হাফিজ মাছুম আহমদ দুধরচকী,
নাহমাদুহু ওয়া নুসাল্লি আলা রাসূলিহিল কারীম, আম্মা বা’দ।
বস্তুগত, বুদ্ধিবৃত্তিক ও আধ্যাত্মিক সম্পদ—এসবই মানুষের চাহিদার অংশ। যারা বস্তুগত সম্পদ ও বস্তুগত আনন্দ বা তৃপ্তি থেকে নিজেদের বঞ্চিত করে, মহান আল্লাহ তাদের তিরস্কার করেছেন। এ প্রসঙ্গে সূরা আরাফের ৩২ নম্বর আয়াতে আল্লাহ বলেছেন:
“আপনি (রাসূল-সা.) বলুনঃ আল্লাহ সাজ-সজ্জাকে, যা তিনি বান্দাদের জন্যে সৃষ্টি করেছেন এবং সৃষ্টি করেছেন পবিত্র খাদ্যবস্তুগুলোকে—সেগুলোকে কে হারাম করেছে? আপনি বলুনঃ এসব নেয়ামত আসলে পার্থিব জীবনে মুমিনদের জন্যে এবং কিয়ামতের দিন খাঁটি বা খাসভাবে তাদেরই জন্যে। এমনিভাবে আমি আয়াতগুলো বিস্তারিত বর্ণনা করি তাদের জন্যে যারা বুঝে।”
অন্যদিকে যারা বস্তুগত সম্পদকে পুরোপুরি এড়িয়ে যেতে চান, তাদেরকেও যেমন ইসলাম সমর্থন করে না, তেমনি যারা এ ধরনের সম্পদের প্রতি মোহগ্রস্ত, ইসলাম তাদেরকেও বিভ্রান্ত বলে মনে করে। সূরা আলে ইমরানের ১৪ নম্বর আয়াতে আল্লাহ বলেছেন:
“মানবকূলকে মোহগ্রস্ত করেছে নারী, সন্তান-সন্ততি, রাশিকৃত সোনা-রূপা, চিহ্নিত বা বাছাইকৃত ঘোড়া, গবাদি পশুরাজি এবং ক্ষেত-খামারের মতো আকর্ষণীয় বস্তুসামগ্রী। এসবই হচ্ছে পার্থিব জীবনের ভোগ-সামগ্রী। আল্লাহর কাছেই রয়েছে উত্তম আশ্রয়।”
অন্য কথায়, পবিত্র কোরআনের দৃষ্টিতে ছয়টি বস্তুগত সম্পদের দিকেই রয়েছে সাধারণ মানুষের সবচেয়ে বেশি আকর্ষণ। এ ছয়টি সম্পদ হলো—নারী, সন্তান, নগদ অর্থ বা সোনা-রূপা, উন্নত প্রজাতির ঘোড়া বা আধুনিক যুগের প্রেক্ষাপটে গাড়ি, গৃহপালিত পশু এবং ক্ষেত-খামার বা কৃষিপণ্য।
কিন্তু কোরআন এটাও স্মরণ করিয়ে দিচ্ছে যে, এসব সম্পদই মানবজীবনের মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত নয়; বরং এসব সম্পদ হচ্ছে চূড়ান্ত সাফল্য অর্জনের জন্য মাধ্যম মাত্র। তাফসিরে নমূনা–এর ভাষ্য অনুযায়ী, আল্লাহ ধন-সম্পদ ও সন্তান-সন্ততি মানুষকে পরীক্ষা করার জন্য দান করেছেন, যাতে তারা শিক্ষা নেয় এবং আত্মগঠন ও পরিশুদ্ধির মাধ্যমে পরিপূর্ণতার দিকে এগিয়ে যায়। দুর্নীতি ও ধ্বংসযজ্ঞের জন্য আল্লাহ এসব সম্পদ মানুষকে দান করেননি।
তাই এটা স্পষ্ট, বস্তুগত সম্পদের প্রতি ভারসাম্যপূর্ণ আকর্ষণই ইসলামের কাম্য। এ ব্যাপারে অতিরিক্ত আকর্ষণ বা পুরোপুরি বর্জন—উভয় চরমপন্থার বিরোধিতা করে ইসলাম। স্বচ্ছল জীবন-যাপনের জন্য প্রচেষ্টা চালানোর পক্ষেও কথা বলে এ পবিত্র ধর্ম।
কিন্তু ইসলাম দরিদ্র ও বঞ্চিতদের অগ্রাহ্য করে মাত্রাতিরিক্ত সম্পদ জমাতে বা সম্পদের পাহাড় গড়ে তুলতে নিষেধ করে। এখন প্রশ্ন হলো, অস্থায়ী বস্তুগত সম্পদ কি মানুষের প্রকৃত সুখ ও শান্তির পাথেয় বা প্রকৃত সঞ্চয় হিসেবে বিবেচিত হতে পারে?
