতা, দেশপ্রেম, মানবিকতা এবং সামাজিক দায়িত্ববোধ গড়ে তুলতে সচেষ্ট ছিলেন। তার শ্রেণিকক্ষ ও বাসা ছিল জ্ঞানচর্চার পাশাপাশি মানবিক মূল্যবোধের এক উজ্জ্বল পাঠশালা।

 

তাঁর জীবন ছিল অত্যন্ত সহজ-সরল। ব্যক্তিগত স্বার্থ বা বিলাসিতার প্রতি তাঁর কোনো আকর্ষণ ছিল না। তিনি ছিলেন নির্লোভ-নির্মোহ একজন সাদামনের মানুষ। তাঁর ক্ষমতা ও অর্থের মোহ ছিল না। জিয়া,এরশাদ, খালেদা ও হাসিনা তাঁকে ক্ষমতা দিতে চেয়েছেন, কিন্তু তিনি তা গ্রহণ করেননি। তিনি সব সময় মানবমুক্তির কথা চিন্তা করেছেন।

তিনি বলেছেন দেশ স্বাধীন হওয়ার পর থেকে বাংলাদেশে জনগণের কল্যাণে একটি রাজনৈতিক দল গড়ে ওঠেনি। রাজনৈতিক নেতৃত্ব নেই। প্রয়োজন নতুন রাজনীতি ও নতুন রাজনৈতিক নেতৃত্ব। তিনি প্রতিহিংসামুক্ত সম্প্রীতিময় রাজনীতির কথা বলেছেন। বাম ও ডানপন্থী সবাই ভুল পথে চলছে। বর্তমানে বাংলাদেশ সহ বিশ্বে যে গণতন্ত্র চলছে, সে গণতন্ত্রে তিনি বিশ্বাসী ছিলেন না। তিনি মনে করতেন পশ্চিমা সাম্রাজ্যবাদীদের উদার গণতন্ত্র পাঁচ শতাংশ লোকের জন্য প্রযোজ্য, আর এই পাঁচ শতাংশ লোক সমাজের, রাষ্ট্রের ৯৫ শতাংশ লোকের রক্ত শোষণ করছে গোটাবিশ্বে । তিনি জাতিসংঘকে অকার্যকর প্রতিষ্ঠান হিসেবে আখ্যায়িত করে জাতিসংঘকে পুনর্গঠন করে রাষ্ট্রসংঘ করার কথা বলেছেন এবং কোনো দেশের অধীনে সেনাবাহিনী না রাখারও প্রস্তাব দিয়েছেন। সেনাবাহিনী থাকবে শুধু রাষ্ট্রসংঘের অধীনে। তিনি যুদ্ধমুক্ত পৃথিবী দেখতে চেয়েছেন। সম্প্রীতিময় বিশ্বশান্তির কথা বলেছেন। সারা জীবন কর্তৃত্ববাদী মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে লিখেছেন। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র মানবজাতির শত্রু এবং কারো বন্ধু হতে পারেনা। তাঁর চিন্তা-চেতনাই ছিল মানুষের সর্বজনীন কল্যাণ। তিনি শুধু বাংলাদেশের জনগণের কথা ভাবেননি, বিশ্ব মানব মুক্তির কথা ভেবেছেন। তিনি বিশ্বাস করতেন, সমাজের দুর্বল ও অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ানোই একজন প্রকৃত শিক্ষিত মানুষের দায়িত্ব।

আরও পড়ুনঃ  “স্মরণে ’৭১, হৃদয়ে বাংলাদেশ” টেলিগ্রাম গ্রুপের ভার্চুয়াল সভা অনুষ্ঠিত

