Dhaka ০৬:৪১ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ২১ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ৬ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
শিরনাম:
গরু-লাঙলের চাষাবাদ হারিয়ে যাচ্ছে, ঐতিহ্য আঁকড়ে ডিমলার বনমালী কক্সবাজার সরকারি কলেজের হোস্টেলে ২০ হাজার ইয়াবা, ছাত্রী গ্রেপ্তার নবীনগর শিবপুরে বসতভিটা নিয়ে বিরোধে হয়রানি ও দখলচেষ্টার অভিযোগ কাদের সিদ্দিকীর চিকিৎসা সম্পন্ন, দেশবাসীর কাছে দোয়া চেয়েছে কৃষক শ্রমিক জনতা লীগ দিনাজপুরের বীরগঞ্জে ভ্রাম্যমাণ আদালতে চিহ্নিত জুয়াড়ি মতিন ও মনজুরুলের জরিমানাসহ কারাদণ্ড কালিয়াকৈরে হাফেজ আলীমের বিরুদ্ধে মানববন্ধন ও বিক্ষোভ মোংলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের সড়ক ও ড্রেন সংস্কারের দাবিতে সোচ্চার নাগরিক সমাজ নাগরিক তথ্য অধিকার ফোরাম মধ্যনগর শাখার ২ বছর মেয়াদি কমিটি ঘোষণা কালীগঞ্জের মথুরেসপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আব্দুল হাকিমের স্ত্রীর দাফন সম্পন্ন কালীগঞ্জের মথুরেসপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আব্দুল হাকিমের স্ত্রীর দাফন সম্পন্ন
বিজ্ঞাপন :
জেলা-উপজেলা ও বিভাগীয় চীফ নিয়োগ দেয়া হচ্ছে। সাংবাদিকতায় আগ্রহীরা দ্রুত যোগাযোগ করুন। পরীক্ষামূলক সম্প্রচার ও নিবন্ধন প্রক্রিয়াধীন । সম্পদক-ইমদাদুল হক তৈয়ব-01711576603, সিভি পাঠান এই ইমেইলে- editor.manobjibon@gmail.com

গরু-লাঙলের চাষাবাদ হারিয়ে যাচ্ছে, ঐতিহ্য আঁকড়ে ডিমলার বনমালী

  • Reporter Name
  • সময়: ১২:৫৩:৪৪ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ২১ সেপ্টেম্বর ২০২৬
  • ১০ Time View

মোঃ বাদশা সেকেন্দার ভুট্টো,
ডিমলা (নীলফামারী) প্রতিনিধি:

সময়ের পরিবর্তন আর আধুনিক কৃষিপ্রযুক্তির বিস্তারে নীলফামারীর ডিমলা উপজেলায় হারিয়ে যেতে বসেছে গরু ও লাঙলনির্ভর চাষাবাদের ঐতিহ্য। একসময় যে লাঙল, জোয়াল আর বলদ গরু ও মহিষ ছিল গ্রামীণ কৃষকের নিত্যদিনের সঙ্গী, এখন তা অনেকটাই অতীতের স্মৃতিতে পরিণত হয়েছে। তবে আধুনিকতার এই সময়ে এখনও ঐতিহ্যবাহী পদ্ধতিতে জমি চাষ করে চলেছেন উপজেলার কয়েকজন কৃষক।

ডিমলা উপজেলার দক্ষিণ তিতপাড়া ঝেল্লাপাড়া গ্রামের বাসিন্দা বনমালী রায় (৭০) তাঁদেরই একজন। বয়সের ভারে ন্যুব্জ হলেও গরু ও লাঙলের মাধ্যমে চাষাবাদের পুরোনো পদ্ধতি ধরে রেখেছেন তিনি। অবশ্য আগের মতো বিস্তীর্ণ জমিতে নয়, বর্তমানে সামান্য কিছু জমিতেই এই পদ্ধতিতে চাষ করেন তিনি।

একই গ্রামের আবুল হাসেম (৬৫) বলেন, “গরু দিয়ে লাঙল চাষাবাদ আমাদের অতীতের অনেক স্মৃতিকে ঢেকে দিয়েছে। এখন সেই অতীতের কথা মনে পড়লে বড় অসহায় লাগে। এখন আধুনিক যন্ত্রের মাঝে আমাদের অতীতের স্মৃতি হারিয়ে গেছে।”

আরেক কৃষক মোঃ ফজলু ঘাটু (৭৭) নামের এক বৃদ্ধ তাঁর বাড়িতে নিয়ে গিয়ে স্মৃতি হিসেবে রাখা লাঙল, মইসহ কিছু সরঞ্জাম দেখান। একটি বাঁশের লাঠি দেখিয়ে তিনি বলেন, “এটাকে আমরা পেন্টি বলি। বাবা রে, এটা কি তোরা দেখেছিস? এটা দিয়ে আমরা গরুকে ভয় দেখিয়ে আমাদের মতো করে চাষ করে নিতাম।”

