
অ্যাড. মোঃ কামরুজ্জামান ভূঁইয়া,
১৪ই ডিসেম্বর—শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবস:
বাংলাদেশের ইতিহাসের এক গভীর বেদনার দিন। এই দিনে ১৯৭১ সালে পরিকল্পিতভাবে হত্যা করা হয় এ দেশের শ্রেষ্ঠ সন্তানদের—শিক্ষক, চিকিৎসক, প্রকৌশলী, সাংবাদিক, সাহিত্যিক, গবেষক ও চিন্তাবিদদের। পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী ও তাদের দোসররা জানত, বুদ্ধিজীবীদের নিশ্চিহ্ন করা গেলে একটি জাতিকে দীর্ঘদিন মেধাশূন্য করে রাখা যাবে।
শহীদ বুদ্ধিজীবীরা শুধু ব্যক্তি ছিলেন না—তাঁরা ছিলেন জাতির বিবেক, চিন্তার বাতিঘর, ভবিষ্যৎ নির্মাণের কারিগর। তাঁদের হত্যার মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ একটি ভয়াবহ শূন্যতার মুখে পড়ে, যার ক্ষত আজও পুরোপুরি পূরণ হয়নি।

বুদ্ধিজীবী হত্যা: রাজনৈতিক অপরাধের চরম রূপ বুদ্ধিজীবী হত্যাকাণ্ড ছিল একটি রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত ও কৌশলগত অপরাধ।
এর লক্ষ্য ছিল সদ্য জন্ম নিতে থাকা রাষ্ট্রকে নেতৃত্বশূন্য, চিন্তাশূন্য ও নৈতিকভাবে দুর্বল করে দেওয়া। এই হত্যাযজ্ঞ আমাদের শিখিয়েছে—রাজনীতি যখন মানবতা ও নৈতিকতা হারায়, তখন তা জাতির অস্তিত্বের জন্য হুমকি হয়ে ওঠে।
আজকের বাংলাদেশ ও রাজনীতির বাস্তবতা আজ স্বাধীনতার পাঁচ দশক পেরিয়ে বাংলাদেশ রাষ্ট্রীয়ভাবে অনেক দূর এগিয়েছে।
কিন্তু প্রশ্ন থেকে যায়—
আমরা কি শহীদ বুদ্ধিজীবীদের আদর্শ ধারণ করতে পেরেছি?
আজকের রাজনীতিতে আমরা দেখতে পাই—ভিন্নমতকে সহ্য করার প্রবণতা কমে যাচ্ছে,যুক্তির জায়গায় গালি ও অপপ্রচার প্রাধান্য পাচ্ছে।
বুদ্ধিবৃত্তিক আলোচনা ও নীতিনির্ভর রাজনীতির পরিবর্তে ক্ষমতার রাজনীতি জেঁকে বসেছে চিন্তাশীল মানুষদের রাজনীতি থেকে দূরে সরিয়ে রাখা হচ্ছে, এই বাস্তবতা শহীদ বুদ্ধিজীবীদের আত্মত্যাগের সঙ্গে সাংঘর্ষিক।
বুদ্ধিজীবী ও রাজনীতি: বিচ্ছিন্নতা কেন বিপজ্জনক
একটি সুস্থ রাষ্ট্রে বুদ্ধিজীবী ও রাজনীতির মধ্যে একটি গঠনমূলক সম্পর্ক থাকা জরুরি।
কিন্তু আজ আমরা দেখি—অনেক ক্ষেত্রে বুদ্ধিজীবীরা রাজনৈতিক সুবিধার অংশ হয়ে যাচ্ছেন, আবার অনেক ক্ষেত্রে প্রকৃত চিন্তাশীল মানুষ রাজনীতি থেকে দূরে থাকছেন।
ফলে রাজনীতিতে—গভীর গবেষণার অভাব
নৈতিক দিকনির্দেশনার ঘাটতি
রাষ্ট্রচিন্তায় দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার সংকট
এই শূন্যতাই একটি জাতিকে ধীরে ধীরে দুর্বল করে দেয়।
শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবস আমাদের কী শিক্ষা দেয়
শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবস শুধু শোকের দিন নয়, এটি আত্মসমালোচনার দিন।
এই দিন আমাদের প্রশ্ন করতে শেখায়—
আমরা কি সত্য ও ন্যায়ের পক্ষে দাঁড়াতে পারছি?
মতপ্রকাশের স্বাধীনতা কি যথাযথভাবে নিশ্চিত হচ্ছে?
রাজনীতিতে নৈতিকতা ও আদর্শ কি প্রাধান্য পাচ্ছে?
যদি এসব প্রশ্নের উত্তর নেতিবাচক হয়, তবে আমাদের নতুন করে ভাবতে হবে।
রাজনীতির সংস্কার ও বুদ্ধিবৃত্তিক পুনর্জাগরণ
বাংলাদেশের রাজনীতিকে সুস্থ করতে হলে প্রয়োজন—
নীতিনিষ্ঠ ও শিক্ষিত নেতৃত্ব
ভিন্নমতের প্রতি শ্রদ্ধা
গবেষণা ও যুক্তিনির্ভর সিদ্ধান্ত গ্রহণ
বুদ্ধিজীবীদের স্বাধীন ও গঠনমূলক ভূমিকা
শহীদ বুদ্ধিজীবীদের প্রকৃত সম্মান তখনই নিশ্চিত হবে,
যখন রাজনীতি হবে মানবিক, দায়িত্বশীল ও ভবিষ্যতমুখী।
শহীদ বুদ্ধিজীবীরা আমাদের জন্য রেখে গেছেন এক কঠিন দায়িত্ব—সত্যের পক্ষে দাঁড়ানোর সাহস, অন্যায়ের বিরুদ্ধে কথা বলার শক্তি,
আর একটি ন্যায়ভিত্তিক রাষ্ট্র গঠনের স্বপ্ন। আজকের বাংলাদেশে রাজনীতি যদি সেই আদর্শ থেকে বিচ্যুত হয়, তবে শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবস কেবল আনুষ্ঠানিকতায় সীমাবদ্ধ থাকবে।
এই দিনে আমাদের শপথ হওয়া উচিত—রাজনীতিকে আবার মানুষের কল্যাণ, জ্ঞান ও নৈতিকতার পথে ফিরিয়ে আনা।
এটাই শহীদ বুদ্ধিজীবীদের প্রতি আমাদের প্রকৃত শ্রদ্ধা।
Reporter Name 



