তিনি সমাজ ও রাষ্ট্র সংস্কার এবং কৃষক-শ্রমিক, মজলুম ও মেহনতি মানুষের ভাগ্যোন্নয়নের জন্য প্রায় দীর্ঘ ৭০ বছর সংগ্রাম করেছেন তাঁর লেখার মাধ্যমে। তিনি বলেছেন দেশ স্বাধীন হয়েছে, কিন্তু কৃষক-শ্রমিক ও মেহনতি মানুষের মুক্তি হয়নি। মুক্তি হয়েছে কিছু রাজনীতিক, আমলা ও অসাধু ব্যবসায়ীর এবং এদের ভাগ্য পরিবর্তন হয়েছে। আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে তিনটি নির্বাচন সম্পর্কে মন্তব্য করেছিলেন ২০১৪ সালে বিএনপি জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশগ্রহণ না করে ভুল করেছে। আর ২০১৮ সালে জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশগ্রহণ করে ভুল করেছে এবং ২০২৪ সালে জাতীয় সংসদ নির্বাচনে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র কাছে শেখ হাসিনা মাথা নতো না করে জাতীয় সংসদ নির্বাচন করবেন ঠিকই , কিন্তু ছয় মাসের বেশি শেখ হাসিনা ক্ষমতায় থাকতে পারবেন না বলেছিলেন। তিনি তিনটি জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে অগ্রহণযোগ্য নির্বাচন হয়েছে বলে মনে করতেন।

তিনি সব দলের সর্বজনীন অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের কথা বলতেন। তিনি বলেছেন কেবল নির্বাচনই গণতন্ত্র নয়। গণতন্ত্র একটি চলমান প্রক্রিয়া, যা নাগরিকদের সক্রিয় অংশগ্রহণের মাধ্যমে সুশাসন নিশ্চিত করে। জুলাই আন্দোলনকে বিপ্লবী আন্দোলন মনে করেননি, এটা ছিল কোটা সংস্কারের আন্দোলন। শেখ হাসিনা যদি ছাত্রদেরকে ডেকে কাছে নিতেন তাহলে এই আন্দোলন বেগমান হতো না। তাঁর আত্ম-অহংকারী একগুয়েমি মনোভাবের কারণে এটা হয়েছে। দেশীয় ও আন্তর্জাতিক চক্রমহল ষড়যন্ত্রে লিপ্ত ছিল এবং অন্তর্বর্তী সরকার ছিল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মনোনীত এনজিও সিভিল সোসাইটি সরকার।

 

 

আজকের সমাজে যখন মানবিক মূল্যবোধ নানা সংকটের মুখোমুখি, তখন অধ্যাপক আবুল কাসেম ফজলুল হকের জীবনাদর্শ আমাদের জন্য এক অনুপ্রেরণার উৎস। তাঁর কর্ম, চিন্তা ও ত্যাগ নতুন প্রজন্মকে মানবসেবায় উদ্বুদ্ধ করবে। একজন শিক্ষক, সমাজচিন্তক, রাষ্ট্রচিন্তক, রাজনৈতিক তাত্ত্বিক এবং মানবপ্রেমিক মানব হিসেবে তিনি মানুষের হৃদয়ে চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবেন।

 

অধ্যাপক আবুল কাসেম ফজলুল হকের মতো মানুষ বারবার জন্ম নেন না। তিনি ছিলেন মেহনতি মানুষের বন্ধু, ন্যায়ের পক্ষে একজন দৃঢ় কণ্ঠস্বর এবং মানবতার এক উজ্জ্বল প্রতীক। তার আদর্শ ও অবদান ভবিষ্যৎ প্রজন্মের পথচলায় আলোকবর্তিকা হয়ে থাকবে।

 

লেখক: এম এ আলীম সরকার : প্রাবন্ধিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক,

সভাপতি, বাংলাদেশ গণমুক্তির পার্টি (বিজিপি)।

Tag :
জনপ্রিয় নিউজ

১৫ মিনিটে ৩ গোল দিয়ে আর্জেন্টিনার বিজয়

অধ্যাপক আবুল কাসেম ফজলুল হক ছিলেন সহজ-সরল, কৃষক-শ্রমিক, মজলুম এবং মেহনতি মানুষের মুক্তির কণ্ঠস্বর ও আলোকবর্তিকা