স্থানীয় বয়োজ্যেষ্ঠ কৃষকদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, আশি ও নব্বইয়ের দশকে ডিমলার গ্রামীণ কৃষিজীবনে গরু-লাঙলের ব্যবহার ছিল ব্যাপক। অনেক কৃষকের বাড়িতেই ছিল এক বা একাধিক জোড়া বলদ গরু। ভোরের আলো ফোটার আগেই কৃষকেরা গরুর ঘাড়ে জোয়াল তুলে মাঠের পথে রওনা দিতেন। দিনভর জমিতে হালচাষ শেষে সূর্যাস্তের পর ক্লান্ত শরীরে ফিরতেন বাড়িতে।

সে সময় কৃষিকাজে গবাদিপশুর গোবর সার ব্যবহারের প্রচলন ছিল। কৃষকেরা জমির উর্বরতা ধরে রাখতে প্রাকৃতিক উপকরণের ওপর নির্ভর করতেন। গ্রামীণ জীবনের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে ছিল গরু পালন, লাঙল তৈরি এবং মাঠে চাষাবাদের নানা প্রথা।

আরও পড়ুনঃ  কাদের সিদ্দিকীর চিকিৎসা সম্পন্ন, দেশবাসীর কাছে দোয়া চেয়েছে কৃষক শ্রমিক জনতা লীগ

কিন্তু সময়ের সঙ্গে কৃষিতে এসেছে ব্যাপক পরিবর্তন। পাওয়ার টিলার, ট্রাক্টরসহ বিভিন্ন আধুনিক যন্ত্রপাতির ব্যবহার বেড়ে যাওয়ায় দ্রুত ও কম সময়ে জমি চাষ করা সম্ভব হচ্ছে। ফলে গরু-লাঙলের প্রয়োজনীয়তা কমেছে, আর ধীরে ধীরে হারিয়ে যাচ্ছে এই ঐতিহ্যবাহী কৃষিপদ্ধতি।

বয়োজ্যেষ্ঠ কৃষকদের ভাষ্য, আধুনিক কৃষিযন্ত্র কাজের গতি বাড়িয়েছে এবং শ্রম ও সময় সাশ্রয় করেছে। তবে এর ফলে গ্রামবাংলার কৃষিজীবনের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা অনেক পুরোনো রীতি ও চর্চা এখন আর আগের মতো দেখা যায় না। একসময় মাঠে মাঠে শোনা যেত লাঙলের শব্দ, কৃষকের হাঁকডাক ও রাখালদের সুর। বর্তমানে সেই পরিচিত দৃশ্য অনেকটাই বিলীন।

বনমালী রায়ের মতো কৃষকেরা ঐতিহ্য ধরে রাখলেও গরু-লাঙলের চাষাবাদ এখন আর প্রধান কৃষিপদ্ধতি নয়। আধুনিক প্রযুক্তির অগ্রযাত্রার পাশাপাশি পুরোনো কৃষিসংস্কৃতির এই নিদর্শনগুলোও ধীরে ধীরে হারিয়ে যাচ্ছে। ফলে ডিমলার গ্রামীণ জীবনে গরু-লাঙলের চাষাবাদ আজ কেবল কৃষিকাজের একটি পদ্ধতি নয়, বরং অতীতের এক স্মরণীয় অধ্যায়।

Tag :
জনপ্রিয় নিউজ

গরু-লাঙলের চাষাবাদ হারিয়ে যাচ্ছে, ঐতিহ্য আঁকড়ে ডিমলার বনমালী

গরু-লাঙলের চাষাবাদ হারিয়ে যাচ্ছে, ঐতিহ্য আঁকড়ে ডিমলার বনমালী

সময়: ১২:৫৩:৪৪ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ২১ সেপ্টেম্বর ২০২৬

মোঃ বাদশা সেকেন্দার ভুট্টো,
ডিমলা (নীলফামারী) প্রতিনিধি:

সময়ের পরিবর্তন আর আধুনিক কৃষিপ্রযুক্তির বিস্তারে নীলফামারীর ডিমলা উপজেলায় হারিয়ে যেতে বসেছে গরু ও লাঙলনির্ভর চাষাবাদের ঐতিহ্য। একসময় যে লাঙল, জোয়াল আর বলদ গরু ও মহিষ ছিল গ্রামীণ কৃষকের নিত্যদিনের সঙ্গী, এখন তা অনেকটাই অতীতের স্মৃতিতে পরিণত হয়েছে। তবে আধুনিকতার এই সময়ে এখনও ঐতিহ্যবাহী পদ্ধতিতে জমি চাষ করে চলেছেন উপজেলার কয়েকজন কৃষক।

