রুনু হাসান, নোয়াখালী:
নোয়াখালীর বেগমগঞ্জ উপজেলা নির্বাচন অফিসে উন্নত ও জনবান্ধব সেবার নতুন দিগন্ত উন্মোচন করছেন উপজেলা নির্বাচন কর্মকর্তা মোহাম্মদ বুলবুল আহমেদ। ভোটার আইডি কার্ড ও জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি) সংক্রান্ত বিভিন্ন সেবা নিতে আসা সাধারণ নাগরিকদের ভোগান্তি কমেছে বলে সরেজমিনে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে।
বগুড়ার সন্তান উপজেলা নির্বাচন কর্মকর্তা মোহাম্মদ বুলবুল আহমেদ বেগমগঞ্জে যোগদানের পর ‘ক’ ক্যাটাগরির এনআইডি সংশোধনসহ বিভিন্ন সংশোধনী আবেদন ঝুলিয়ে না রেখে দ্রুত নিষ্পত্তির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে জানা গেছে। এতে উপজেলার সেবা প্রার্থী নাগরিকদের মধ্যে সন্তোষ দেখা দিয়েছে।
বিশেষ করে প্রবাসী রেমিট্যান্স যোদ্ধাদের এনআইডি সংক্রান্ত জটিলতা দ্রুত নিরসনের ব্যবস্থা করা হয়েছে। সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, প্রয়োজনীয় কাগজপত্র ও ফিরতি ফ্লাইটের টিকিট প্রদর্শন সাপেক্ষে প্রবাসীদের জন্য আলাদা সিরিয়ালের ব্যবস্থা রয়েছে এবং অনেক ক্ষেত্রে দ্রুত নিবন্ধন ও সেবা দেওয়া হচ্ছে।

জনমুখী এনআইডি সেবায় বিশেষ কিছু উদ্যোগ
বেগমগঞ্জ উপজেলা নির্বাচন অফিসে সেবা নিতে আসা নাগরিকদের জন্য বেশ কিছু ইতিবাচক উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য—
১. প্রায় ৭০ জন সেবা প্রার্থীর বসার জন্য সুন্দর ব্যবস্থা রয়েছে।
২. নির্ধারিত বসার স্থানে সেবা প্রার্থীদের সুবিধার জন্য চারটি ফ্যানের ব্যবস্থা করা হয়েছে।
৩. সেবা নিতে আসা নাগরিকদের তৃষ্ণা মেটাতে সুপেয় পানির ব্যবস্থা রাখা হয়েছে।
৪. কোন ধরনের আবেদনের জন্য কী কী প্রমাণক দলিল প্রয়োজন, তার তালিকা বড় সাইনবোর্ডে প্রদর্শন করা হয়েছে।
৫. সপ্তাহের মঙ্গলবার ও বৃহস্পতিবার নতুন ভোটার নিবন্ধনের কার্যক্রম পরিচালিত হয়। সোমবার ও বুধবার ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ প্রদত্ত এনআইডি সংশোধন আবেদনের তদন্ত ও শুনানি অনুষ্ঠিত হয়। এছাড়া রবিবার নির্বাচন কমিশন নির্ধারিত ‘Open Day’ হিসেবে বিভিন্ন ধরনের সেবা প্রদান করা হয়।
৬. নতুন ভোটার নিবন্ধনের ক্ষেত্রে আবেদনের সিরিয়াল অনুযায়ী প্রতি সপ্তাহে প্রায় ২০০ জন ভোটারের নিবন্ধন করা হয়। পাশাপাশি ফিরতি ফ্লাইটের টিকিট প্রদর্শন সাপেক্ষে প্রবাসীদের জন্য আলাদা সিরিয়াল সংরক্ষণ করে তাৎক্ষণিক নিবন্ধনের ব্যবস্থা করা হয়।
৭. নতুন ভোটার নিবন্ধন, আঙুলের ছাপ পরিবর্তন, ছবি পরিবর্তন, এনআইডির বিভিন্ন তথ্য সংশোধন, ঊর্ধ্বতন অফিসের প্রদত্ত তদন্ত ও শুনানি গ্রহণ, ভোটার স্থানান্তরসহ বিভিন্ন কাজে প্রতিদিন গড়ে ১৫০ থেকে ২০০ জন সেবা প্রার্থী বেগমগঞ্জ উপজেলা নির্বাচন অফিস থেকে সেবা গ্রহণ করছেন বলে জানা গেছে।
৮. এনআইডি সেবার পাশাপাশি জাতীয় সংসদ ও বিভিন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচন এবং উপ-নির্বাচন আয়োজনের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বও এই উপজেলা নির্বাচন অফিসের ওপর রয়েছে।
৯. প্রতি বছর মাঠপর্যায়ে বাড়ি বাড়ি গিয়ে ভোটারের তথ্য সংগ্রহ ও শ্রেণিবদ্ধ করে ভোটার তালিকা হালনাগাদ করা হয়।
১০. সম্প্রতি নির্বাচন কমিশনের নির্দেশে মাত্র দুই মাসে ২০০৭ থেকে ২০০৯ সালে নিবন্ধিত প্রায় ৩ লাখ ২৮ হাজার ভোটারের নিবন্ধন ফরম (ফরম-২) স্ক্যান করে সংশ্লিষ্ট ভোটারের ডাটাবেজে আপলোড করা হয়েছে। ফলে এসব ভোটারের এনআইডি সংশোধনের আবেদন নিষ্পত্তিতে সিদ্ধান্ত গ্রহণ আরও সহজ হবে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।

