
—মানিক লাল ঘোষ—
ক্যালেন্ডারের পাতায় আগস্ট মাস এলেই বাঙালি জাতির হৃদয়ে নেমে আসে গভীর শোক ও বেদনার আবহ। জাতীয় ইতিহাসে আগস্ট শুধু একটি মাস নয়; এটি রক্তাক্ত স্মৃতি, হারানোর বেদনা এবং জাতির জীবনে ঘটে যাওয়া এক ভয়াবহ ট্র্যাজেডির প্রতীক। ১৯৭৫ সালের এই আগস্টেই বাঙালি হারিয়েছিল স্বাধীন বাংলাদেশের স্থপতি, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে। তাঁর সঙ্গে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়েছিল পরিবারের অধিকাংশ সদস্যকে। তাই প্রতিবছর আগস্ট আমাদের সামনে তুলে ধরে এক অপূরণীয় শূন্যতা ও জাতীয় বেদনার স্মারক।
১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টের ভোরে ধানমন্ডির ঐতিহাসিক ৩২ নম্বরের বাসভবনে সংঘটিত হয় মানব ইতিহাসের অন্যতম নৃশংস হত্যাকাণ্ড। ঘাতকদের নির্মম হামলায় সেদিন শহিদ হন জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, তাঁর সহধর্মিণী বঙ্গমাতা বেগম ফজিলাতুন্নেছা মুজিব, জ্যেষ্ঠ পুত্র বীর মুক্তিযোদ্ধা শেখ কামাল, পুত্রবধূ সুলতানা কামাল, দ্বিতীয় পুত্র লেফটেন্যান্ট শেখ জামাল, পুত্রবধূ পারভীন জামাল রোজী, কনিষ্ঠ পুত্র শিশু শেখ রাসেলসহ পরিবারের সদস্যরা। একই ঘটনায় বঙ্গবন্ধুর ভাই শেখ নাসের, ব্যক্তিগত নিরাপত্তা কর্মকর্তা কর্নেল জামিল উদ্দিন আহমেদসহ নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা কয়েকজন সদস্যও শহিদ হন।
সেই কালরাতে বঙ্গবন্ধুর নিকটাত্মীয় ও রাজনৈতিক সহযোদ্ধারাও রক্ষা পাননি। বঙ্গবন্ধুর ভাগ্নে, যুবলীগের প্রতিষ্ঠাতা শেখ ফজলুল হক মণি ও তাঁর অন্তঃসত্ত্বা স্ত্রী আরজু মণিকে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়। একইভাবে বেইলি রোডে বঙ্গবন্ধুর ভগ্নিপতি ও তৎকালীন মন্ত্রী আবদুর রব সেরনিয়াবাতের বাসভবনে হামলা চালিয়ে তাঁকেও পরিবারের সদস্যসহ হত্যা করা হয়।
১৫ আগস্টের হত্যাকাণ্ড শুধু একটি পরিবারের ওপর আঘাত ছিল না; এটি ছিল সদ্য স্বাধীন বাংলাদেশের অগ্রযাত্রাকে থামিয়ে দেওয়ার একটি সুদূরপ্রসারী ষড়যন্ত্র। স্বাধীনতার নেতৃত্বকে নিশ্চিহ্ন করে রাষ্ট্রের গতিপথ পরিবর্তনের চেষ্টা করা হয়েছিল। তবে সৌভাগ্যক্রমে বঙ্গবন্ধুর দুই কন্যা শেখ হাসিনা ও শেখ রেহানা সে সময় বিদেশে অবস্থান করায় প্রাণে বেঁচে যান।
ইতিহাসের শিক্ষা হলো—অস্ত্র দিয়ে মানুষকে হত্যা করা যায়, কিন্তু আদর্শকে নিশ্চিহ্ন করা যায় না। বঙ্গবন্ধুর স্বপ্ন, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা এবং স্বাধীনতার মূল্যবোধ আজও বাঙালির জাতীয় জীবনে গুরুত্বপূর্ণ শক্তি হিসেবে বিদ্যমান।
আগস্ট মাস শুধু শোকের মাস নয়, এটি আত্মবিশ্লেষণ ও দায়িত্ব পালনের মাস। এই মাস আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয়—জাতীয় ঐক্য, গণতন্ত্র, আইনের শাসন ও সুশাসন প্রতিষ্ঠার জন্য সবাইকে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে। বর্তমান পরিবর্তনশীল রাজনৈতিক বাস্তবতায় দেশের স্বার্থকে প্রাধান্য দিয়ে বিভাজন ও সংকীর্ণতার ঊর্ধ্বে উঠে একটি সমৃদ্ধ, গণতান্ত্রিক ও বৈষম্যহীন বাংলাদেশ গড়ার প্রত্যয় নিতে হবে।
নতুন প্রজন্মের কাছে সঠিক ইতিহাস তুলে ধরা আমাদের অন্যতম দায়িত্ব। ইতিহাসের সত্য জানা, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ধারণ করা এবং দেশের গণতান্ত্রিক অগ্রযাত্রাকে এগিয়ে নেওয়ার মধ্য দিয়েই ভবিষ্যৎ প্রজন্ম একটি উন্নত ও মানবিক রাষ্ট্র নির্মাণে ভূমিকা রাখতে পারবে।
আজকের দিনে রাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় প্রয়োজন হলো মানুষের মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করা, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা রক্ষা করা এবং আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করা। একটি স্বাধীন দেশের নাগরিক হিসেবে আমাদের প্রত্যেকের দায়িত্ব—দেশের সার্বভৌমত্ব, শান্তি ও উন্নয়নের জন্য ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করা।
শোকের এই আগস্টে গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করছি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, বঙ্গমাতা বেগম ফজিলাতুন্নেছা মুজিব, শেখ কামাল, সুলতানা কামাল, শেখ জামাল, পারভীন জামাল রোজী, শিশু শেখ রাসেল, শেখ নাসের, কর্নেল জামিল উদ্দিন আহমেদ, শেখ ফজলুল হক মণি, আরজু মণি, আবদুর রব সেরনিয়াবাতসহ ১৫ আগস্টের সকল শহিদকে।
তাঁদের আত্মত্যাগ আমাদের দেশপ্রেম, মানবিকতা ও দায়িত্ববোধের পথে এগিয়ে যাওয়ার প্রেরণা হয়ে থাকুক। শোক হোক শক্তির উৎস, আর অসাম্প্রদায়িক ও মানবিক চেতনা হোক আমাদের আগামীর পথচলার আলোকবর্তিকা।
মানিক লাল ঘোষ
সাংবাদিক, কলামিস্ট ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক
ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়নের সাবেক সহ-সভাপতি
Reporter Name 






















