
ইমদাদুল হক তৈয়ব:
ফাতিমা ইয়াসমিন ছায়া, বাংলাদেশের ফ্যাশন জগতে এক দ্যুতিময় নাম। পেশাদার ফ্যাশন ডিজাইনার এবং তাঁর প্রতিষ্ঠিত ব্র্যান্ড ‘শিবমী’ (Shibemi – Shine Be Eminent)-এর মাধ্যমে তিনি কেবল শিল্পের জয়গান করছেন না, বরং সমাজের পিছিয়ে পড়া নারীদের জন্য এক নতুন কর্মদিগন্ত উন্মোচন করেছেন। এই সৃজনশীল উদ্যোক্তা তাঁর শিল্প, দর্শন এবং সামাজিক দায়বদ্ধতার গল্প নিয়ে কথা বলেছেন মানবজীবন.কম-এর সঙ্গে।

উদ্যমী নারী সম্মাননা-২৫ গ্রহণ করছেন ফ্যাশন ডিজাইনার ফাতিমা ইয়াসমিন ছায়া
মানবজীবন.কম: আপনার জন্মস্থান এবং বেড়ে ওঠা সম্পর্কে জানতে চাই। ঠিক কখন ও কোথায় আপনার শিক্ষাজীবনের সূত্রপাত ঘটেছিল?
ফাতিমা ইয়াসমিন ছায়া: ধন্যবাদ। শৈশবের স্মৃতি সবসময়ই অমূল্য। আমার জন্ম পুরান ঢাকায়, এবং আমি একজন খাঁটি ঢাকাইয়া নারী। ঢাকার সংস্কৃতি স্বভাবতই কিছুটা রক্ষণশীল, বিশেষ করে মেয়েদের ক্ষেত্রে—যেখানে নিজের স্বপ্ন অনুসরণ করা বা সৃজনশীল পথে এগিয়ে যাওয়া সবসময় সহজ নয়। তারপরও, ছোটবেলা থেকেই শিল্প, ডিজাইন এবং হস্তশিল্পের প্রতি আমার গভীর আকর্ষণ ছিল। নানা ধরনের আর্ট, ডিজাইন ও হস্তশিল্পের কাজ শেখার মধ্য দিয়ে আমার সৃজনশীলতার ভিত্তি গড়ে ওঠে। এই পুরান ঢাকার ঐতিহ্য, পরিবেশ ও শিল্পচর্চাই আজকের ফ্যাশন ডিজাইনার হিসেবে আমার পথচলার মূল অনুপ্রেরণা। তবে ব্যক্তিগত গোপনীয়তার কারণে নির্দিষ্ট জন্মসাল বা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের নাম প্রকাশ না করাই স্বচ্ছন্দবোধ করি। আমার শিক্ষাজীবন শুরু হয়েছিল বাংলাদেশেরই একটি প্রতিষ্ঠানে, আর উচ্চশিক্ষায় আমি ফ্যাশন ডিজাইনে বিশেষ ডিগ্রি অর্জন করি। সেই শিক্ষা ও শৈশবের শিল্পচর্চাই আমার বর্তমান পেশাদার যাত্রার ভিত্তি স্থাপন করেছে।
মানবজীবন.কম: আপনার ব্যক্তিগত ও পারিবারিক জীবন সম্পর্কে যদি কিছু বলতেন। সংসার এবং উদ্যোক্তা জীবনকে আপনি কিভাবে সামঞ্জস্যপূর্ণ করেছেন?
ফাতিমা ইয়াসমিন ছায়া: আমার পরিবার আমার জীবনের সবচেয়ে বড় শক্তি ও অবলম্বন। আমি একজন সিঙ্গেল মাদার—আমার জীবনে একটি কঠিন সময় এসেছে, যখন আমার বিবাহ বিচ্ছেদ হয়। সেই সময়টা ছিল মানসিক, সামাজিক এবং ব্যক্তিগত—সব দিক থেকেই চ্যালেঞ্জিং। কিন্তু আমার পরিবার যেভাবে পাশে দাঁড়িয়ে আমাকে সমর্থন ও সাহস দিয়েছে, তা না থাকলে আজকের অবস্থানে পৌঁছানো কখনোই সম্ভব হতো না।
একজন মা হিসেবে সন্তানের দায়িত্ব পালন এবং একজন উদ্যোক্তা হিসেবে ক্যারিয়ার গড়া—দুটো পথই কঠিন। তবে পরিবারের ভালোবাসা, সহযোগিতা ও আস্থা আমাকে এই দুই ভূমিকা সামঞ্জস্য রেখে চলতে শিখিয়েছে। আমার কাছে পরিবার ও কাজ একে অন্যের পরিপূরক; তারা আমাকে মানসিক স্থিতি, প্রেরণা এবং এগিয়ে যাওয়ার শক্তি দেয়।
মানবজীবন.কম: আপনার উদ্যোক্তা হওয়ার শুরুর গল্পটি বলেন? কখন এবং কিভাবে ‘শিবমী’র ভাবনা আপনার মনে আসে?
