মোঃ মুক্তাদির হোসেন, স্টাফ রিপোর্টার
নরসিংদীর পলাশে দলীয় পরিচয় ব্যবহার করে জমি জবরদখলের চেষ্টা ও প্রায় ৩০ বছর বয়সী একটি কাঁঠাল গাছ কাটার অভিযোগ উঠেছে বিএনপি নেতা কামাল হোসেন (মেম্বার) ও তাঁর সহযোগীদের বিরুদ্ধে। এ ঘটনায় জমির মালিক অমিত মোস্তফা খাঁন পলাশ থানায় একটি লিখিত অভিযোগ দায়ের করেছেন।
অভিযোগ সূত্রে জানা যায়, গত ১৭ আগস্ট ২০২৬ সকালে অমিত মোস্তফা খাঁনের মালিকানাধীন জমিতে ঘর নির্মাণের উদ্দেশ্যে চারটি সিমেন্টের পিলার রেখে যাওয়া হয়। একই সময় জমিতে থাকা প্রায় ৩০ বছর বয়সী একটি কাঁঠাল গাছ কেটে ফেলার অভিযোগও করা হয়েছে।
অমিত মোস্তফা খাঁনের দাবি, তাঁর ভাড়াটিয়া কুতুবউদ্দিন মিয়া বিষয়টি দেখতে পেয়ে ঘটনাস্থলে গিয়ে গাছ কাটার বিষয়ে জানতে চান। এ সময় গাছ কাটতে আসা ব্যক্তিরা কামাল মেম্বারের নির্দেশে গাছ কাটছেন বলে জানিয়ে দ্রুত গাছ সরিয়ে নিয়ে যায় এবং জমির ওপর চারটি সিমেন্টের পিলার রেখে চলে যায় বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।
পরে ভাড়াটিয়ার মাধ্যমে খবর পেয়ে অমিত মোস্তফা ঘটনাস্থলে এসে পলাশ থানায় লিখিত অভিযোগ দায়ের করেন।
অভিযোগে যা বলা হয়েছে
লিখিত অভিযোগে অমিত মোস্তফা খাঁন উল্লেখ করেন, তিনি মৃত মোবারক খাঁনের ছেলে। তাঁর অভিযোগের বিবাদী মোঃ কামাল হোসেন (মেম্বার), পিতা মৃত রফিজ উদ্দিন, সাং জয়পুরা, ডাকঘর খাস হাওলা, থানা পলাশ, জেলা নরসিংদী।
অভিযোগে বলা হয়, পলাশ থানাধীন গাবতলী মৌজায় দলিল নং-৯০৮/১১, তারিখ ১৪/০২/২০১১-এর মাধ্যমে অমিত মোস্তফা খাঁন ও তাঁর অন্যান্য ওয়ারিশরা জমি ক্রয় করেন। আরএস ৬৫ নম্বর খতিয়ানের আরএস ১৮৮ নম্বর দাগের ৩০ শতাংশ চালা জমির মধ্যে ৫ শতাংশ জমি নিয়ে বিবাদীর সঙ্গে দীর্ঘদিন ধরে বিরোধ চলে আসছে।
অমিত মোস্তফার দাবি, স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিদের উপস্থিতিতে একাধিকবার সালিশ হলেও বিরোধের সমাধান হয়নি। পরে তিনি নরসিংদীর বিজ্ঞ আদালতে মামলা নং-১৮/২০২৫, তারিখ ১৪/০৮/২০২৫ দায়ের করেন। মামলা করার পর থেকে তাঁকে বিভিন্ন সময় ভয়ভীতি দেখানো এবং প্রাণনাশের হুমকি দেওয়ার অভিযোগও করেন তিনি।
অভিযোগে আরও বলা হয়, গত ১৭ আগস্ট সকালে তাঁর জমিতে প্রবেশ করে প্রায় ৩০ বছর বয়সী কাঁঠাল গাছটি কেটে ফেলা হয়। সকাল ১০টার দিকে তাঁর ভাড়াটিয়া কুতুবউদ্দিন মিয়া ঘটনাস্থলে গিয়ে গাছ কাটার বিষয়ে জানতে চাইলে তাঁকে বলা হয়, কামাল মেম্বারের নির্দেশে গাছ কাটা হচ্ছে। পরে গাছ সরিয়ে নিয়ে গিয়ে জমিতে চারটি সিমেন্টের পিলার রেখে যাওয়া হয় বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।