সময়: ১০:২৯:৫৫ অপরাহ্ন, বুধবার, ৮ জুলাই ২০২৬

এম এ আলীম সরকার :

 

অধ্যাপক আবুল কাসেম ফজলুল হক ছিলেন একজন সহজ-সরল সাদামাটা জীবনযাপনে অভ্যস্ত, বিনয়ী এবং মানবপ্রেমী মানুষ।

 

অধ্যাপক আবুল কাসেম ফজলুল হক ১৯৪০ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর কিশোরগঞ্জ জেলার পাকুন্দিয়া গ্রামের সম্ভ্রান্ত পন্ডিত পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা মুহাম্মদ আবদুল হাকিম, মা জাহানারা খাতুন এবং তাঁর স্ত্রী ফরিদা প্রধান। তাঁর দুই সন্তানের নাম যথাক্রমে শুচিতা শরমিন ও ফয়সল আরেফিন দীপন। তাঁর মেয়ে শুচিতা শরমিন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উন্নয়ন অধ্যয়ন বিভাগের অধ্যাপক (সাবেক বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম নারী উপাচার্য) হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন । ছেলে ফয়সল আরেফিন দীপন জাগৃতি প্রকাশনীর স্বত্বাধিকারী ছিলেন। ২০১৫ সালের ৩১ অক্টোবর দীপনকে দুবৃত্তরা হত্যা করে। যেদিন দীপন ভাইকে হত্যা করে সেদিন আমি স্যারকে সান্ত্বনা দেওয়ার জন্য বাসায় গিয়েছিলাম। স্যার আমাকে দেখেই বলে যে “আলীম’ দেশতো অন্ধকারের দিকে যাচ্ছে তুমি আলোর মুখ দেখাবে কিভাবে?” তখন আমি বললাম স্যার আজকের দিনে এসব কথা থাক। সেদিনও দেখেছি তিনি সন্তানের কথা বলেননি, দেশের কথা, জনগণের কথা বলেছেন। তিনি ছেলে হত্যার বিচার চাননি বলেছিলেন “রাষ্ট্রের শুভবুদ্ধির উদয় হোক”। আসলে স্যার ছিলেন সাম্প্রতিক সময়ের মহামানব। তাঁর মতো মহৎ হৃদয়ের মানুষ

বর্তমান বিশ্বে বিরল।

 

অধ্যাপক আবুল কাসেম ফজলুল হক ১৯৫৯ খ্রিষ্টাব্দে ময়মনসিংহ জিলা স্কুল থেকে প্রবেশিকা পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। ১৯৬১ খ্রিষ্টাব্দে আনন্দমোহন কলেজ থেকে বিজ্ঞানে উচ্চমাধ্যমিক পাস করেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ১৯৬৫ সালে তিনি স্নাতক (সম্মান) এবং ১৯৬৬ সালে একই বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতকোত্তর পাশ করেন। শিক্ষাজীবনে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র থাকাকালীন তিনি মুনির চৌধুরী, আহমদ শরীফ, হুমায়ুন আজাদ, নীলিমা ইব্রাহিমের সংস্পর্শে আসেন এবং প্রগতিশীল ভাবধারায় নিজেকে যুক্ত করেন।

 

শৈশব থেকেই তিনি দেশ ও দেশের মানুষকে নিয়ে ভাবতেন। চতুর্থ শ্রেণিতে থাকাকালীন ভাষা আন্দোলনের সময় অন্যদের সাথে তিনিও “রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই , নুরুল আমিনের কল্লা চাই” এই স্লোগান দেন। তখন থেকেই তাঁর রাজনৈতিক জীবনের সূচনা। ছাত্রজীবনে ছাত্র ইউনিয়ন করতেন এবং পরবর্তীতে মাও সেতুঙের আদর্শে অনুপ্রাণিত হন।

