শহিদ শেখ পাখি, মুন্সীগঞ্জ প্রতিনিধি :
বাংলার প্রাচীন জনপদ ও জ্ঞান-বিজ্ঞানের সূতিকাগার বিক্রমপুর যুগে যুগে উপহার দিয়েছে অসংখ্য প্রথিতযশা বিজ্ঞানী, সাহিত্যিক ও বিপ্লবী। তবে কেবল মেধা আর মননে নয়, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের ধারক হিসেবেও এই অঞ্চলের নারীরা অনন্য। সেই ঐতিহ্যের উত্তরাধিকারী হয়ে বর্তমান বিনোদন অঙ্গনে যে নামটি অত্যন্ত শ্রদ্ধার সাথে উচ্চারিত হয়, তিনি হলেন জনপ্রিয় মডেল ও অভিনেত্রী আনিকা কবির শখ।
আনিকা কবির শখ ১৯৯৩ সালের ২৫ অক্টোবর ঢাকায় জন্মগ্রহণ করলেও তার নাড়ির টান মিশে আছে বিক্রমপুরের মাটিতে। তার বাবা শামিম কবির এবং মা শাহিদা কবির। শখের আদি নিবাস মুন্সীগঞ্জ জেলার শ্রীনগর উপজেলার কবুতরখোলা গ্রামে। শৈশব থেকে শহরে বেড়ে উঠলেও তার চলন-বলন ও আতিথেয়তায় আজও ফুটে ওঠে বিক্রমপুরের চিরায়ত ঐতিহ্যের ছাপ।
অনেকেই হয়তো জানেন না, শখের মিডিয়া যাত্রা শুরু হয়েছিল গানের মাধ্যমে। ছোটবেলায় টানা দুই বছর গান শিখেছিলেন তিনি। বিশেষ করে দেশাত্মবোধক গানে তার দখল এতটাই ছিল যে, জাতীয় পর্যায়ে স্বর্ণপদক জয় করে নিজের প্রতিভার স্বাক্ষর রেখেছিলেন। তবে সুরের চেয়ে তালের ছন্দের প্রতি তার টান ছিল প্রবল। গেন্ডারিয়ার একটি নাচের স্কুলে শখের বশে ভর্তি হওয়া সেই ছোট্ট মেয়েটিই আজ বাংলাদেশের নাচের জগতের এক উজ্জ্বল ধ্রুবতারা।
শখের নাচের প্রতিভা কেবল দেশের গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ থাকেনি। ২০০৭ সালে চীনে অনুষ্ঠিত একটি আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় ১৪৭টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশ প্রথম স্থান অধিকার করে। সেই বিজয়ী দলের অন্যতম সদস্য ছিলেন আনিকা কবির শখ। বিশ্বমঞ্চে লাল-সবুজের পতাকাকে উঁচিয়ে ধরে তিনি প্রমাণ করেছিলেন বিক্রমপুরের সন্তানদের প্রতিভা বিশ্বজনীন।
শীর্ষ নির্মাতা অমিতাভ রেজা চৌধুরীর হাত ধরে মডেলিং জগতে পা রাখেন শখ। পরবর্তীতে মোস্তফা সরয়ার ফারুকীর নির্দেশনায় কাজ করে দ্রুতই পাদপ্রদীপের আলোয় চলে আসেন তিনি। শিশুশিল্পী হিসেবে ২০০২ সালে ‘স্বাক্ষর’ এবং পরবর্তীতে ‘নিক্তি’ নাটকে তার অভিনয় যাত্রা শুরু হয়। বড় হয়ে ‘অদ্ভুতুরে’ ধারাবাহিকের মাধ্যমে তিনি আলোচনায় আসেন। তার অভিনীত উল্লেখযোগ্য নাটকের মধ্যে রয়েছে: এফএনএফ, ফিফটি ফিফটি, রিয়ালিটি শো, কলেজ, পেন্সিলে আঁকা ভালোবাসা, সিকান্দার বক্স ও আমার ইচ্ছে করে না। বিশেষ করে গোলাম সোহরাব দোদুলের ‘পটুয়ার বউ’ নাটকে তার শক্তিশালী অভিনয় দর্শকদের হৃদয়ে দাগ কেটে আছে।
২০১০ সালে সুপারস্টার শাকিব খানের বিপরীতে ‘বলো না তুমি আমার’ চলচ্চিত্রের মাধ্যমে বড় পর্দায় অভিষেক হয় শখের। এই ছবির ‘তোমার চোখে দেখি আমার এ পৃথিবী’ গানটি সেই সময়ে ব্যাপক জনপ্রিয়তা পায়। এরপর তিনি অভিনয় করেন জাতীয় পুরস্কারপ্রাপ্ত সিনেমা ‘অল্প অল্প প্রেমের গল্প’-তে। কাজের স্বীকৃতিস্বরূপ তিনি সিজেএফবি পুরস্কার, বাচসাস পুরস্কার এবং টানা তিন বছর বিনোদন বিচিত্রা পুরস্কারসহ অসংখ্য সম্মাননা লাভ করেন।
বিক্রমপুরের এই কৃতি সন্তান বর্তমানে তার পারিবারিক জীবন নিয়ে ব্যস্ত সময় পার করছেন। ২০২০ সালে তিনি রহমান সগিরের সাথে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। ২০২১ সালে তাদের কোল আলো করে আসে কন্যা সন্তান আলিফ আনাম আনিকা। বর্তমানে তিনি সপরিবারে রাজধানীর পুরান ঢাকার গেন্ডারিয়া এলাকায় স্থায়ীভাবে বসবাস করছেন।
বিক্রমপুরের আতিথেয়তা, রন্ধনশৈলী আর সংস্কৃতির যে সুবাস, তা আনিকা কবির শখ তার কাজের মাধ্যমে সারা দেশে ছড়িয়ে দিয়েছেন। পর্দার সেই চঞ্চল মেয়েটি আজও তার শেকড়কে ভুলে যাননি, যা একজন প্রকৃত শিল্পীর সবচেয়ে বড় পরিচয়। তার এই সাফল্য মুন্সীগঞ্জ তথা পুরো বিক্রমপুরবাসীর জন্য এক বিশাল গর্বের বিষয়।
Reporter Name 




