দালাল চক্রের দৌরাত্ম্য নিয়ে অভিযোগ
স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, অতীতে বেগমগঞ্জ উপজেলা নির্বাচন অফিসে সেবা নিতে আসা নাগরিকদের একটি অংশ দালালদের দৌরাত্ম্যের কারণে নানা ভোগান্তির শিকার হতেন। তবে বর্তমান উপজেলা নির্বাচন কর্মকর্তা মোহাম্মদ বুলবুল আহমেদ যোগদানের পর অফিসের সেবাব্যবস্থায় বেশ কিছু পরিবর্তন এসেছে বলে দাবি করেছেন স্থানীয় কয়েকজন।
তবে একই সঙ্গে একটি দালালচক্র বর্তমান ব্যবস্থার বিরুদ্ধে অবস্থান তৈরি করে পুরোনো রেওয়াজ ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করছে বলেও নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন সেবা প্রার্থী জানিয়েছেন।
তাদের দাবি, সেবা কার্যক্রম সহজ হওয়ায় সাধারণ মানুষ সরাসরি অফিস থেকে সেবা নিতে পারছেন। এতে দালালদের ওপর নির্ভরশীলতা কমেছে।
জেলা নির্বাচন কর্মকর্তার বক্তব্য
বিষয়টি নিয়ে নোয়াখালী জেলা নির্বাচন কর্মকর্তা মোহাম্মদ সাদিকুল ইসলাম-এর সঙ্গে কথা হলে তিনি বলেন, সব জায়গাতেই পক্ষে-বিপক্ষে লোক থাকে। পত্রিকায় কোনো সংবাদ প্রকাশ হলে সে বিষয়ে কেন্দ্রীয় নির্বাচন কমিশনে অভিযোগ রেকর্ড হয়ে থাকে এবং বর্তমানে বিষয়টি তদন্তাধীন রয়েছে।
তিনি আরও বলেন, তিনি নিয়মিত বেগমগঞ্জ উপজেলা নির্বাচন অফিসে যাতায়াত করে সার্বিক কার্যক্রমের খোঁজখবর রাখার চেষ্টা করেন। তাঁর জানামতে, বর্তমানে বেগমগঞ্জ উপজেলা নির্বাচন অফিসে ভুক্তভোগী নাগরিকরা যথাযথভাবে সেবা পাচ্ছেন।
দালালদের দৌরাত্ম্য ও কোনো ধরনের অনিয়ম প্রশ্রয় না দেওয়ার বিষয়ে সম্প্রতি কুমিল্লা নির্বাচন কমিশন থেকে কেন্দ্রীয় সিদ্ধান্ত অনুযায়ী আরইউ (RU) এসেছেন বলেও তিনি জানান। এ সময় তিনি নিজেও সেখানে উপস্থিত ছিলেন বলে জানিয়েছেন।
স্থানীয় সাংবাদিক ও সমাজসেবকের বক্তব্য
বেগমগঞ্জ উপজেলার চৌমুহনী এলাকার প্রবীণ সাংবাদিক ও সমাজসেবক এম.জি. বাবর-এর সঙ্গে কথা হলে তিনি বলেন, অতীতে বেগমগঞ্জ উপজেলা নির্বাচন অফিসে বর্তমানের মতো এত সুন্দর ও সাবলীল পরিবেশ ছিল না। দালালদের দৌরাত্ম্যের কারণে সেবা নিতে আসা মানুষকে দিনের পর দিন, এমনকি মাসের পর মাসও ভোগান্তির শিকার হতে হয়েছে।
তিনি বলেন, বর্তমান উপজেলা নির্বাচন কর্মকর্তা মোহাম্মদ বুলবুল আহমেদ যোগদানের পর অফিসের কার্যক্রমে যথেষ্ট পরিবর্তন এসেছে। এর ফলে সাধারণ নাগরিকরা সরাসরি সেবা পাওয়ার সুযোগ পাচ্ছেন।
তাঁর দাবি, দালালচক্র শতভাগ সুবিধা নিতে না পারায় ঈর্ষাজনিত কারণে কয়েকজন সাংবাদিককে একপেশে ও ভুল তথ্য দিয়ে সংবাদ প্রকাশ করানো হয়েছে। তবে প্রকাশিত ওইসব সংবাদ প্রকৃত বাস্তবতার সঙ্গে পুরোপুরি সামঞ্জস্যপূর্ণ নয় বলেও তিনি মন্তব্য করেন।

জনবান্ধব প্রশাসনের প্রত্যাশা
বর্তমান সময়ে সরকারি সেবাকে আরও সহজ, স্বচ্ছ ও জনবান্ধব করার দাবি সাধারণ মানুষের। বেগমগঞ্জ উপজেলা নির্বাচন অফিসে সেবা প্রার্থীদের জন্য বসার ব্যবস্থা, সুপেয় পানি, প্রয়োজনীয় কাগজপত্রের তালিকা প্রদর্শন এবং নির্ধারিত সময়সূচি অনুযায়ী সেবা প্রদানের মতো উদ্যোগগুলো সাধারণ নাগরিকদের ভোগান্তি কমাতে ভূমিকা রাখছে বলে মনে করছেন স্থানীয়রা।
বাংলাদেশের প্রতিটি সরকারি দপ্তরে যদি একইভাবে নাগরিকবান্ধব ও কার্যকর সেবা নিশ্চিত করা যায়, তাহলে সাধারণ মানুষের সরকারি অফিসকেন্দ্রিক ভোগান্তি অনেকাংশে কমে আসবে—এমনটাই প্রত্যাশা সচেতন নাগরিকদের।
Reporter Name 





