ফাতিমা ইয়াসমিন ছায়া: আমার উদ্যোক্তা হওয়ার গল্পটা ছিল এক তীব্র আকাঙ্ক্ষার জন্ম। আমি কেবল পোশাক তৈরি করতে চাইনি, চেয়েছিলাম এমন কিছু সৃষ্টি করতে যা শিল্পের সাথে মানুষের আত্মবিশ্বাসকে যুক্ত করবে। দেশীয় ঐতিহ্যকে আধুনিক বৈশ্বিক ট্রেন্ডের সাথে মিলিয়ে একটি নিজস্ব শৈলী তৈরি করার এটিই উপযুক্ত সময় মনে হয়েছিল। আর এই উদ্যোগের কেন্দ্রে ছিল কেবল ব্যবসায়িক লাভ নয়, বরং নারী ক্ষমতায়ন এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টির এক গভীর সামাজিক প্রতিশ্রুতি। সেই ভাবনা থেকেই জন্ম নেয় আমার ব্র্যান্ড ‘শিবমী’।
মানবজীবন.কম: বর্তমানে আপনি কোন কোন ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানের সাথে কি কি দায়িত্ব পালন করছেন?
ফাতিমা ইয়াসমিন ছায়া : বর্তমানে আমি প্রধানত আমার একমাত্র প্রতিষ্ঠান ‘শিবমী’ (Shibemi – Shine Be Eminent) এর স্বত্বাধিকারী ও প্রধান ফ্যাশন ডিজাইনার হিসেবে পূর্ণকালীন দায়িত্ব পালন করছি। আমার প্রধান দায়িত্বগুলো হলো—ব্র্যান্ডের সামগ্রিক সৃজনশীল দিকনির্দেশনা প্রদান, নতুন ডিজাইনের গবেষণা ও উন্নয়ন, উৎপাদন প্রক্রিয়ার মান নিয়ন্ত্রণ এবং আমাদের সামাজিক দায়বদ্ধতার অংশ হিসেবে গৃহিণী কর্মীদের প্রশিক্ষণ ও তদারকি করা।
মানবজীবন.কম: সামাজিক কোনো প্রতিষ্ঠানে জড়িত আছেন কি? নারীর ক্ষমতায়নে আপনার ‘শিবমী’ উদ্যোগটি ঠিক কিভাবে কাজ করছে?
ফাতিমা ইয়াসমিন ছায়া: আমার উদ্যোগ ‘শিবমী’ নিজেই একটি সামাজিক প্রতিষ্ঠানের মতো কাজ করে। সরাসরি কোনো এনজিও’র সাথে যুক্ত না থাকলেও, আমার কাজের কেন্দ্রে রয়েছে নারী ক্ষমতায়ন ও কর্মসংস্থান সৃষ্টির প্রতিশ্রুতি। বর্তমানে আমার অধীনে ৬ জন গৃহিণী কাজ করছেন, যারা পারিবারিক বা সামাজিক সীমাবদ্ধতার কারণে ঘরের বাইরে যেতে পারেন না। তাঁরা পর্দার আড়ালে থেকেই একটি নিরাপদ কর্মপরিবেশে নিজেদের দক্ষতা বাড়াচ্ছেন, আর্থিকভাবে স্বাবলম্বী হচ্ছেন এবং আত্মবিশ্বাসী ভবিষ্যতের ভিত্তি স্থাপন করছেন।
মানবজীবন.কম: এযাবৎ আপনি কয়টি সম্মাননা পেয়েছেন এবং এই পুরস্কারের আবেদন কেন জরুরি মনে করছেন?
ফাতিমা ইয়াসমিন ছায়া: আমি ইতিমধ্যেই একটি সম্মাননা পুরস্কার পেয়েছি, যা আমার কর্মজীবনের শুরুতে একটি বড় অনুপ্রেরণা হয়ে দাঁড়ায়। এই অর্জন আমাকে প্রমাণ করেছে যে কঠোর পরিশ্রম, নিষ্ঠা ও সৃজনশীলতার মূল্য একদিন অবশ্যই মেলে। তবে আমার স্বপ্ন থেমে নেই—আমার স্বপ্ন অনেক বড়। আমি চাই আমার কাজ শুধু ব্র্যান্ড হিসেবে নয়, বরং সমাজের পরিবর্তনের শক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হোক।
এই কারণেই আমি মনে করি, এ ধরনের মর্যাদাপূর্ণ পুরস্কার আমার যাত্রাকে আরও দৃঢ় করবে। এই স্বীকৃতি আমাকে এবং আমার সঙ্গে কাজ করা নারীদের আরও এগিয়ে যেতে অনুপ্রাণিত করবে, বড় পরিসরে কাজ করার সুযোগ সৃষ্টি করবে এবং বহু নারীর জীবনে ইতিবাচক পরিবর্তনের দ্বার উন্মুক্ত করবে।


মৎস উপদেষ্টার সঙ্গে উদ্যমী নারী ফাতিমা ইয়াসমিন ছায়া
মানবজীবন.কম: সফলতার এই পর্যায়ে আসতে আপনাকে কি কি বাধা-বিপত্তি অতিক্রম করতে হয়েছে?
