পীরজাদা মুফতি মোহাম্মদ মাছুম বিল্লাহ বাগদাদী
আগামী ১২ আগস্ট ২০২৬, বুধবার সফর মাসের শেষ বুধবার—আখেরী চাহার শোম্বা। মুসলিম সমাজের একটি অংশ দিনটিকে মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর সাময়িক রোগমুক্তির স্মরণে পালন করে থাকেন।
সফর মাসের শেষ বুধবার ও রোগমুক্তির গোসল
লেখকের বর্ণনা অনুযায়ী, সফর মাসের শেষ বুধবার মহানবী (সা.)-এর অসুস্থতা কিছুটা কমে যায়। তিনি হযরত আয়েশা (রা.)-কে গোসল করিয়ে দেওয়ার কথা বলেন এবং গোসলের পর কিছুটা সুস্থতা অনুভব করেন। লেখকের মতে, এটিই ছিল তাঁর দুনিয়ার জীবনের শেষ গোসল।
এরপর ইমাম হাসান (রা.), ইমাম হোসাইন (রা.) ও বিবি ফাতিমা (রা.)-কে ডেকে নেওয়া হয় এবং পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে তিনি সকালের খাবার গ্রহণ করেন। মহানবী (সা.)-এর সুস্থতার সংবাদ ছড়িয়ে পড়লে সাহাবায়ে কেরামের মধ্যে আনন্দের সৃষ্টি হয় বলে বিভিন্ন ধর্মীয় বর্ণনায় উল্লেখ করা হয়েছে।
লেখকের বর্ণনায় আরও বলা হয়েছে, মহানবী (সা.)-এর রোগমুক্তির সংবাদে সাহাবায়ে কেরাম আনন্দ প্রকাশ করেন এবং দান-সদকা করেন। আবু বকর সিদ্দিক (রা.), ওমর (রা.), উসমান (রা.), আলী (রা.) এবং আবদুর রহমান ইবনে আওফ (রা.)-এর দান-সদকার বিভিন্ন বিবরণও এতে উল্লেখ করা হয়েছে।
আখেরী চাহার শোম্বার প্রচলিত আমল
লেখকের মতে, মহানবী (সা.)-এর সাময়িক রোগমুক্তির ঘটনাকে স্মরণীয় করে রাখতে পারস্য, মধ্য এশিয়া ও ভারতীয় উপমহাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলে আখেরী চাহার শোম্বা পালন করা হয়ে থাকে।
এ দিন অনেকে মহানবী (সা.)-কে স্মরণ করে গোসল, দুই রাকাত শুকরিয়া নামাজ, দোয়া, দরুদ, কোরআন তিলাওয়াত, দান-সদকাসহ বিভিন্ন নফল ও নেক আমল করে থাকেন।
তবে আখেরী চাহার শোম্বার বিশেষ গোসল বা নির্দিষ্ট কিছু আমলের ধর্মীয় ভিত্তি নিয়ে আলেমদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে। তাই এসব আমলকে ইসলামের সর্বসম্মত বিধান হিসেবে না দেখে প্রচলিত ধর্মীয় রীতি ও মতামত হিসেবে বিবেচনা করা প্রয়োজন।
স্মরণীয় দিনের তাৎপর্য
লেখক বলেন, ইসলামের ইতিহাসে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা স্মরণ করার মাধ্যমে মুসলমানদের ঈমান, নৈতিকতা ও ধর্মীয় চেতনা জাগ্রত করা যায়। পবিত্র কোরআনে পূর্ববর্তী জাতি ও নবীদের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা বর্ণনা করা হয়েছে, যাতে মানুষ সেসব ঘটনা থেকে শিক্ষা ও হেদায়াত লাভ করতে পারে।
এ প্রসঙ্গে সূরা আল-বাকারার আয়াতের মাধ্যমে বনি ইসরাঈলকে আল্লাহর নেয়ামত ও ফেরাউনের হাত থেকে মুক্তির ঘটনা স্মরণ করার নির্দেশের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। একইভাবে সূরা আলে ইমরানের ৮১ নম্বর আয়াতেও নবীদের কাছ থেকে পরবর্তী রাসুলের প্রতি ঈমান ও সহযোগিতার অঙ্গীকারের বিষয়টি বর্ণিত হয়েছে।
লেখকের মতে, এসব আয়াত থেকে স্মরণীয় ঘটনা থেকে শিক্ষা নেওয়ার গুরুত্ব বোঝা যায়। তাঁর দৃষ্টিতে আখেরী চাহার শোম্বাও মহানবী (সা.)-এর জীবনের একটি স্মরণীয় ঘটনার সঙ্গে সম্পর্কিত হওয়ায় মুসলমানদের জন্য তা ধর্মীয় অনুভূতি ও ভালোবাসা প্রকাশের একটি উপলক্ষ।
আনন্দ ও বেদনার স্মৃতি
লেখকের বর্ণনা অনুযায়ী, আখেরী চাহার শোম্বার সঙ্গে মহানবী (সা.)-এর সাময়িক রোগমুক্তির আনন্দ যেমন জড়িয়ে আছে, তেমনি পরবর্তীতে তাঁর অসুস্থতা পুনরায় ফিরে আসার ঘটনাও স্মরণ করা হয়। ফলে দিনটিকে কেউ কেউ একই সঙ্গে আনন্দ ও বেদনার স্মৃতিবাহী দিন হিসেবে বিবেচনা করেন।
আখেরী চাহার শোম্বা পালন নিয়ে মুসলিম সমাজে ভিন্নমত রয়েছে। এক শ্রেণির আলেম এর বিশেষ আনুষ্ঠানিকতা ও নির্দিষ্ট আমলকে সমর্থন করেন না এবং এগুলোকে শরিয়তসম্মত প্রমাণিত আমল নয় বলে মনে করেন। অন্যদিকে, কিছু আলেম ও ধর্মীয় ব্যক্তিত্ব দিনটিকে মহানবী (সা.)-এর স্মরণ, দরুদ, দোয়া ও নেক আমলের মাধ্যমে পালন করার পক্ষে মত দেন।
সুতরাং এ দিনকে কেন্দ্র করে পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও সহনশীলতা বজায় রেখে মহানবী (সা.)-এর জীবন, আদর্শ ও শিক্ষা স্মরণ করা এবং মানবকল্যাণমূলক কাজে অংশ নেওয়াই হতে পারে এর ইতিবাচক দিক।
লেখক:
পীরজাদা মুফতি মোহাম্মদ মাছুম বিল্লাহ বাগদাদী
মুহাদ্দিস, দাসাদী ডি.এস.আই.এস. স্নাতকোত্তর কামিল (এম.এ) মাদ্রাসা, চাঁদপুর
এমফিল গবেষক, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, কুষ্টিয়া
Reporter Name 
























