সাকিব আহসান,
প্রতিনিধি, পীরগঞ্জ, ঠাকুরগাঁও
ঠাকুরগাঁওয়ের পীরগঞ্জে মাদকবিরোধী অভিযান নতুন কিছু নয়। মাঝেমধ্যেই আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর “রোবাস্ট অপারেশন”, গ্রেপ্তার, ইয়াবা উদ্ধার কিংবা ভ্রাম্যমাণ আদালতের খবর প্রকাশিত হয়। কিন্তু প্রশ্ন থেকে যায়—অভিযান চলার পরও কেন থামছে না মাদকের বিস্তার? কেন মাঠপর্যায়ে কয়েকজন খুচরা বিক্রেতা ধরা পড়লেও আড়ালে থাকা বড় মাদক কারবারিরা অধরাই থেকে যায়?
স্থানীয় সচেতন মহলের দাবি, মাদক ব্যবসার দৃশ্যমান অংশটুকু ভাঙা গেলেও এর অর্থনৈতিক ও সামাজিক নেটওয়ার্ক অটুট থাকায় সমস্যা আরও গভীরে প্রবেশ করছে। অনেকেই বলছেন, “ক্রেতা আছে বলেই বাজার টিকে আছে।” ফলে শুধু বিক্রেতাকে নয়, মাদক গ্রহণকারীদের পুনর্বাসন, সামাজিক নিয়ন্ত্রণ এবং অর্থের উৎস শনাক্ত করাও জরুরি হয়ে উঠেছে।
পীরগঞ্জ পৌর এলাকার এক প্রবীণ শিক্ষক নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন,
“শুধু দুই-একজন ডিলার ধরলে কিছু হবে না। যারা আড়াল থেকে পুরো চেইন নিয়ন্ত্রণ করে, তাদের বিরুদ্ধে তথ্যভিত্তিক অভিযান দরকার। এখন দেখা যায়, ছোট মাছ ধরা পড়ে, বড়রা ঠিকই বাইরে থাকে।”
স্থানীয়দের অভিযোগ, মাদক কারবার এখন শুধু গোপন অপরাধ নয়; এটি ধীরে ধীরে সামাজিক কাঠামোকে প্রভাবিত করছে। বেকারত্ব, হতাশা, দ্রুত অর্থ উপার্জনের প্রবণতা এবং সুস্থ বিনোদনের অভাব—এসব কারণে কিছু তরুণ সহজেই এই চক্রে জড়িয়ে পড়ছে।
এক অভিভাবক বলেন,
“আগে রাতের পর শহর শান্ত থাকত। এখন অনেক পরিবার সন্তান নিয়ে আতঙ্কে থাকে। কার সঙ্গে মিশছে, কোথায় যাচ্ছে—সব সময় নজর রাখতে হয়।”
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, মাদক সমস্যাকে শুধু আইনশৃঙ্খলার ইস্যু হিসেবে দেখলে পূর্ণ সমাধান আসবে না। এটি একইসঙ্গে অর্থনৈতিক, সামাজিক ও মানসিক স্বাস্থ্য সংকটও। মাদক কেনে কারা, কেন কেনে, কীভাবে আসক্ত হচ্ছে—এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজে কার্যকর পরিকল্পনা না করলে অভিযান দীর্ঘমেয়াদে ফল দেবে না।
পীরগঞ্জের এক সমাজকর্মী বলেন,
“যে তরুণ মাদক নেয়, সে একদিনে আসক্ত হয়নি। পরিবার, বন্ধুমহল, হতাশা—সব মিলিয়ে সে দুর্বল হয়েছে। শুধু জেল দিলেই হবে না, কাউন্সেলিং ও পুনর্বাসনও দরকার।”
এ অঞ্চলে সীমান্তবর্তী বিভিন্ন জেলার যোগাযোগ ব্যবস্থাও মাদক প্রবাহের একটি কারণ বলে মনে করছেন অনেকে। স্থানীয় পর্যবেক্ষকদের মতে, ছোট শহরগুলো এখন বড় নেটওয়ার্কের ট্রানজিট পয়েন্টে পরিণত হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে। ফলে স্থানীয় প্রশাসনের পাশাপাশি গোয়েন্দা নজরদারি ও আন্তঃজেলা সমন্বয় বাড়ানো প্রয়োজন।
এক ব্যবসায়ী বলেন,
“খুচরা বিক্রেতারা তো সামনে থাকে। কিন্তু যারা টাকা লগ্নি করে নিরাপদে বসে সব নিয়ন্ত্রণ করে, তাদের খুঁজে বের করা কঠিন। অনেক সময় ভয়েও কেউ মুখ খুলতে চায় না।”
সচেতন নাগরিকদের মতে, মাদক ব্যবসার বিরুদ্ধে সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে না উঠলে প্রশাসনিক অভিযান একা যথেষ্ট হবে না। পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান ও স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। বিশেষ করে স্কুল-কলেজ পর্যায়ে নিয়মিত সচেতনতামূলক কার্যক্রম জরুরি বলে মনে করছেন তারা।
পীরগঞ্জ সরকারি কলেজ-এর এক শিক্ষার্থী বলেন,
“বন্ধুদের চাপ, কৌতূহল কিংবা হতাশা থেকে অনেকেই প্রথমে জড়িয়ে পড়ে। পরে বের হতে পারে না। তাই শুরুতেই প্রতিরোধ দরকার।”
এদিকে মানবাধিকারকর্মীরা বলছেন, মাদকবিরোধী অভিযান পরিচালনার সময় আইনের সঠিক প্রয়োগ এবং স্বচ্ছতা নিশ্চিত করাও গুরুত্বপূর্ণ। কারণ অপরাধ দমনের নামে যেন নিরীহ কেউ হয়রানির শিকার না হয়, সেদিকেও নজর রাখতে হবে। একই সঙ্গে প্রকৃত গডফাদারদের বিচারের আওতায় আনা না গেলে সাধারণ মানুষের আস্থা দুর্বল হতে পারে।
বিশ্লেষকদের মতে, মাদক একটি লাভজনক অবৈধ অর্থনীতি। যেখানে চাহিদা আছে, সেখানে সরবরাহ তৈরি হবেই। ফলে শুধু “ড্রাগ ডিলার ধরো” নীতির বাইরে গিয়ে চাহিদা কমানো, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, তরুণদের খেলাধুলা ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে যুক্ত করা এবং মানসিক স্বাস্থ্যসেবা সহজলভ্য করাও জরুরি।
পীরগঞ্জের বাস্তবতা এখন একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে আনছে—অভিযানের ছবি কি সমস্যার সমাধান, নাকি সমাধানের শুরু মাত্র? কারণ জনমনে এখনও সেই প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে—“রোবাস্ট অপারেশন” চললেও আড়ালে থাকা বড় মাদক কারবারিরা কেন অদৃশ্যই থেকে যায়?”
Reporter Name 