ডিমলা উপজেলার দক্ষিণ তিতপাড়া ঝেল্লাপাড়া গ্রামের বাসিন্দা বনমালী রায় (৭০) তাঁদেরই একজন। বয়সের ভারে ন্যুব্জ হলেও গরু ও লাঙলের মাধ্যমে চাষাবাদের পুরোনো পদ্ধতি ধরে রেখেছেন তিনি। অবশ্য আগের মতো বিস্তীর্ণ জমিতে নয়, বর্তমানে সামান্য কিছু জমিতেই এই পদ্ধতিতে চাষ করেন তিনি।

একই গ্রামের আবুল হাসেম (৬৫) বলেন, “গরু দিয়ে লাঙল চাষাবাদ আমাদের অতীতের অনেক স্মৃতিকে ঢেকে দিয়েছে। এখন সেই অতীতের কথা মনে পড়লে বড় অসহায় লাগে। এখন আধুনিক যন্ত্রের মাঝে আমাদের অতীতের স্মৃতি হারিয়ে গেছে।”

আরেক কৃষক মোঃ ফজলু ঘাটু (৭৭) নামের এক বৃদ্ধ তাঁর বাড়িতে নিয়ে গিয়ে স্মৃতি হিসেবে রাখা লাঙল, মইসহ কিছু সরঞ্জাম দেখান। একটি বাঁশের লাঠি দেখিয়ে তিনি বলেন, “এটাকে আমরা পেন্টি বলি। বাবা রে, এটা কি তোরা দেখেছিস? এটা দিয়ে আমরা গরুকে ভয় দেখিয়ে আমাদের মতো করে চাষ করে নিতাম।”

স্থানীয় বয়োজ্যেষ্ঠ কৃষকদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, আশি ও নব্বইয়ের দশকে ডিমলার গ্রামীণ কৃষিজীবনে গরু-লাঙলের ব্যবহার ছিল ব্যাপক। অনেক কৃষকের বাড়িতেই ছিল এক বা একাধিক জোড়া বলদ গরু। ভোরের আলো ফোটার আগেই কৃষকেরা গরুর ঘাড়ে জোয়াল তুলে মাঠের পথে রওনা দিতেন। দিনভর জমিতে হালচাষ শেষে সূর্যাস্তের পর ক্লান্ত শরীরে ফিরতেন বাড়িতে।

সে সময় কৃষিকাজে গবাদিপশুর গোবর সার ব্যবহারের প্রচলন ছিল। কৃষকেরা জমির উর্বরতা ধরে রাখতে প্রাকৃতিক উপকরণের ওপর নির্ভর করতেন। গ্রামীণ জীবনের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে ছিল গরু পালন, লাঙল তৈরি এবং মাঠে চাষাবাদের নানা প্রথা।

আরও পড়ুনঃ  কুড়িগ্রামে পরিবেশ বান্ধব গ্রাম ও স্যানিটেশন ব্যবস্থা নিশ্চিতকরণে শেয়ারিং ও উদযাপন

কিন্তু সময়ের সঙ্গে কৃষিতে এসেছে ব্যাপক পরিবর্তন। পাওয়ার টিলার, ট্রাক্টরসহ বিভিন্ন আধুনিক যন্ত্রপাতির ব্যবহার বেড়ে যাওয়ায় দ্রুত ও কম সময়ে জমি চাষ করা সম্ভব হচ্ছে। ফলে গরু-লাঙলের প্রয়োজনীয়তা কমেছে, আর ধীরে ধীরে হারিয়ে যাচ্ছে এই ঐতিহ্যবাহী কৃষিপদ্ধতি।

বয়োজ্যেষ্ঠ কৃষকদের ভাষ্য, আধুনিক কৃষিযন্ত্র কাজের গতি বাড়িয়েছে এবং শ্রম ও সময় সাশ্রয় করেছে। তবে এর ফলে গ্রামবাংলার কৃষিজীবনের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা অনেক পুরোনো রীতি ও চর্চা এখন আর আগের মতো দেখা যায় না। একসময় মাঠে মাঠে শোনা যেত লাঙলের শব্দ, কৃষকের হাঁকডাক ও রাখালদের সুর। বর্তমানে সেই পরিচিত দৃশ্য অনেকটাই বিলীন।

বনমালী রায়ের মতো কৃষকেরা ঐতিহ্য ধরে রাখলেও গরু-লাঙলের চাষাবাদ এখন আর প্রধান কৃষিপদ্ধতি নয়। আধুনিক প্রযুক্তির অগ্রযাত্রার পাশাপাশি পুরোনো কৃষিসংস্কৃতির এই নিদর্শনগুলোও ধীরে ধীরে হারিয়ে যাচ্ছে। ফলে ডিমলার গ্রামীণ জীবনে গরু-লাঙলের চাষাবাদ আজ কেবল কৃষিকাজের একটি পদ্ধতি নয়, বরং অতীতের এক স্মরণীয় অধ্যায়।