
অ্যাডভোকেট মো. কামরুজ্জামান ভূঁইয়া
ঢাকা | ৯ নভেম্বর ২০২৫
গণতন্ত্রের মূল শক্তি হলো জনগণের ভোটের প্রতিফলন। কিন্তু প্রশ্ন হলো—আমাদের বর্তমান নির্বাচনী ব্যবস্থায় জনগণের ভোটের প্রতিফলন কি সত্যিই সংসদের আসনে প্রতিফলিত হয়? এই প্রশ্ন থেকেই উঠে আসে আনুপাতিক প্রতিনিধিত্ব বা Proportional Representation (PR) পদ্ধতির আলোচনা।
বিশ্বের বহু দেশে—যেমন নরওয়ে, সুইডেন, জার্মানি, নেদারল্যান্ডস, দক্ষিণ আফ্রিকা ও নিউজিল্যান্ডে—পিআর পদ্ধতি সফলভাবে প্রয়োগ করা হয়েছে। এই পদ্ধতির মূল ধারণা হলো, যে রাজনৈতিক দল নির্বাচনে যত ভোট পাবে, সংসদেও সেই অনুপাতে আসন পাবে। ফলে ভোটের মূল্য সমান থাকে এবং ছোট দলগুলোরও সংসদে প্রবেশের সুযোগ তৈরি হয়।
বাংলাদেশে বর্তমানে প্রচলিত ব্যবস্থা হলো ফার্স্ট-পাস্ট-দ্য-পোস্ট (FPTP) পদ্ধতি, যেখানে প্রতিটি নির্বাচনী এলাকায় একজন প্রার্থী বিজয়ী হন—যিনি সংখ্যাগরিষ্ঠ ভোট না পেলেও সর্বাধিক ভোট পেলে আসন জয় করেন। এর ফলে অনেক সময় দেখা যায়, একটি দল মোট ভোটের তুলনায় অপ্রত্যাশিতভাবে বেশি আসন পায়, আর অপর দল ভোটের দিক থেকে শক্তিশালী হলেও আসন পায় খুব কম। এই বৈষম্যই পিআর পদ্ধতির আলোচনাকে নতুন করে প্রাসঙ্গিক করে তুলেছে।
পিআর পদ্ধতির সুবিধা: গণতন্ত্রে ভারসাম্য ও অন্তর্ভুক্তিঃ
প্রথমত, পিআর ব্যবস্থা গণতান্ত্রিক অন্তর্ভুক্তি বাড়ায়। ছোট ও নতুন রাজনৈতিক দলগুলো সংসদে প্রতিনিধিত্বের সুযোগ পায়, যা একক দলের আধিপত্য কমায় এবং রাজনৈতিক বহুত্ববাদকে উৎসাহিত করে।দ্বিতীয়ত, এই পদ্ধতিতে ভোটের মর্যাদা বহুলাংশে বৃদ্ধি পায়—কারণ প্রতিটি ভোটই সংসদে আসনে রূপান্তরিত হয়। এতে ভোটারদের আগ্রহ ও আস্থা বৃদ্ধি পেতে পারে।
তৃতীয়ত, একক দলের স্বৈরাচারী প্রবণতা কমে আসে, কারণ সংসদে সাধারণত জোট সরকার গঠনের প্রয়োজন হয়। এতে সিদ্ধান্ত গ্রহণে পরামর্শ, সংলাপ ও সমঝোতার সংস্কৃতি গড়ে ওঠে।চতুর্থত, পিআর পদ্ধতি কিছুটা হলেও নির্বাচনে কারচুপি ও প্রভাব কমাতে পারে, কারণ ফলাফল নির্ধারিত হয় সামগ্রিক ভোট শতাংশে, কোনো নির্দিষ্ট আসনে নয়।
অসুবিধা ও চ্যালেঞ্জ: বাস্তবতার মুখোমুখি পিআর ব্যবস্থাঃ
তবে পিআর পদ্ধতির কিছু বাস্তব জটিলতাও রয়েছে।প্রথমত, এতে প্রায়ই জোট সরকার গঠন করতে হয়, যা রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা সৃষ্টি করতে পারে। বহু দেশে দেখা গেছে—জোট সরকার ভাঙনের ফলে প্রশাসনিক স্থবিরতা তৈরি হয়।
