
বাংলাদেশের রাজনীতি, মুক্তিযুদ্ধ, সামরিক জীবন এবং ক্রীড়াঙ্গনে সমান দক্ষতার স্বাক্ষর রাখা বিরল ব্যক্তিত্বদের অন্যতম বীর বিক্রম হাফিজ উদ্দিন আহমদ। একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা, সাবেক সেনা কর্মকর্তা, খ্যাতিমান ফুটবলার, ক্রীড়া সংগঠক, সফল রাজনীতিবিদ এবং লেখক হিসেবে তিনি দীর্ঘ কয়েক দশক ধরে দেশ ও জাতির সেবায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে চলেছেন। বর্তমানে তিনি বাংলাদেশের ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।
জন্ম ও শিক্ষাজীবন

হাফিজ উদ্দিন আহমদের জন্ম ১৯৪৪ সালের ২৯ অক্টোবর ভোলা জেলার লালমোহনে এক সম্ভ্রান্ত পরিবারে। তাঁর পিতা আজাহার উদ্দিন আহম্মদ ছিলেন প্রখ্যাত চিকিৎসক ও রাজনীতিবিদ। তিনি ১৯৬৩ ও ১৯৬৫ সালে প্রাদেশিক পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হন এবং ১৯৭০ সালে আওয়ামী লীগের প্রার্থী হিসেবে জাতীয় পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হন। তাঁর মায়ের নাম করিমুন্নেছা।
চার ভাই ও দুই বোনের মধ্যে হাফিজ উদ্দিন ছিলেন সবার বড়। তিনি ১৯৫৯ সালে বরিশাল জিলা স্কুল থেকে ম্যাট্রিক এবং ১৯৬১ সালে সরকারি ব্রজমোহন কলেজ থেকে আইএ পাস করেন। এরপর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ থেকে ১৯৬৪ সালে বিএ (সম্মান) এবং ১৯৬৫ সালে এমএ ডিগ্রি অর্জন করেন।
সামরিক জীবন ও মহান মুক্তিযুদ্ধ
উচ্চশিক্ষা শেষে ১৯৬৮ সালে তিনি পাকিস্তান সেনাবাহিনীতে কমিশন লাভ করেন এবং প্রথম ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টে যোগ দেন। ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে পাকিস্তানি বাহিনীর বিরুদ্ধে সশস্ত্র প্রতিরোধে অংশগ্রহণ করেন।
মুক্তিযুদ্ধে তিনি কামালপুর, ধলই বিওপি, কানাইঘাট এবং সিলেটের এমসি কলেজসহ একাধিক গুরুত্বপূর্ণ যুদ্ধে নেতৃত্ব দেন। বিশেষ করে ১৯৭১ সালের ৩১ জুলাই কামালপুর যুদ্ধে বি কোম্পানির কমান্ডার হিসেবে তাঁর অসীম সাহসিকতা ইতিহাসে স্মরণীয় হয়ে আছে। যুদ্ধ চলাকালে তিনি গুরুতর আহত হলেও নেতৃত্ব থেকে সরে দাঁড়াননি।
দেশের স্বাধীনতার জন্য অসামান্য বীরত্ব ও অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ বাংলাদেশ সরকার তাঁকে “বীর বিক্রম” খেতাবে ভূষিত করে।
স্বাধীনতার পরও তিনি বাংলাদেশ সেনাবাহিনীতে দায়িত্ব পালন করেন এবং পরবর্তীতে অবসর গ্রহণ করেন।
ক্রীড়াঙ্গনে উজ্জ্বল অধ্যায়
রাজনীতি ও সামরিক জীবনের পাশাপাশি ক্রীড়াক্ষেত্রেও হাফিজ উদ্দিন আহমদের অর্জন অসাধারণ।
তিনি ১৯৬৭ থেকে ১৯৭০ সাল পর্যন্ত পাকিস্তান জাতীয় ফুটবল দলের খেলোয়াড় ছিলেন এবং ১৯৭০ সালে দলটির অধিনায়কের দায়িত্ব পালন করেন। এছাড়া ঢাকা মোহামেডান স্পোর্টিং ক্লাব, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এবং সম্মিলিত বিশ্ববিদ্যালয় দলের অধিনায়ক হিসেবেও সফলতার পরিচয় দেন।
ফুটবলের পাশাপাশি অ্যাথলেটিক্সেও তিনি ছিলেন অনন্য। ১৯৬৪, ১৯৬৫ ও ১৯৬৬ সালে টানা তিনবার পূর্ব পাকিস্তানের দ্রুততম মানব নির্বাচিত হন এবং ১০০ ও ২০০ মিটার দৌড়ে স্বর্ণপদক ও রেকর্ড গড়েন।
পরবর্তীতে তিনি বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশনের সভাপতি, এশিয়ান ফুটবল কনফেডারেশনের নির্বাচিত সহ-সভাপতি এবং ফিফার আপিল ও ডিসিপ্লিনারি কমিটির সদস্য হিসেবে আন্তর্জাতিক পর্যায়েও দেশের প্রতিনিধিত্ব করেন।
ক্রীড়াক্ষেত্রে অসামান্য অবদানের জন্য তিনি ১৯৮০ সালে জাতীয় ক্রীড়া পুরস্কার লাভ করেন।

