
সুনামগঞ্জ প্রতিনিধি:
সুনামগঞ্জের তাহিরপুর উপজেলার যাদুকাটা নদীর লাউড়েরগড় এলাকায় নদীর পাড় কেটে অবৈধভাবে বালু উত্তোলনের অভিযোগ উঠেছে একটি স্থানীয় বালুখেকো সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে। এতে তীরবর্তী শতাধিক পরিবারের বসতবাড়ি, মিল-কারখানা এবং বৈদ্যুতিক কুটি নদীগর্ভে বিলীন হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, পাড় কেটে বালু-পাথর উত্তোলন বন্ধের দাবিতে সুনামগঞ্জ জেলা প্রশাসকসহ স্থানীয় প্রশাসনের বিভিন্ন দপ্তরে একাধিক অভিযোগ দেওয়া হলেও কার্যকরভাবে বন্ধ করা যাচ্ছে না এই অবৈধ কার্যক্রম।
স্থানীয়দের অভিযোগ, আওয়ামী লীগ সরকারের আমল থেকেই একটি চক্র যাদুকাটা নদী থেকে অবৈধভাবে বালু উত্তোলনের চেষ্টা চালিয়ে আসছে। এলাকাবাসী ও রাজনৈতিক ব্যক্তিদের প্রতিবাদের মুখে মাঝে মধ্যে সাময়িকভাবে কার্যক্রম বন্ধ থাকলেও বর্তমানে আবারও পুরোদমে শুরু হয়েছে পাড়কাটা।
এলাকাবাসী আশঙ্কা করছেন, দ্রুত ব্যবস্থা গ্রহণ না করা হলে যাদুকাটা নদীর তীরে অবস্থিত লাউড়েরগড়-ডালারপাড় গ্রামের অর্ধশতাধিক মিল-কারখানা, স্কুল, মসজিদ, বাজার ও বসতবাড়ি নদীগর্ভে বিলীন হয়ে যেতে পারে। একই সঙ্গে বৈদ্যুতিক কুটিও মারাত্মক ঝুঁকির মুখে রয়েছে। স্থানীয়দের দাবি, নদীর ভাঙন এখন বৈদ্যুতিক কুটি থেকে মাত্র ১৫ থেকে ২০ ফুট দূরে পৌঁছে গেছে। যেকোনো সময় পুরো এলাকা বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়তে পারে।
স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, প্রতিদিন রাতেই ডালারপাড় গ্রামের সায়েদ মিয়ার ছেলে সুমন মিয়া ও একই এলাকার ফরিদ মিয়াসহ একটি চক্র ড্রেজার মেশিন ব্যবহার করে অবৈধভাবে বালু উত্তোলন করছে। এতে পরিবেশ ও প্রতিবেশ মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
তারা আরও অভিযোগ করেন, সরকারি খনিজসম্পদ দীর্ঘদিন ধরে অবৈধভাবে দখলে রেখে প্রতি ফুট বালু ৪৫ টাকায় বিক্রি করা হচ্ছে। ফলে সরকার কোটি কোটি টাকার রাজস্ব হারাচ্ছে।
স্থানীয়দের মতে, এভাবে পাড় কাটতে থাকলে নদীতীরবর্তী মানুষের ঘরবাড়ি, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান, বাজার, মসজিদ ও মিল-কারখানা টিকিয়ে রাখা সম্ভব হবে না। পাশাপাশি হাজারো নৌ-শ্রমিক জীবিকা হারাবে এবং হাওর এলাকায় অকাল বন্যার ঝুঁকি আরও বাড়বে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক শ্রমিক বলেন, “পাড়কাটার বিরুদ্ধে আমি বহুবার জেলা ও উপজেলা প্রশাসনের দ্বারস্থ হয়েছি। প্রশাসনের নির্দেশে দু-একদিন বন্ধ থাকলেও অদৃশ্য কারণে আবারও শুরু হয় পাড়কাটার মহোৎসব। বালু-পাথর খেকো সিন্ডিকেটের কারণে তীরবর্তী পরিবারগুলো এখন চরম ঝুঁকিতে রয়েছে।”
বাদাঘাট পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ মো. নাজমুল ইসলাম বলেন, “ফাঁড়িতে যোগদানের পর গত এক মাসে দুটি মাদক মামলা, বালু ও মাটি ব্যবস্থাপনা আইনে পাঁচটি মামলা এবং অবৈধ পাড় কাটার অপরাধে আটটি ড্রেজার ধ্বংস করা হয়েছে। পাড় কাটার সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে অভিযান অব্যাহত রয়েছে।”
তাহিরপুর থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মো. আমিনুল ইসলাম বলেন, “পাড় কাটার অপরাধে দু’দিন আগেও মামলা হয়েছে। অবৈধ বালু উত্তোলন রোধে নদীতে আমাদের অভিযান চলমান রয়েছে।”
তাহিরপুর উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) শাহরুখ আলম শান্তনুর সঙ্গে মোবাইল ফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি।
সুনামগঞ্জ পরিবেশ অধিদপ্তরের কর্মকর্তা মোহাইমিনুল হক বলেন, “আমাদের জনবল অনেক কম। পাড় কাটার বিষয়টি মূলত ভূমি অধিদপ্তর দেখে। তবে পরিবেশ আইনে ইতোমধ্যে কয়েকটি মামলা করা হয়েছে।”
তাহিরপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মেহেদী হাসান মানিক বলেন, “লাউড়েরগড় বাজারসংলগ্ন যাদুকাটা নদীর তীর কেটে বালু উত্তোলনের ঘটনায় বৃহস্পতিবার দুপুরে অভিযান চালিয়ে নৌকাসহ একজনকে আটক করা হয়েছে। ভবিষ্যতেও যে বা যারাই পাড় কেটে বালু উত্তোলন করবে, তাদের বিরুদ্ধে বালু ও মাটি ব্যবস্থাপনা আইনে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
Reporter Name 
























