
সাকিব আহসান প্রতিনিধি, পীরগঞ্জ, ঠাকুরগাঁও
ঠাকুরগাঁওয়ের পীরগঞ্জ উপজেলার এক বৃদ্ধ যার জীবন এখন জ্বালানি তেলের সংকটে স্থবির। প্রতিদিনের রান্না, চিকিৎসা, এমনকি ন্যূনতম চলাচলও হয়ে উঠেছে কষ্টসাধ্য। এই সংকট কেবল ব্যক্তিগত নয়; এটি একটি বৃহত্তর বাস্তবতার প্রতিচ্ছবি। আজ তেলের সংকট, কাল হয়তো পানির সংকট—আর এই দুইয়ের পেছনে রয়েছে মানুষের খনিজ সম্পদ ব্যবহারে অবিবেচক আচরণ।
বাংলাদেশে জ্বালানি তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাসসহ অধিকাংশ খনিজ সম্পদ সীমিত। অথচ ব্যবহারের ক্ষেত্রে নেই সুনির্দিষ্ট নিয়ন্ত্রণ, পরিকল্পনা বা সচেতনতা। রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে নীতি থাকলেও বাস্তবায়নে ঘাটতি প্রকট। পীরগঞ্জের এই বৃদ্ধের জীবনযাত্রা আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয় সম্পদের অপচয় কিভাবে প্রান্তিক মানুষের জীবনকে প্রথমে আঘাত করে।
প্রথমত, খনিজ সম্পদের অপচয় ও আইনগত কাঠামো
বাংলাদেশে খনিজ সম্পদ উন্নয়ন, সংরক্ষণ ও ব্যবস্থাপনা সংক্রান্ত বিভিন্ন আইন ও নীতিমালা রয়েছে। যেমন—খনিজ সম্পদ উন্নয়ন ব্যুরো আইন, ১৯৯২ এবং পেট্রোলিয়াম আইন, ২০১৬। এই আইনগুলোর মূল লক্ষ্য হলো খনিজ সম্পদের সুষ্ঠু ব্যবহার, সংরক্ষণ এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য টেকসই ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা।
কিন্তু বাস্তবে দেখা যায়, অবৈধ উত্তোলন, অতিরিক্ত ব্যবহার এবং জ্বালানির অপচয় সবই নিয়মিত ঘটনা। গ্রামাঞ্চলে এখনও অনেকেই অদক্ষ চুলা ব্যবহার করে, যেখানে জ্বালানি খরচ হয় দ্বিগুণ। পরিবহন খাতে অপ্রয়োজনীয় জ্বালানি ব্যবহারও কম নয়। এসবই সরাসরি আইনের উদ্দেশ্যকে ব্যাহত করছে।
পরিবেশ আইন ও পানির ভবিষ্যৎ সংকট
আজকের তেলের সংকট আগামী দিনের পানির সংকটের ইঙ্গিত বহন করছে। কারণ, খনিজ সম্পদের অব্যবস্থাপনা পরিবেশের ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলে। বাংলাদেশ পরিবেশ সংরক্ষণ আইন, ১৯৯৫ অনুযায়ী, পরিবেশের ক্ষতি হয় এমন কোনো কার্যক্রম দণ্ডনীয় অপরাধ। কিন্তু বাস্তবে শিল্প-কারখানার বর্জ্য, নদী দখল, অতিরিক্ত ভূগর্ভস্থ পানি উত্তোলন—সবই চলছে প্রায় নির্বিঘ্নে।
পীরগঞ্জসহ উত্তরাঞ্চলের অনেক এলাকায় ইতোমধ্যে পানির স্তর নিচে নেমে যাচ্ছে। কৃষিকাজে অতিরিক্ত সেচ, অপরিকল্পিত নলকূপ স্থাপন—এসবই ভবিষ্যতের বড় সংকটের ইঙ্গিত দেয়। যদি এখনই নিয়ন্ত্রণ না আনা যায়, তাহলে তেলের মতো পানিও একদিন সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে চলে যাবে।
সামাজিক বৈষম্য ও প্রান্তিক মানুষের ভোগান্তি খনিজ সম্পদের সংকট সবার জন্য সমান নয়। শহরের মানুষ বিকল্প খুঁজে নিতে পারে—এলপিজি, বিদ্যুৎ, এমনকি সোলার শক্তি। কিন্তু পীরগঞ্জের সেই বৃদ্ধের মতো মানুষদের কাছে এসব বিকল্প বিলাসিতা। ফলে সংকটের প্রথম ও সবচেয়ে বড় আঘাত পড়ে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর ওপর।
এখানে একটি নীতিগত প্রশ্ন উঠে আসে রাষ্ট্র কি তার সম্পদ ব্যবস্থাপনায় সামাজিক ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে পারছে? সংবিধানের ১৫(ক) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, রাষ্ট্রের দায়িত্ব হলো নাগরিকদের মৌলিক চাহিদা পূরণ করা। জ্বালানি ও পানি দুটিই মৌলিক চাহিদার অংশ। সুতরাং এই সংকট কেবল অর্থনৈতিক নয়, এটি সাংবিধানিক দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রেও একটি চ্যালেঞ্জ।
চতুর্থত, সমাধানের পথনীতি থেকে বাস্তবায়ন এই সংকট থেকে উত্তরণের জন্য প্রথমেই প্রয়োজন কঠোর আইন প্রয়োগ। অবৈধ খনিজ উত্তোলন, জ্বালানির অপচয় এবং পরিবেশ দূষণের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে। পাশাপাশি স্থানীয় পর্যায়ে সচেতনতা বৃদ্ধি জরুরি।
দ্বিতীয়ত, বিকল্প জ্বালানি ব্যবস্থার প্রসার ঘটাতে হবে। সোলার প্যানেল, বায়োগ্যাস—এসব প্রযুক্তি গ্রামাঞ্চলে সহজলভ্য করতে পারলে তেলের ওপর নির্ভরতা কমবে।
তৃতীয়ত, পানি ব্যবস্থাপনায় টেকসই নীতি গ্রহণ করতে হবে। বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ, সেচে আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার এবং ভূগর্ভস্থ পানির ওপর নির্ভরতা কমানো এসব পদক্ষেপ এখনই নিতে হবে।
উপসংহার
পীরগঞ্জের সেই বৃদ্ধের গল্প কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়; এটি একটি সতর্কবার্তা। খনিজ সম্পদের ওপর মানুষের যথেচ্ছাচার আজ তেলের সংকট তৈরি করেছে, আর আগামীতে তা পানির সংকটে রূপ নিতে পারে। আইন আছে, নীতিও আছে—কিন্তু প্রয়োজন কার্যকর প্রয়োগ ও সামাজিক দায়বদ্ধতা।
এখনই যদি আমরা না শিখি, তাহলে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম শুধু গল্প শুনবে একসময় পানি আর জ্বালানি সহজলভ্য ছিল। আর সেই গল্পের শুরুটা হবে পীরগঞ্জের এক বৃদ্ধের নিঃশব্দ কষ্ট দিয়ে।
Reporter Name 




