আবুল কাসেম ফজলুল হক ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগে দীর্ঘ চার দশক শিক্ষকতা করেছেন। তিনি তাঁর লেখা ও কথায় কৃষক-শ্রমিক, মজলুম ও মেহনতির মানুষের মুক্তির কথা লিখেছেন । তিনি মানুষের মধ্যে শুভবোধের জাগরণ কামনা করেছেন। তিনি জনগণকে শ্রদ্ধা করেছেন এবং কাউকে তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করেননি। তিনি সবাইকে আপন মনে করে নিতেন নিজের সন্তানের মতো। তাঁর বাসায় থেকে কেউ না খেয়ে আসতে পারতো না। তাঁর অতিথিপরায়ণতা ছিল অতুলনীয়। দীপন ভাই মারা যাওয়ার পর থেকে আমাকে সন্তানের মতো ভালোবাসতেন। আমি আমার বাবা-মার চেয়ে বেশি ভালোবাসা পেয়েছি। স্যার আমার পিতৃসমতুল্য ছিল। স্যারের চিন্তা-চেতনায় ও আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে আমি ২০০৬ সাল থেকে স্যারের সান্নিধ্য পেয়েছি। এটা আমার জীবনের সবচেয়ে বড় পাওয়া। স্যার আমাকে লেখার জন্য সবসময় উৎসাহ দিতেন।

আরও পড়ুনঃ  সংসদে ‘বগুড়া বিশ্ববিদ্যালয় বিল-২০২৬’ উত্থাপন, তিন কার্যদিবসের মধ্যে প্রতিবেদন দাখিলের নির্দেশ

তিনি ‘ লোকায়ত নামক একটি মননশীল পত্রিকা ১৯৮২ খ্রিষ্টাব্দ থেকে সম্পাদনা করছেন। একুশটিরও অধিক গ্রন্থের প্রণেতা অধ্যাপক আবুল কাসেম ফজলুল হক। নজরুল রচনাবলীর সম্পাদনা পরিষদের সদস্য হিসাবেও দায়িত্ব পালন করেছেন। পত্র-পত্রিকায় তিনি নিয়মিত কলাম লিখেছেন। তিনি ২০০০ সাল থেকে ২০১৩ সাল পর্যন্ত স্বদেশ চিন্তা সংঘের সভাপতির দায়িত্ব পালন করেছেন। এই সংগঠনটিকে সৃষ্টি করেছিলেন বাংলাদেশের প্রধান মুক্তচিন্তক আহমদ শরীফ। এছাড়াও এ সংগঠনটি ‘বাংলাদেশের মুক্তি ও উন্নতির কর্মনীতি আটাশ দফা’ ১ জানুয়ারি, ২০০৫ থেকে প্রচার করে যেটির রচয়িতা ছিলেন তিনি। তাঁর স্বপ্ন ছিল ২৮ দফার পর ওপর একটি নতুন রাজনৈতিক দল গড়ে উঠবে এবং নতুন নেতৃত্ব সৃষ্টি হবে। তাঁর আটাশ দফার ওপর ভিত্তি করেই বাংলাদেশ গণমুক্তি পার্টি (বিজিপি) নামে একটি রাজনৈতিক দল আত্মপ্রকাশ করে ২০২৩ সালের ২৫ আগস্ট। তিনি নিজেই এ পার্টি ঘোষণা করেন এবং তাত্ত্বিক ও প্রধান উপদেষ্টা হিসেবে ছিলেন। ২০২৩ সালের ৬ অক্টোবর জাতীয় প্রেসক্লাবে বাংলাদেশ গণমুক্তি পার্টির এক আলোচনা সভায় ২৮ দফার রূপরেখাকে সর্বজনীন গণতন্ত্র হিসেবে রূপদান করা হয়। অন্তর্বর্তীকালীন সরকার তাকে বাংলা একাডেমির সভাপতি হিসেবে নিয়োগ প্রদান করে।