দ্বিতীয়ত, ছোট ও উগ্র মতাদর্শের দলগুলো সংসদে প্রবেশ করতে পারে, যা রাজনৈতিক পরিবেশকে জটিল ও কখনও কখনও বিপজ্জনক করে তুলতে পারে।তৃতীয়ত, পিআর পদ্ধতিতে ভোটাররা সাধারণত দলকে ভোট দেন, প্রার্থীকে নয়। ফলে ভোটার ও জনপ্রতিনিধির সরাসরি সম্পর্ক দুর্বল হয়ে যায়, যা স্থানীয় সমস্যা সমাধানের ক্ষেত্রে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
চতুর্থত, বাংলাদেশের সংবিধান ও নির্বাচনী কাঠামো বর্তমানে এই পদ্ধতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। সংবিধানের ধারা ৬৫(২) অনুযায়ী সংসদীয় আসন নির্দিষ্ট ভৌগোলিক এলাকার ভিত্তিতে নির্ধারিত। পিআর পদ্ধতি চালু করতে হলে বড় ধরনের সাংবিধানিক ও প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার প্রয়োজন হবে।
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে পিআর পদ্ধতির সম্ভাবনাঃ
বাংলাদেশে পিআর পদ্ধতি চালু হলে সংসদে ভোটের প্রকৃত প্রতিফলন ঘটতে পারে এবং ছোট রাজনৈতিক দলগুলোও জাতীয় নীতিনির্ধারণে অংশগ্রহণের সুযোগ পাবে। তবে এর জন্য প্রয়োজন শক্তিশালী রাজনৈতিক সংস্কৃতি, সমঝোতামূলক মনোভাব ও প্রশাসনিক দক্ষতা।
বর্তমান বাস্তবতায়, যেখানে রাজনীতি এখনো ব্যক্তিকেন্দ্রিক ও দলীয় আধিপত্যে ভরপুর, সেখানে আনুপাতিক প্রতিনিধিত্বের মতো জটিল পদ্ধতি প্রয়োগ তাৎক্ষণিকভাবে সম্ভব নয়। তবে ভবিষ্যতে, যদি রাজনৈতিক দলগুলো পারস্পরিক আস্থা ও সহযোগিতার সংস্কৃতি গড়ে তুলতে পারে, তবে এটি একটি যুগান্তকারী পদক্ষেপ হতে পারে বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক বিকাশে।
সুতরাং আনুপাতিক প্রতিনিধিত্ব পদ্ধতি গণতন্ত্রকে আরও অন্তর্ভুক্তিমূলক, ভারসাম্যপূর্ণ ও অংশগ্রহণমূলক করতে পারে। তবে এটি শুধু একটি নির্বাচনী সংস্কার নয়—এটি একটি রাজনৈতিক সংস্কৃতির পরিবর্তন।
বাংলাদেশের জন্য এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো—রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে আস্থা ফিরিয়ে আনা, জনগণের ভোটাধিকারকে সর্বোচ্চ মর্যাদা দেওয়া এবং এমন একটি পরিবেশ তৈরি করা, যেখানে প্রতিটি ভোট সত্যিই গণতন্ত্রের প্রতিফলন ঘটাতে পারে।
লেখক: অ্যাডভোকেট মো. কামরুজ্জামান ভূঁইয়া
আইনজীবী, রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও কলাম লেখক
ঢাকা | ৯ নভেম্বর ২০২৫
অ্যাডভোকেট মো. কামরুজ্জামান ভূঁইয়া 






















