খাদেমুল ইসলাম,
পঞ্চগড় জেলা প্রতিনিধি
কাগজে-কলমে সার সংকট নেই। তবে মাঠের চিত্র বলছে ভিন্ন কথা। আমন ধান ও আগাম শীতকালীন সবজি চাষের গুরুত্বপূর্ণ সময়ে প্রয়োজনীয় সার না পেয়ে দুশ্চিন্তায় পড়েছেন তেঁতুলিয়ার কৃষকরা। দিনের পর দিন ডিলার ও খুচরা বিক্রেতার দোকানে ঘুরেও চাহিদামতো ইউরিয়া, টিএসপি, ডিএপি ও পটাশ সার মিলছে না বলে অভিযোগ করেছেন তারা।
কেউ সার না পেয়েই জমিতে আমনের চারা রোপণ করছেন, আবার কেউ বাড়তি দাম দিয়েও প্রয়োজনীয় সার সংগ্রহ করতে পারছেন না। সোমবার দুপুরে তেঁতুলিয়া উপজেলার তিরনই হাট ইউনিয়নের বিভিন্ন এলাকায় সরেজমিনে গিয়ে এমন চিত্র দেখা গেছে।
এক সপ্তাহ ধরে সার খুঁজেও মিলছে না
তিরনই হাট ইউনিয়নের যুগিগছ গ্রামের কৃষক মো. মোস্তফা, মুজাম্মেল হক ও মোকলেছুর রহমান জানান, প্রায় এক সপ্তাহ ধরে জমির জন্য প্রয়োজনীয় সার সংগ্রহে ডিলারের কাছে ধরনা দিয়েও তারা চাহিদামতো সার পাননি। পরে তারা তেঁতুলিয়া কৃষি অফিসে যোগাযোগ করেন।
ক্ষোভের সঙ্গে মুজাম্মেল হক বলেন, “অন্তত কিছু টিএসপি সার দিতে পারলেও ভালো হতো। পরে যদি পাওয়া যায়, সেই আশা নিয়েই আবাদ করছি।”
একই এলাকার কৃষক মোকলেছুর রহমান বলেন, “এক একর জমিতে আমন লাগানোর আগে টিএসপি, পটাশ ও ডিএপি সার দরকার। কয়েক দিন ধরে চেষ্টা করেও প্রয়োজনীয় সার জোগাড় করতে পারছি না।”
শুধু যুগিগছ গ্রামের এসব কৃষকই নন, একই এলাকার শত শত সবজি ও আমন চাষি সার সংগ্রহের জন্য ডিলার ও খুচরা বিক্রেতার দোকানে ঘুরছেন বলে দাবি করেছেন কৃষকরা। তাদের অভিযোগ, প্রয়োজনের সময় সার না পাওয়ায় চাষাবাদ নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।
চাহিদার তুলনায় সরবরাহ কম, দাবি বিক্রেতাদের
তেঁতুলিয়া এলাকার খুচরা সার বিক্রেতা আব্দুল রাজ্জাকের দোকানে গিয়ে দেখা যায়, আমন ধানের জন্য ইউরিয়া এবং আগাম কপি চাষের জন্য টিএসপি ও পটাশ সার নিতে কৃষকদের ভিড় রয়েছে। তবে চাহিদার তুলনায় সরবরাহ কম থাকায় অনেককেই সার না পেয়ে ফিরে যেতে হচ্ছে বলে জানান সংশ্লিষ্টরা।
কৃষক হাসান আলী বলেন, “তিন দিন ধরে সারের দোকানে ঘুরছি। প্রতি কেজিতে দুই-তিন টাকা বেশি দিয়েও কিনতে রাজি আছি। কিন্তু সারই পাওয়া যাচ্ছে না।”
আরেক কৃষক জানান, এক একর আমন জমিতে তার অন্তত ৩০ কেজি ইউরিয়া সার প্রয়োজন। কিন্তু চার দিন ঘুরে তিনি মাত্র ১০ কেজি ইউরিয়া সংগ্রহ করতে পেরেছেন।
খুচরা সার বিক্রেতা নাছির ও মুক্তার হোসেন বলেন, “এলাকার ডিলারের কাছে সার মিলছে না। সারের জন্য প্রতিনিয়ত কৃষকদের হাহাকার। মাঠে আমনের ধান হলুদ বর্ণ ধারণ করেছে।”
ডিলারের দোকানেও কৃষকদের ভিড়
বাংলাবান্ধা, তিরনই হাট ও তেঁতুলিয়া ইউনিয়নের রাসায়নিক সার ডিলার মেসার্স সাকিব ট্রেডার্সের দোকানেও সকালে কৃষকদের ভিড় দেখা যায়। কেউ কৃষি কার্ড, আবার কেউ জাতীয় পরিচয়পত্র নিয়ে সার সংগ্রহের চেষ্টা করছেন। তবে অনেকেই সার না পেয়ে বাড়ি ফিরে যাচ্ছেন বলে জানান কৃষকরা।