তার সম্পাদিত গ্রন্থের মধ্যে রয়েছে মুক্তিসংগ্রাম (১৯৭২); কালের যাত্রার ধ্বনি (১৯৭৩); একুশে ফেব্রুয়ারি আন্দোলন (১৯৭৬); উনিশশতকের মধ্যশ্রেণি ও বাঙলা সাহিত্য (১৯৭৯); নৈতিকতা : শ্রেয়োনীতি ও দুর্নীতি (১৯৮১) ; যুগসংক্রান্তি ও নীতিজিজ্ঞাসা (১৯৮৪); মাও সেতুঙের জ্ঞানতত্ত্ব (১৯৮৭); মানুষ ও তার পরিবেশ (১৯৮৮); রাজনীতি ও দর্শন (১৯৮৯); বাঙলাদেশের প্রবন্ধ সাহিত্য (১৯৮৯); আশা-আকাক্সক্ষার সমর্থনে (১৯৯৩); সাহিত্যচিন্তা (১৯৯৫); বাঙলাদেশের রাজনীতিতে বুদ্ধিজীবীদের ভূমিকা (১৯৯৭); অবক্ষয় ও উত্তরণ (১৯৯৮); রাজনীতি ও সংস্কৃতি : সম্ভাবনার নবদিগণ্ত (২০০২); সাহিত্য ও সংস্কৃতি প্রসঙ্গে (২০০২); সংস্কৃতির সহজ কথা (২০০২); আধুনিকতাবাদ ও জীবনানন্দের জীবনোৎকণ্ঠা (২০০৪); মানুষের স্বরূপ (২০০৭); রাষ্ট্রচিন্তায় বাংলাদেশ (২০০৮);

প্রাচুর্যে রিক্ততা (২০১০); শ্রেষ্ঠ প্রবন্ধ (২০১১)। তার অনুদিত গ্রন্থ বার্ন্ট্রান্ড রাসেল প্রণীত : রাজনৈতিক আদর্শ (১৯৭২); বার্ন্ট্রান্ড রাসেল প্রণীত : নবযুগের প্রত্যাশায় (১৯৮৯)। তার সম্পাদিত গ্রন্থ ইতিহাসের আলোকে বাঙলাদেশের সংস্কৃতি (১৯৭৮); স্বদেশচিন্তা (১৯৮৫); বঙ্কিমচন্দ্র : সার্ধশত জন্মবর্শে (১৯৮৯); বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় প্রণীত : সাম্য (২০০০); মোহাম্মদ এয়াকুব আলী চৌধুরী : মানবমুকুট (২০০০); এস ওয়াজেদ আলি প্রণীত: ভবিষ্যতের বাঙালি (২০০০); আকবরের রাষ্ট্রসাধনা (২০০২)। তার সম্পাদিত সাময়িকপত্র সুন্দরম (১৯৬২-৬৩); লোকায়ত (১৯৮২ থেকে চলছে)।

আরও পড়ুনঃ  অধ্যাপক আবুল কাসেম ফজলুল হক ছিলেন জাতির বিবেক-সিনিয়র সাংবাদিক ও লায়ন

 

 

তিনি বিশ্বাস করতেন, একজন মানুষের প্রকৃত মর্যাদা তার পদ-পদবিতে নয়, বরং মানুষের প্রতি তাঁর ভালোবাসা, সততা এবং সমাজের প্রতি দায়বদ্ধতায়। তাই তিনি জীবনের প্রতিটি অধ্যায়ে কৃষক-শ্রমিক, মজলুম ও মেহনতি মানুষের সুখ-দুঃখের বিপ্লবী কণ্ঠস্বর হয়ে উঠেছিলেন।

সমাজের অবহেলিত ও বঞ্চিত মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠায় তিনি নিরলসভাবে কাজ করেছেন। তাঁর চিন্তা, আদর্শ ও কর্মে প্রতিফলিত হয়েছে ন্যায়বিচার, মানবিকতা এবং সাম্যের মূল্যবোধ। তিনি মনে করতেন, একটি রাষ্ট্র তখনই সত্যিকার অর্থে উন্নত হতে পারে, যখন তার কৃষক ও শ্রমিক শ্রেণি সম্মান, অধিকার এবং ন্যায্য প্রাপ্য নিশ্চিত করতে পারে।

