হাফিজ মাছুম আহমদ দুধরচকী
নাহমাদুহু ওয়া নুসাল্লি আলা রাসূলিহিল কারীম। আম্মা বা‘দ।
আমরাও একদিন মরে যাব—এটি চিরন্তন সত্য, মানুষের জীবনের এক অবধারিত বাস্তবতা। দুনিয়ার এই জীবন ক্ষণস্থায়ী। একদিন আমাদের সবাইকে এই পৃথিবীর মায়া ত্যাগ করে চলে যেতে হবে। থেকে যাবে আমাদের কর্ম, আর রেখে যেতে হবে পরিবার, আত্মীয়স্বজন, বন্ধু-বান্ধব ও অর্জিত সম্পদ।
জীবন ক্ষণস্থায়ী, মৃত্যু অবধারিত
দুনিয়ার চাওয়া-পাওয়া, ধনসম্পদ, অহংকার কিংবা ব্যস্ততা—সবকিছুরই একদিন অবসান ঘটবে। তাই দুনিয়ার মোহে পড়ে পরকালের কথা ভুলে যাওয়া উচিত নয়।
পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তাআলা ঘোষণা করেছেন, “প্রত্যেক প্রাণীই মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণ করবে।” (সূরা আলে ইমরান, আয়াত ১৮৫)
এই আয়াত আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয়, মৃত্যু থেকে কারও রেহাই নেই। ধনী-গরিব, রাজা-প্রজা, ক্ষমতাবান কিংবা সাধারণ মানুষ—সবাইকে একদিন মৃত্যুর মুখোমুখি হতে হবে। তাই বুদ্ধিমানের কাজ হলো, জীবিত থাকতেই পরকালের প্রস্তুতি নেওয়া এবং সৎকর্মের মাধ্যমে আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের চেষ্টা করা।
মৃত্যুর আগে তওবা ও নেক আমলের প্রস্তুতি
মানুষ কখন মৃত্যুবরণ করবে, তা কেউ জানে না। তাই অন্যায় ও পাপের পথ থেকে ফিরে এসে আল্লাহর কাছে আন্তরিকভাবে তওবা করা জরুরি। মানুষের হক নষ্ট করে থাকলে তা ফিরিয়ে দেওয়া, কারও মনে কষ্ট দিয়ে থাকলে ক্ষমা চাওয়া এবং সামর্থ্য অনুযায়ী মানুষের উপকার করা মুমিনের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব।
নামাজ, রোজা, দান-সদকা, উত্তম আচরণ এবং মানুষের কল্যাণে কাজের মাধ্যমে জীবনের প্রতিটি মুহূর্তকে অর্থবহ করে তোলা উচিত। কারণ দুনিয়ার সম্পদ ও পদমর্যাদা মৃত্যুর সঙ্গে শেষ হয়ে যায়, কিন্তু মানুষের সৎকর্মের প্রতিদান আল্লাহর কাছে সংরক্ষিত থাকে।
মৃত্যুর স্মরণ আমাদের কী শিক্ষা দেয়?
মৃত্যুর কথা স্মরণ করলে মানুষের অন্তরে দায়িত্ববোধ জাগ্রত হয়। সে বুঝতে পারে, দুনিয়ার জীবন চিরস্থায়ী নয় এবং অন্যায়ভাবে অর্জিত সম্পদ কিংবা মানুষের ওপর জুলুম করে প্রকৃত সফলতা লাভ করা যায় না।
মৃত্যুর পর মানুষ তার প্রিয়জনদের কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। পরিবারের সদস্যরা কাঁদেন, আত্মীয়স্বজন বিদায় জানান, বন্ধুরা ফিরে যান। দাফন সম্পন্ন হওয়ার পর মৃত ব্যক্তির জন্য দোয়া করা, তাঁর ঋণ পরিশোধে সহযোগিতা করা এবং তাঁর রেখে যাওয়া দায়িত্বগুলো যথাযথভাবে পালন করা জীবিতদের গুরুত্বপূর্ণ কর্তব্য।
মৃত্যুর স্মরণ আমাদের এ কথাও শেখায় যে, সম্পদ উপার্জনের পাশাপাশি তা হালাল পথে অর্জন করা এবং সঠিকভাবে ব্যয় করা জরুরি। দুনিয়ায় অন্যায়ভাবে সম্পদ অর্জন করলেও মৃত্যুর পর তা নিজের সঙ্গে নিয়ে যাওয়া সম্ভব নয়। বরং সম্পদ উত্তরাধিকারীদের কাছে থেকে যায়, আর মানুষের কর্মের হিসাব আল্লাহর কাছে দিতে হয়।