রাজনৈতিক জীবন
সেনাবাহিনী থেকে অবসরের পর তিনি সক্রিয় রাজনীতিতে যোগ দেন। ১৯৮৬ ও ১৯৮৮ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জাতীয় পার্টির মনোনয়নে ভোলা-৩ আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন।
১৯৯১ সালে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়ার পর ১৯৯২ সালে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলে (বিএনপি) যোগ দেন। এরপর বিএনপির মনোনয়নে একাধিকবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়ে দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেন।
তিনি বিভিন্ন সময়ে বাণিজ্য প্রতিমন্ত্রী, পাটমন্ত্রী, পানিসম্পদমন্ত্রী এবং বাণিজ্যমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন।
পরবর্তীকালে তিনি বিএনপির সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী ফোরাম জাতীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন।
জাতীয় নেতৃত্বে নতুন অধ্যায়
২০২৬ সালে তিনি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদে প্রথমে মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব লাভ করেন। একই বছরের ১২ মার্চ জাতীয় সংসদের স্পিকার হিসেবে নির্বাচিত হন।
পরবর্তীতে সাংবিধানিক দায়িত্বের অংশ হিসেবে তিনি বাংলাদেশের ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ সাংবিধানিক পদে তাঁর অধিষ্ঠান দেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
লেখক হিসেবে

রাষ্ট্র, গণতন্ত্র, মুক্তিযুদ্ধ ও সামরিক জীবনের নানা অভিজ্ঞতা নিয়ে তিনি বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থ রচনা করেছেন। উল্লেখযোগ্য গ্রন্থসমূহ হলো:
গণতন্ত্র রিমান্ডে
রক্তে ভেজা একাত্তর
সৈনিক জীবন: গৌরবের একাত্তর, রক্তাক্ত পঁচাত্তর
গৌরবাঙ্গনে
পারিবারিক জীবন
হাফিজ উদ্দিন আহমদের সহধর্মিণী দিলারা হাফিজ ১৯৪৯ সালের ২ জানুয়ারি সুনামগঞ্জে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি একজন সরকারি কলেজের অধ্যাপক ছিলেন। তাঁদের দুই পুত্র শাহরুখ হাফিজ ও তাহারাত হাফিজ এবং এক কন্যা শামামা শাহরীন।
দীর্ঘ ৫৪ বছরের সুখী দাম্পত্য জীবনের অবসান ঘটে ২০২৬ সালের ২৮ মার্চ, যখন চিকিৎসাধীন অবস্থায় সিঙ্গাপুর জেনারেল হাসপাতালে দিলারা হাফিজ ইন্তেকাল করেন।
মূল্যায়ন
বীর বিক্রম হাফিজ উদ্দিন আহমদের জীবন এক অনন্য প্রেরণার নাম। একজন সৈনিক হিসেবে দেশ রক্ষা, মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে স্বাধীনতার জন্য জীবন বাজি রাখা, ক্রীড়াবিদ হিসেবে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব, রাজনীতিবিদ হিসেবে রাষ্ট্র পরিচালনায় সক্রিয় ভূমিকা এবং লেখক হিসেবে ইতিহাস সংরক্ষণের প্রয়াস, সব মিলিয়ে তিনি বাংলাদেশের জনজীবনে এক বহুমাত্রিক ব্যক্তিত্ব।
দেশপ্রেম, নেতৃত্ব, সাহস, সততা ও কর্মনিষ্ঠার সমন্বয়ে গড়ে ওঠা তাঁর দীর্ঘ কর্মময় জীবন নতুন প্রজন্মের জন্য এক উজ্জ্বল অনুপ্রেরণা হয়ে থাকবে।
Reporter Name 



