 

অধ্যাপক ফজলুল হক শিক্ষা ক্ষেত্রেও ছিলেন একজন অনন্য ব্যক্তিত্ব। তিনি শুধু পাঠ্যবইয়ের জ্ঞান বিতরণ করেননি, বরং শিক্ষার্থীদের মধ্যে নৈতিকতা, দেশপ্রেম, মানবিকতা এবং সামাজিক দায়িত্ববোধ গড়ে তুলতে সচেষ্ট ছিলেন। তার শ্রেণিকক্ষ ও বাসা ছিল জ্ঞানচর্চার পাশাপাশি মানবিক মূল্যবোধের এক উজ্জ্বল পাঠশালা।

 

তাঁর জীবন ছিল অত্যন্ত সহজ-সরল। ব্যক্তিগত স্বার্থ বা বিলাসিতার প্রতি তাঁর কোনো আকর্ষণ ছিল না। তিনি ছিলেন নির্লোভ-নির্মোহ একজন সাদামনের মানুষ। তাঁর ক্ষমতা ও অর্থের মোহ ছিল না। জিয়া,এরশাদ, খালেদা ও হাসিনা তাঁকে ক্ষমতা দিতে চেয়েছেন, কিন্তু তিনি তা গ্রহণ করেননি। তিনি সব সময় মানবমুক্তির কথা চিন্তা করেছেন।

তিনি বলেছেন দেশ স্বাধীন হওয়ার পর থেকে বাংলাদেশে জনগণের কল্যাণে একটি রাজনৈতিক দল গড়ে ওঠেনি। রাজনৈতিক নেতৃত্ব নেই। প্রয়োজন নতুন রাজনীতি ও নতুন রাজনৈতিক নেতৃত্ব। তিনি প্রতিহিংসামুক্ত সম্প্রীতিময় রাজনীতির কথা বলেছেন। বাম ও ডানপন্থী সবাই ভুল পথে চলছে। বর্তমানে বাংলাদেশ সহ বিশ্বে যে গণতন্ত্র চলছে, সে গণতন্ত্রে তিনি বিশ্বাসী ছিলেন না। তিনি মনে করতেন পশ্চিমা সাম্রাজ্যবাদীদের উদার গণতন্ত্র পাঁচ শতাংশ লোকের জন্য প্রযোজ্য, আর এই পাঁচ শতাংশ লোক সমাজের, রাষ্ট্রের ৯৫ শতাংশ লোকের রক্ত শোষণ করছে গোটাবিশ্বে । তিনি জাতিসংঘকে অকার্যকর প্রতিষ্ঠান হিসেবে আখ্যায়িত করে জাতিসংঘকে পুনর্গঠন করে রাষ্ট্রসংঘ করার কথা বলেছেন এবং কোনো দেশের অধীনে সেনাবাহিনী না রাখারও প্রস্তাব দিয়েছেন। সেনাবাহিনী থাকবে শুধু রাষ্ট্রসংঘের অধীনে। তিনি যুদ্ধমুক্ত পৃথিবী দেখতে চেয়েছেন। সম্প্রীতিময় বিশ্বশান্তির কথা বলেছেন। সারা জীবন কর্তৃত্ববাদী মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে লিখেছেন। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র মানবজাতির শত্রু এবং কারো বন্ধু হতে পারেনা। তাঁর চিন্তা-চেতনাই ছিল মানুষের সর্বজনীন কল্যাণ। তিনি শুধু বাংলাদেশের জনগণের কথা ভাবেননি, বিশ্ব মানব মুক্তির কথা ভেবেছেন। তিনি বিশ্বাস করতেন, সমাজের দুর্বল ও অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ানোই একজন প্রকৃত শিক্ষিত মানুষের দায়িত্ব।

আরও পড়ুনঃ  পাবলিক পরীক্ষায় ডিজিটাল কারসাজির সাজা ৫ বছরের কারাদণ্ড, সংসদে বিল পাস:  শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক মিলন