কাফের বা অবিশ্বাসীরা বস্তুগত সম্পদকেই জীবনের সবচেয়ে কাঙ্ক্ষিত বা গুরুত্বপূর্ণ বিষয় বলে মনে করে। কোরআন তাদের এ ধারণার অসারতা তুলে ধরেছে। অবিশ্বাসীরা মনে করে মানুষের বাহ্যিক সুন্দর চেহারা বা অবয়ব, দামি পোশাক, সম্পদ ও অর্থ-কড়ি প্রভৃতি ক্ষণস্থায়ী বিষয়গুলোই সবচেয়ে জরুরি সম্পদ। অথচ মানুষের জন্য সবচেয়ে জরুরি ও প্রকৃত স্থায়ী সম্পদ হলো সৎ চরিত্র এবং সৎ গুণাবলী তথা প্রকৃত মানুষ হিসেবে বিবেচিত হওয়ার মতো যোগ্যতা অর্জন। মানুষের এ সম্পদই অমূল্য বা কেনাবেচার সাধ্যাতীত।
সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ মহামানব বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মাদ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের আবির্ভাবের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য ছিল সুন্দর ও উন্নত নৈতিক গুণের প্রসার ঘটানো। তিনি নিজেই বলেছেন:
“নৈতিক গুণাবলীকে পরিপূর্ণতা দেওয়ার উদ্দেশ্যেই আমাকে রাসুল হিসেবে মনোনীত করা হয়েছে।”
কোরআনে বলা হয়েছে:
“নিশ্চয় সাফল্য লাভ করবে সে, যে শুদ্ধ হয়।” (সূরা আল-আ’লা)
এছাড়াও বলা হয়েছে:
“যে নিজেকে পরিশুদ্ধ করল, সে-ই সফল হলো এবং যে নিজেকে কলুষিত করল, সে ব্যর্থ হলো।” (সূরা আশ-শামস)
অন্য সব প্রাণীর সঙ্গে মানুষের পার্থক্য হলো, মানুষকে প্রাণপণ চেষ্টায় মানুষ হতে হয়। কেবল জ্ঞানই ভালো মানুষ হওয়ার মানদণ্ড নয়। তাই মুসলিম জ্ঞানী-গুণীদের মধ্যে প্রচলিত একটি গুরুত্বপূর্ণ বাণী হলো:
“জ্ঞানী হওয়া সহজ, কিন্তু মানুষ হওয়া কঠিন।”
পরিশুদ্ধ ও পবিত্র অন্তর ছাড়া মানুষ পূর্ণতার দিকে এগিয়ে যেতে পারে না।
সৎ গুণগুলোকে ফুলে-ফলে বিকশিত করাই মানুষের ধর্মীয় ও আধ্যাত্মিক সাধনার মূল লক্ষ্য। পবিত্র কোরআনের বিভিন্ন আয়াতে সৎকর্মশীল ও সদাচারীদের ব্যাপক প্রশংসা করা হয়েছে। যেমন সূরা আল-ফোরকানের ৬৩ নম্বর আয়াতে মহান আল্লাহ বলেছেন:
“রহমানের খাস বান্দা তো তারাই, যারা পৃথিবীতে নম্রভাবে চলাফেরা করে এবং অজ্ঞ লোকরা যখন তাঁদের সঙ্গে (অশালীন ভাষায়) কথা বলে, তখন তাঁরা (মহানুভবতা ও ক্ষমাশীলতা নিয়ে) বলেন, তোমাদের সালাম বা তোমরা শান্তিতে থাক।”
ন্যায়কামী, সৎ মানুষ ও সদাচারী হওয়ার আরেকটি সুবিধা হলো, তাঁরা মানুষের শ্রদ্ধা পান এবং মানুষের মন জয় করেন। আর যাদের নৈতিক চরিত্র দুর্বল বা যারা নীতিহীন, তারা ঈমানহীন মানুষের মতোই অন্যের অধিকার পদদলিত করে। যেমন, এ ধরনের মানুষ অন্যকে দেওয়া ওয়াদা বা প্রতিশ্রুতি লঙ্ঘন করে।
সূরা আলে ইমরানের ১৫৯ নম্বর আয়াতে মহান আল্লাহ বিশ্বনবী (সা.)-কে বলেছেন:
“আল্লাহর রহমতেই আপনি মানুষের জন্য কোমল হৃদয় হয়েছেন। কিন্তু আপনি যদি রাগী ও কঠিন হৃদয় হতেন, তাহলে তারা আপনার কাছ থেকে দূরে সরে যেত।”