ফাতিমা ইয়াসমিন ছায়া: উদ্যোক্তা জীবনে বাধা-বিপত্তিগুলোই আসলে একজন মানুষকে তৈরি করে। আমার যাত্রায়ও বেশ কিছু চ্যালেঞ্জ ছিল: ব্র্যান্ডের জন্য বাজারে স্বতন্ত্র স্থান তৈরি করা, আর্থিক সীমাবদ্ধতা, এবং সবথেকে গুরুত্বপূর্ণ ছিল- গৃহিণী কর্মীদের জন্য সুবিধাজনক ও মানসম্পন্ন উৎপাদন কাঠামো তৈরি করা। এছাড়া, ফ্যাশন ডিজাইন, সৃজনশীলতা, নারী ক্ষমতায়ন এবং টেকসই উদ্যোগ- এই চারটি মূল নীতির মধ্যে সামঞ্জস্য রক্ষা করা ছিল এক নিরন্তর সংগ্রাম।
মানবজীবন.কম: ৮. নিজেকে কতটুকু সফল মনে করছেন? নতুন উদ্যোক্তাদের ক্ষেত্রে আপনার পরামর্শ কি?
ফাতিমা ইয়াসমিন ছায়া: সফলতার পরিমাপ কেবল আয়ের অঙ্কে নয়, বরং ইতিবাচক প্রভাব বিস্তারে। সেই দিক থেকে আমি নিজেকে একজন সফল পথের যাত্রী মনে করি। আমি গর্বিত যে, আমার সৃজনশীলতা সমাজের কিছু মানুষের জীবনে স্বাবলম্বী হওয়ার সুযোগ এনে দিয়েছে।
নতুন উদ্যোক্তাদের ক্ষেত্রে আমার পরামর্শ-
* উদ্দেশ্যকে প্রাধান্য দিন : আপনার উদ্যোগের একটি সুস্পষ্ট সামাজিক বা মানবিক উদ্দেশ্য থাকতে হবে।
* সৃজনশীলতা ও নিজস্বতা : ভিড়ের মধ্যে হারিয়ে না গিয়ে আপনার ব্র্যান্ডের একটি স্বতন্ত্র শৈলী তৈরি করুন।
* টেকসই উন্নয়নে বিশ্বাস রাখুন : নৈতিকতা এবং টেকসই উদ্যোগকে আপনার কাজের ভিত্তি করুন।
* মানুষে বিনিয়োগ করুন : আপনার কর্মীদের কেবল শ্রমিক হিসেবে নয়, বরং অংশীদার ও অনুপ্রেরণার উৎস হিসেবে দেখুন।
মানবজীবন.কম: আপনার ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা কি?
ফাতিমা ইয়াসমিন ছায়া: আমার ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা দ্বিমুখী। প্রথমত, *’শিবমী’*কে আন্তর্জাতিক ফ্যাশন বাজারে প্রতিষ্ঠা করা, যাতে ‘Shine Be Eminent’ দর্শনটি বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে পড়ে। দ্বিতীয়ত, আমার সামাজিক উদ্যোগকে অনেক বড় পরিসরে নিয়ে যাওয়া, যাতে এই সুযোগ আরও বহু নারীর দোরগোড়ায় পৌঁছে দেওয়া যায় এবং তাঁরা ঘর থেকেই আর্থিকভাবে শক্তিশালী হতে পারেন।
মানবজীবন.কম: আপনার পরিবার সম্পর্কে কিছু বলুন?
ফাতিমা ইয়াসমিন ছায়া: আমার পরিবার আমার সবচেয়ে বড় শক্তি। আমি একটি সুন্দর, সহযোগিতাপূর্ণ পরিবার পেয়েছি। তাঁরা সবাই আমার স্বপ্নকে মূল্য দিয়েছেন, সম্মান করেছেন এবং আমাকে প্রতিনিয়ত সাহস জুগিয়েছেন।
আমার সৃজনশীলতার পথে যত বাধাই আসুক, পরিবারের এ নিঃস্বার্থ সমর্থন আমাকে স্থির রেখেছে। বিশেষ করে একজন সিঙ্গেল মাদার হিসেবে যেসব মানসিক ও সামাজিক চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে হয়, সেগুলো পার হতে পরিবারের ভালোবাসা ও সমর্থন আমাকে সবসময় শক্তি দিয়েছে। তাঁদের সহযোগিতা, আস্থা এবং ভালোবাসা ছাড়া আমার পক্ষে এত দূর এগিয়ে আসা কখনোই সম্ভব হতো না।
Reporter Name 


