তিনি সমাজ ও রাষ্ট্র সংস্কার এবং কৃষক-শ্রমিক, মজলুম ও মেহনতি মানুষের ভাগ্যোন্নয়নের জন্য প্রায় দীর্ঘ ৭০ বছর সংগ্রাম করেছেন তাঁর লেখার মাধ্যমে। তিনি বলেছেন দেশ স্বাধীন হয়েছে, কিন্তু কৃষক-শ্রমিক ও মেহনতি মানুষের মুক্তি হয়নি। মুক্তি হয়েছে কিছু রাজনীতিক, আমলা ও অসাধু ব্যবসায়ীর এবং এদের ভাগ্য পরিবর্তন হয়েছে। আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে তিনটি নির্বাচন সম্পর্কে মন্তব্য করেছিলেন ২০১৪ সালে বিএনপি জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশগ্রহণ না করে ভুল করেছে। আর ২০১৮ সালে জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশগ্রহণ করে ভুল করেছে এবং ২০২৪ সালে জাতীয় সংসদ নির্বাচনে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র কাছে শেখ হাসিনা মাথা নতো না করে জাতীয় সংসদ নির্বাচন করবেন ঠিকই , কিন্তু ছয় মাসের বেশি শেখ হাসিনা ক্ষমতায় থাকতে পারবেন না বলেছিলেন। তিনি তিনটি জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে অগ্রহণযোগ্য নির্বাচন হয়েছে বলে মনে করতেন।

তিনি সব দলের সর্বজনীন অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের কথা বলতেন। তিনি বলেছেন কেবল নির্বাচনই গণতন্ত্র নয়। গণতন্ত্র একটি চলমান প্রক্রিয়া, যা নাগরিকদের সক্রিয় অংশগ্রহণের মাধ্যমে সুশাসন নিশ্চিত করে। জুলাই আন্দোলনকে বিপ্লবী আন্দোলন মনে করেননি, এটা ছিল কোটা সংস্কারের আন্দোলন। শেখ হাসিনা যদি ছাত্রদেরকে ডেকে কাছে নিতেন তাহলে এই আন্দোলন বেগমান হতো না। তাঁর আত্ম-অহংকারী একগুয়েমি মনোভাবের কারণে এটা হয়েছে। দেশীয় ও আন্তর্জাতিক চক্রমহল ষড়যন্ত্রে লিপ্ত ছিল এবং অন্তর্বর্তী সরকার ছিল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মনোনীত এনজিও সিভিল সোসাইটি সরকার।

 

 

আজকের সমাজে যখন মানবিক মূল্যবোধ নানা সংকটের মুখোমুখি, তখন অধ্যাপক আবুল কাসেম ফজলুল হকের জীবনাদর্শ আমাদের জন্য এক অনুপ্রেরণার উৎস। তাঁর কর্ম, চিন্তা ও ত্যাগ নতুন প্রজন্মকে মানবসেবায় উদ্বুদ্ধ করবে। একজন শিক্ষক, সমাজচিন্তক, রাষ্ট্রচিন্তক, রাজনৈতিক তাত্ত্বিক এবং মানবপ্রেমিক মানব হিসেবে তিনি মানুষের হৃদয়ে চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবেন।

 

অধ্যাপক আবুল কাসেম ফজলুল হকের মতো মানুষ বারবার জন্ম নেন না। তিনি ছিলেন মেহনতি মানুষের বন্ধু, ন্যায়ের পক্ষে একজন দৃঢ় কণ্ঠস্বর এবং মানবতার এক উজ্জ্বল প্রতীক। তার আদর্শ ও অবদান ভবিষ্যৎ প্রজন্মের পথচলায় আলোকবর্তিকা হয়ে থাকবে।

 

লেখক: এম এ আলীম সরকার : প্রাবন্ধিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক,

সভাপতি, বাংলাদেশ গণমুক্তির পার্টি (বিজিপি)।