টানা বর্ষণ, উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢল এবং পাহাড়ধসে দেশের দক্ষিণ-পূর্ব ও উত্তর-পূর্বাঞ্চলে ভয়াবহ মানবিক বিপর্যয় সৃষ্টি হয়েছে। দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, এ পর্যন্ত ৪৪ জনের মৃত্যু হয়েছে এবং ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের সংখ্যা ১০ লাখ ২২ হাজার ছাড়িয়েছে।
সরকারি হিসাবে, খাগড়াছড়ি, রাঙামাটি, বান্দরবান, কক্সবাজার, চট্টগ্রাম, মৌলভীবাজার ও হবিগঞ্জ জেলার ৩৮৬টি ইউনিয়ন এবং ১১টি পৌরসভা বন্যাকবলিত হয়েছে। পানিবন্দি হয়ে পড়েছে প্রায় ২ লাখ ৬৮ হাজার পরিবার।
কক্সবাজারে সর্বাধিক প্রাণহানি
সবচেয়ে বেশি প্রাণহানি হয়েছে কক্সবাজারে। সেখানে পাহাড়ধস ও বন্যায় ২৩ জনের মৃত্যু হয়েছে। নিহতদের মধ্যে ১০ জন স্থানীয় বাসিন্দা এবং ১৩ জন রোহিঙ্গা। এছাড়া চট্টগ্রামে বন্যা ও দেয়ালধসে ১১ জন, বান্দরবানে ৬ জন, রাঙামাটিতে ৩ জন এবং মৌলভীবাজারে একজনের মৃত্যু হয়েছে।
আরও কয়েকটি জেলায় বন্যার ঝুঁকি
বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র জানিয়েছে, আগামী ২৪ ঘণ্টায় তিস্তা, ধরলা ও দুধকুমার নদীর পানি আরও বাড়তে পারে। ফলে নীলফামারী, লালমনিরহাট, রংপুর, কুড়িগ্রাম ও গাইবান্ধার নিম্নাঞ্চলে স্বল্পমেয়াদি বন্যার আশঙ্কা রয়েছে।
এছাড়া ফেনী, চট্টগ্রাম ও খাগড়াছড়িতে মুহুরী, ফেনী, সেলোনিয়া ও হালদা নদীর পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় নতুন এলাকা প্লাবিত হতে পারে। লক্ষ্মীপুর ও নোয়াখালীর নিচু এলাকাও ঝুঁকিতে রয়েছে।
বর্তমানে দেশের ১২৭টি পানি পরিমাপ কেন্দ্রের মধ্যে ৫৭টিতে পানি বৃদ্ধি এবং ৬৪টিতে হ্রাস পেয়েছে। তবে দীর্ঘস্থায়ী বন্যার আশঙ্কা আপাতত নেই বলে জানিয়েছে বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র।
বান্দরবানে সবচেয়ে ভয়াবহ অবস্থা
পাহাড়ি ঢল, অতিবৃষ্টি ও পাহাড়ধসে বান্দরবানের বিভিন্ন এলাকা বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। সড়ক ও সেতু ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় জেলার সঙ্গে দেশের অন্যান্য এলাকার যোগাযোগ ব্যাহত হয়েছে। বিদ্যুৎ, মোবাইল ও ইন্টারনেট সেবাও অনেক স্থানে বন্ধ রয়েছে।
জেলা প্রশাসন আশ্রয়কেন্দ্রে থাকা মানুষের জন্য খাবারের ব্যবস্থা করছে। পাশাপাশি বিভিন্ন বেসরকারি সংস্থাও ত্রাণ ও আর্থিক সহায়তা দিচ্ছে। পরিস্থিতির কারণে আগামী ১৫ জুলাই পর্যন্ত জেলার সব পর্যটনকেন্দ্র বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে।
সরকারের ত্রাণ ও উদ্ধার কার্যক্রম
সরকার জানিয়েছে, উদ্ধার, ত্রাণ বিতরণ এবং পুনর্বাসন—এই তিন ধাপে কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে।
এ পর্যন্ত:
- ১,১৩১টি আশ্রয়কেন্দ্র খোলা হয়েছে, যেখানে ৪৪ হাজার ৪৫৭ জন আশ্রয় নিয়েছেন।
- জেলা প্রশাসনের অনুকূলে ৬,৯০০ মেট্রিক টন চাল এবং ৩ কোটি ৪৫ লাখ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে।
- প্রধানমন্ত্রীর জরুরি তহবিল থেকে অতিরিক্ত ২ কোটি টাকা সহায়তা দেওয়া হয়েছে।
- উদ্ধার কার্যক্রমে কোস্ট গার্ড, বিজিবি ও বাংলাদেশ সেনাবাহিনী অংশ নিয়েছে।
এনজিওগুলোর সহায়তা
সরকারি উদ্যোগের পাশাপাশি বিভিন্ন সংস্থা দুর্গত মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছে। ব্র্যাক বান্দরবান ও আশপাশের এলাকায় শত শত পরিবারের মধ্যে জরুরি খাদ্যসামগ্রী বিতরণ করেছে। বলিপাড়া নারী কল্যাণ সংস্থা (বিএনকেএস) প্রায় ১৬ হাজার ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারকে মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে আর্থিক সহায়তা দিয়েছে।
সামনে নতুন চ্যালেঞ্জ
যোগাযোগ ব্যবস্থা ভেঙে পড়ায় দুর্গম এলাকায় ত্রাণ পৌঁছাতে এখনো বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ রয়েছে। আশ্রয়কেন্দ্রগুলোতে বিশুদ্ধ পানি ও শুকনো খাবারের সংকট দেখা দিয়েছে। সংশ্লিষ্টরা আশঙ্কা করছেন, পানি নেমে গেলে পানিবাহিত রোগের প্রকোপ বাড়তে পারে। এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় মেডিকেল টিম ও প্রয়োজনীয় ওষুধ প্রস্তুত রাখা হয়েছে।
Reporter Name 






















