এনামুল হক রাশেদী, চট্টগ্রাম
বাঁশখালীর মানুষ ও তরুণদের নিয়ে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের (চসিক) মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেনের কথিত ‘বাঁশখাইল্যা পোয়া-অল বেক সন্ত্রাস’ মন্তব্যকে কেন্দ্র করে দেশে ও প্রবাসে তীব্র ক্ষোভ ও অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একটি ভিডিও মুহূর্তেই ভাইরাল হয়ে পড়লে মেয়রের মন্তব্যকে ঘিরে বাঁশখালীর বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ প্রতিবাদ জানাতে শুরু করেন। এ নিয়ে ব্যাপক সমালোচনার পর নিজের বক্তব্যের জন্য দুঃখ প্রকাশ করেন মেয়র।
বুধবার (৭ অক্টোবর) সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওতে মেয়রকে বলতে শোনা যায়, ‘বাঁশখাইল্লা পোয়া-অল বেক সন্ত্রাস’। একই ভিডিওতে তাকে বলতে শোনা যায়, ‘বাঁশখাইল্লা পোয়া অল মামলা গরাত হাবিল’—যার অর্থ দাঁড়ায়, বাঁশখালীর ছেলেরা মামলা করতে পটু। স্থানীয় সংবাদমাধ্যমেও ভিডিওটির বক্তব্য উদ্ধৃত করে প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়েছে।
ভিডিওটি ছড়িয়ে পড়ার পরপরই বাঁশখালীর বিভিন্ন মহলে তীব্র ক্ষোভ দেখা দেয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেশে ও বিদেশে অবস্থানরত বাঁশখালীর বাসিন্দারা মেয়রের বক্তব্যের সমালোচনা করেন। তাদের অভিযোগ, কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর অপরাধের দায় একটি পুরো উপজেলার মানুষ ও তরুণ সমাজের ওপর চাপিয়ে দেওয়া গ্রহণযোগ্য নয়।
এর মধ্যেই বুধবার রাত ১২টা ১২ মিনিটে নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক আইডিতে দেওয়া এক স্ট্যাটাসে মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন দুঃখ প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, বাঁশখালী নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তিনি যে মন্তব্য করেছেন, তার জন্য তিনি সত্যিই দুঃখিত। তিনি ‘সাহসী’ বলতে চেয়েছিলেন বলেও উল্লেখ করেন। তার মন্তব্যে বাঁশখালীর মানুষ কষ্ট পেয়েছেন উল্লেখ করে তিনি আন্তরিকভাবে দুঃখ প্রকাশ করেন।
মেয়রের বক্তব্যটি এমন এক সময়ে সামনে এসেছে, যখন নগর রাজনীতিতে বিভিন্ন ইস্যুতে তার বক্তব্য নিয়ে আলোচনা-সমালোচনা চলছে। বুধবার নগরের ঈদগাঁহ রূপসা বেকারি এলাকায় পরিচ্ছন্নতা ও মশক নিয়ন্ত্রণে চসিকের ক্রাশ প্রোগ্রাম শেষে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন মেয়র। ওই সময় তিনি খুলশী থানার ওসি আবদুর রহিমের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন এবং স্বেচ্ছাসেবক দলের সাবেক নেতা ওয়াকিল হোসেন ওরফে বগাকে ‘আওয়ামী লীগের সন্ত্রাসী’ হিসেবে চিহ্নিত করার বিরোধিতা করেন।
মেয়রের বক্তব্যকে কেন্দ্র করে স্থানীয় রাজনৈতিক মহলেও আলোচনা শুরু হয়েছে। বাঁশখালী টুডের প্রতিবেদনে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) চট্টগ্রাম মহানগর সদস্যসচিব আরিফ মঈনুদ্দিনের সঙ্গে মেয়রের রাজনৈতিক বিরোধের বিষয়টি তুলে ধরা হয়েছে। ওই প্রতিবেদনে এনসিপি নেতাদের বরাতে দাবি করা হয়, আরিফ মঈনুদ্দিন মেয়রের বিভিন্ন কর্মকাণ্ডের সমালোচনা করেছেন এবং চসিক মেয়র পদে সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবেও তার নাম আলোচনায় রয়েছে। এ বিষয়ে মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেনের বক্তব্য জানতে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি সাড়া দেননি বলে ওই প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
বাঁশখালীতে কর্মরত এক সাংবাদিক বলেন, কয়েকজন ব্যক্তির অপরাধ বা সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের দায় পুরো এলাকার সাধারণ মানুষের ওপর চাপানো উচিত নয়। বাঁশখালীর বিপুলসংখ্যক তরুণ শিক্ষা, ব্যবসা, চাকরি ও প্রবাসে থেকে পরিবার ও দেশের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছেন বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
স্থানীয়দের মতে, বাঁশখালীর রয়েছে দীর্ঘ সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক ঐতিহ্য। এই উপজেলার অসংখ্য মানুষ জাতীয় পর্যায়ে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছেন। ফলে একটি নির্দিষ্ট শ্রেণি বা ব্যক্তির কর্মকাণ্ডের সঙ্গে পুরো বাঁশখালীর মানুষকে এক কাতারে দাঁড় করানো নিয়ে আপত্তি রয়েছে তাদের।
এদিকে, বক্তব্যের পর তীব্র সমালোচনার মুখে মেয়রের দুঃখ প্রকাশকে ইতিবাচকভাবে দেখছেন কেউ কেউ। তবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া বক্তব্যের পর যে তাৎক্ষণিক ক্ষোভ তৈরি হয়েছে, তা শুধু দুঃখ প্রকাশে কতটা প্রশমিত হবে, সেটিই এখন আলোচনার বিষয়।
মেয়রের বক্তব্যে কোনো এলাকার বিপুলসংখ্যক মানুষ যদি নিজেদের অপমানিত মনে করেন, তাহলে ভবিষ্যতে এ ধরনের মন্তব্যের ক্ষেত্রে আরও সতর্কতা প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
অন্যদিকে, মেয়রের ব্যক্তিগত সহকারী মারুফুল হক চৌধুরীর বাড়ি বাঁশখালীর চাম্বল ইউনিয়নে বলে স্থানীয়ভাবে আলোচনা রয়েছে। স্থানীয় সংবাদসূত্রে তার বাঁশখালীর সঙ্গে সম্পৃক্ততার তথ্যও এসেছে।
সব মিলিয়ে, একটি ভিডিওকে কেন্দ্র করে শুরু হওয়া বিতর্ক শেষ পর্যন্ত মেয়রের দুঃখ প্রকাশে নতুন মাত্রা পেয়েছে। এখন বাঁশখালীর মানুষ বিষয়টিকে কীভাবে নেন এবং রাজনৈতিক অঙ্গনে এর প্রভাব কতটা পড়ে, সেটিই দেখার বিষয়।
Reporter Name 






