পরিবার ও মানুষের প্রতি সদয় হোন
মৃত্যুর পর একজন মানুষ তাঁর পরিবারকে ছেড়ে চলে যান। স্ত্রী, সন্তান, মা-বাবা ও স্বজনেরা তাঁর অনুপস্থিতি অনুভব করেন। তাই জীবিত থাকতেই পরিবারের সদস্যদের প্রতি দায়িত্ব পালন করা, সন্তানদের সুশিক্ষা দেওয়া এবং অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ানো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
কাউকে অবহেলা করা, দুর্বল মানুষের অধিকার নষ্ট করা কিংবা আত্মীয়স্বজনের সঙ্গে অন্যায় আচরণ করা থেকে বিরত থাকতে হবে। কারণ মানুষের সঙ্গে সুন্দর ব্যবহার, ক্ষমাশীলতা ও ন্যায়বিচার ইসলামের গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা।
মৃত ব্যক্তির জন্য দোয়া করুন
মৃত ব্যক্তির জন্য দোয়া করা, তাঁর মাগফিরাত কামনা করা এবং সামর্থ্য অনুযায়ী তাঁর পক্ষ থেকে দান-সদকা করা উত্তম কাজ। মৃত ব্যক্তির কোনো ঋণ বা মানুষের অধিকার বাকি থাকলে তা পরিশোধের উদ্যোগ নেওয়াও জরুরি।
জীবিত অবস্থায় আমরা অনেক সময় দুনিয়ার ব্যস্ততায় পরকালের কথা ভুলে যাই। অথচ একদিন আমাদেরও এই পৃথিবী ছেড়ে চলে যেতে হবে। তাই অন্যের প্রতি বিদ্বেষ পোষণ না করে, ক্ষমা করতে শিখে এবং মানুষের কল্যাণে কাজ করে জীবন কাটানো উচিত।
মনে রাখতে হবে, মৃত্যুর জন্য প্রস্তুতি মানে জীবন থেকে মুখ ফিরিয়ে নেওয়া নয়; বরং দায়িত্বশীলভাবে জীবনযাপন করা, অন্যায় থেকে বিরত থাকা এবং ভালো কাজের মাধ্যমে আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের চেষ্টা করা।
আসুন, আমরা সবাই মৃত্যুর কথা স্মরণ করি, নিজেদের ভুলের জন্য আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাই এবং মানুষের অধিকার রক্ষায় সচেষ্ট হই।
হে আল্লাহ! আমাদের জীবনের সব গুনাহ ক্ষমা করে দিন। আমাদের সৎপথে পরিচালিত করুন, হালাল রিজিক দান করুন, মানুষের হক আদায় করার তাওফিক দিন এবং ঈমানের সঙ্গে জীবনযাপন ও ঈমানের সঙ্গে মৃত্যুবরণ করার সৌভাগ্য দান করুন। আমাদের মৃত আত্মীয়স্বজন ও সকল মুমিন-মুসলমানকে ক্ষমা করুন।
আমিন, ইয়া রব্বাল আলামিন।
লেখক পরিচিতি
হাফিজ মাছুম আহমদ দুধরচকী
বিশিষ্ট ইসলামী চিন্তাবিদ, লেখক ও কলামিস্ট।
- প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি, জকিগঞ্জ উপজেলা সচেতন নাগরিক ফোরাম, সিলেট।
- সাবেক ইমাম ও খতিব, কদমতলী হযরত দরিয়া শাহ (রহ.) মাজার কেন্দ্রীয় জামে মসজিদ, সিলেট নগরী।
- সাবেক প্রিন্সিপাল, হযরত শাহজালাল (রহ.) ৩৬০ আউলিয়া লতিফিয়া হাফিজিয়া মাদ্রাসা, উপশহর, সিলেট।
- সাবেক প্রধান শিক্ষক, তৈয়ব কামাল হযরত শাহজালাল (রহ.) লতিফিয়া হাফিজিয়া দাখিল মাদ্রাসা, সিলেট।
Reporter Name 




