বাংলায় একটি প্রবাদ বাক্য রয়েছে, যার মূল কথা হলো—মানুষের ব্যবহারই তার আসল পরিচয় তথা ভেতরের স্বরূপ ফুটিয়ে তোলে। তাই এটা স্পষ্ট, চরিত্র বা নৈতিকতাই হলো মানুষের জন্য সবচেয়ে দামী ও স্থায়ী সম্পদ। এ সম্পদের সঙ্গে বস্তুগত সম্পদের কোনো তুলনাই হয় না। অন্য সব কিছু হারিয়ে গেলেও সদগুণে বিভূষিত মানুষ মানবজাতির হৃদয়ে স্থায়ী স্থান লাভ করেন।
এখন কথা হলো, সৎ গুণাবলী কীভাবে অর্জন করা যায়? খোদাভীতি বা আল্লাহর ভয় এবং ইসলামী শিক্ষা ও বিধানের অনুসরণ সৎ গুণাবলী অর্জনের অন্যতম পন্থা। বেশি বেশি সৎ কাজ ও সদাচরণ মানুষের খারাপ স্বভাবকে দমিয়ে রাখে এবং ধীরে ধীরে নিঃশেষ করে দেয়।
কোনো কোনো মানুষ ঘরের বাইরে অন্যদের সঙ্গে ভালো আচরণ করলেও ঘরে এসে স্ত্রী-পুত্র ও পরিবার-পরিজনের সঙ্গে রূঢ় ও অশোভনীয় আচরণ করে। এ ধরনের মানুষকে ভালো মানুষ বলা যায় না। প্রকৃত চরিত্রবান ও সদাচারী তাকে বলা যায়, যিনি সব সময়ই ন্যায়বিচার বজায় রাখেন এবং সবার সঙ্গেই ভদ্র আচরণ করেন। মহাপুরুষদের জীবনী পড়ে এবং তাদের কর্মপন্থা অনুসরণ করেও আমরা সদগুণের অধিকারী হওয়ার চেষ্টা করতে পারি।
মৃত্যুর পর আমাদের আবার পুনরুত্থান হবে। তখন ইহজীবনের প্রতিটি কাজের জন্য হিসাব দিতে হবে। বিশেষ করে খারাপ বা অন্যায় কাজগুলোর জন্য কঠিন শাস্তি ভোগ করতে হবে—সে কথা সবারই মনে রাখা উচিত। আমাদের ভাবা উচিত, কবরের আজাবসহ পরকালের বা নরকের শাস্তি এত তীব্র ও দীর্ঘ যে তা সহ্য করার ক্ষমতা কোনো মানুষেরই নেই।
তাই আমাদের উচিত সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ মহামানব বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মাদ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের দেখানো পথে চলে শ্রেষ্ঠ নৈতিক গুণগুলো অর্জনের চেষ্টা করা এবং তাঁর আদর্শে আদর্শিত হওয়া। মহান আল্লাহ পাক আমাদের সকলকে হযরত মুহাম্মাদ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের আদর্শে আদর্শিত হওয়ার তাওফিক দান করুন।
আল্লাহুম্মা আমিন।
লেখক: জকিগঞ্জ উপজেলা সচেতন নাগরিক ফোরাম, সিলেট এবং সিলেটস্থ দুধরচক ঐক্য সংগঠনের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি; জাতীয় সাংবাদিক সংস্থা, সিলেট বিভাগ ও কম্বাইন্ড হিউম্যান রাইটার্স ওয়ার্ল্ড, সিলেট বিভাগের ভাইস প্রেসিডেন্ট; জাতীয় দৈনিক বিকাল বার্তা (ঢাকা)-এর স্টাফ রিপোর্টার; দৈনিক বিজয়ের কণ্ঠ, সিলেটের স্পেশাল রিপোর্টার; ২৪নং ওয়ার্ড বাংলাদেশ আঞ্জুমানে আল-ইসলাহ, সিলেট মহানগরের সাধারণ সম্পাদক; কদমতলী হযরত দরিয়া শাহ (রহ.) মাজার কেন্দ্রীয় জামে মসজিদের সাবেক ইমাম ও খতিব; তৈয়ব কামাল হযরত শাহজালাল (রহ.) লতিফিয়া হাফিজিয়া দাখিল মাদ্রাসার সাবেক প্রধান শিক্ষক; হযরত শাহজালাল (রহ.) ৩৬০ আউলিয়া লতিফিয়া হাফিজিয়া মাদ্রাসা, উপশহর, সিলেটের সাবেক প্রতিষ্ঠাতা প্রিন্সিপাল; এবং হাবিবিয়া ওয়েলফেয়ার অরগানাইজেশন, জকিগঞ্জ, সিলেটের উপদেষ্টা।
Reporter Name 


