ডিলার জানান, চলতি মাসে তার নামে ৪৫ মেট্রিক টন সার বরাদ্দ রয়েছে। এর মধ্যে মাস শুরুর আগেই আগস্ট-সেপ্টেম্বর সময়ে কৃষি কর্মকর্তাদের উপস্থিতিতে ১৮ মেট্রিক টন সার উত্তোলন করে বিতরণ করা হয়েছে।
আগাম সবজি চাষেও শঙ্কা
কৃষকদের ভাষ্য, তেঁতুলিয়া ইউনিয়ন অন্যতম সবজিপ্রধান এলাকা। বিশেষ করে শারিয়াল জোত গ্রামে প্রায় ৩০ বছর ধরে আগাম কপি চাষ হয়ে আসছে। গ্রামের প্রায় এক হাজার পরিবারের মধ্যে অন্তত ৭০০ পরিবার কপি চাষের ওপর নির্ভরশীল বলে জানান স্থানীয়রা।
তবে চলতি মৌসুমে প্রয়োজনের সময়ে সার না পাওয়ায় এসব কৃষকের মধ্যে হতাশা দেখা দিয়েছে। কৃষকদের দাবি, শুধু সার না পাওয়াই নয়, কোথাও কোথাও বাড়তি দাম দিয়েও সার পাওয়া যাচ্ছে না। ফলে সময়মতো জমিতে সার প্রয়োগ করতে না পারলে উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি চাষের খরচও বেড়ে যেতে পারে।
কৃষি বিভাগের দাবি, জেলায় সার সংকট নেই
এদিকে কৃষি বিভাগ বলছে, জেলায় কোনো সার সংকট নেই। জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, চলতি আমন মৌসুমে প্রায় ১ লাখ ৩০ হাজার ৫৫০ হেক্টর জমিতে আমন চাষ হয়েছে। পাশাপাশি প্রায় ৬৫০ হেক্টর জমিতে আগাম শীতকালীন সবজি চাষের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে।
২০২৬-২৭ অর্থবছরে জেলায় ইউরিয়া সারের অনুমোদিত বরাদ্দ রয়েছে। পঞ্চগড় বিসিআইসি সার গুদামের তথ্য অনুযায়ী, মহানন্দা ট্রেডার্সের ১১৭ মেট্রিক টন বরাদ্দের বিপরীতে ৯৮ টন, আকিব এন্টারপ্রাইজের ১১৯ টনের বিপরীতে ৮০ টন, পিয়াশা এন্টারপ্রাইজের ১১৯ টনের বিপরীতে ১১২ টন এবং কেশব ট্রেডার্সের ১১৭ মেট্রিক টন বরাদ্দের বিপরীতে ৯৪ মেট্রিক টন সার উত্তোলনের তথ্য রয়েছে। এছাড়া নুরজাহান এন্টারপ্রাইজ ৯৭ টন, মেসার্স রুম্পা এন্টারপ্রাইজ ১০৯ মেট্রিক টন এবং মেসার্স সাকিব ট্রেডার্স তাদের বরাদ্দকৃত ১১৯ মেট্রিক টন সারই উত্তোলন করেছে বলে গুদাম সূত্রে উল্লেখ করা হয়েছে।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক কৃষিবিদ আব্দুল মতিন বলেন, “জেলায় কোনো সারের সংকট নেই। কৃষি কর্মকর্তারা মাঠপর্যায়ে সমস্যা সমাধানে কাজ করছেন। ফলে এখন কোথাও কোনো সমস্যা থাকার কথা নয়।”
তবে তেঁতুলিয়ার মাঠপর্যায়ের চিত্র ও কৃষকদের বক্তব্যে সার সরবরাহ নিয়ে ভিন্ন অভিজ্ঞতার কথা উঠে এসেছে। কৃষকদের দাবি, বরাদ্দ ও সরবরাহের হিসাব যাই থাকুক, প্রয়োজনের সময়ে ডিলারের দোকানে সার না পাওয়া গেলে সেই হিসাব তাদের কোনো কাজে আসে না।
কৃষকদের আশঙ্কা, দ্রুত চাহিদা অনুযায়ী সার সরবরাহ নিশ্চিত করা না গেলে আমন ও আগাম শীতকালীন সবজি চাষে নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।
Reporter Name 






