ভাড়াটিয়ার বক্তব্য
অমিত মোস্তফা খাঁনের ভাড়াটিয়া ফরহাদ মিয়া বলেন, তিনি প্রায় সাত মাস ধরে মোস্তফা খাঁনের দোকান ভাড়া নিয়ে ব্যবসা করছেন। তাঁর দাবি, গত কিছুদিন ধরে কামাল মেম্বার দলীয় পরিচয় ব্যবহার করে তাঁদের ভোগদখলীয় সম্পত্তি দখলের চেষ্টা করছেন।
ফরহাদ মিয়া আরও বলেন, কামাল মেম্বার বিএনপির কোন পদে আছেন তা তাঁর জানা নেই। তবে দলীয়ভাবে কারও জমি বা ঘর দখল করা উচিত নয়। তিনি নিজেও বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত বলে দাবি করেন এবং তাঁকেও দোকান ছেড়ে দেওয়ার জন্য বলা হচ্ছে বলে জানান।
অভিযুক্ত কামাল মেম্বারের বক্তব্য
অভিযোগের বিষয়ে অভিযুক্ত কামাল হোসেন (মেম্বার) মোবাইল ফোনে বলেন, সম্পূর্ণ জমি তাঁর কাছে বিক্রি করার কথা ছিল। কিন্তু জমি বিক্রি না করে তাঁর ক্রয়কৃত জমির ওপর আদালতে মামলা করা হয়েছে।
তিনি দাবি করেন, তিনি মোস্তাকিন খাঁনের কাছ থেকে ১.২০ শতাংশ জমি ক্রয় করেছেন। তাঁর বক্তব্য, “তারা আমার গাছ কেটেছে, তাই আমি তাদের গাছ কেটেছি।”
দোকানদারদের দোকান ছেড়ে দেওয়ার বিষয়ে কামাল মেম্বার বলেন, যেহেতু জমির মালিক তাঁর বিরুদ্ধে আদালতে মামলা করেছেন, তাই দোকান খালি করে দেওয়ার জন্য তিনি দোকানদারদের বলেছেন।
পুলিশের বক্তব্য
পলাশ থানার তদন্ত কর্মকর্তা বলেন, লিখিত অভিযোগ পাওয়ার পর তিনি ঘটনাস্থলে সরেজমিনে গিয়ে গাছ কাটার বিষয়টির সত্যতা পেয়েছেন। পাশাপাশি অমিত মোস্তফা খাঁনের জমির ওপর চারটি সিমেন্টের পিলারও পাওয়া গেছে।
তিনি অমিত মোস্তফাকে বিষয়টি নিয়ে ফৌজদারি কার্যবিধির ১৪৫ ধারায় বিজ্ঞ আদালতে মামলা করার পরামর্শ দিয়েছেন বলে জানান।
জমির মালিকের বক্তব্য
অমিত মোস্তফা খাঁন বলেন, তাঁর বাবা তাঁর তিন ভাইয়ের নামে জমি লিখে দিয়েছিলেন। তাঁর বড় ভাই ১.২০ শতাংশ জমি কামাল মেম্বারের কাছে বিক্রি করার পর তিনি আদালতে মামলা করেন। তাঁর দাবি, আদালতে মামলা করাটাই এখন তাঁর বিরুদ্ধে বিরোধের অন্যতম কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
তিনি বলেন, তিনি কালীগঞ্জ পৌর বিএনপির আহ্বায়ক কমিটির সদস্য। দলীয় পরিচয় থাকলেও নিজের জমি কেন অন্য কেউ দখল করার চেষ্টা করবে—এ নিয়ে তিনি প্রশ্ন তোলেন।
অমিত মোস্তফা আরও বলেন, দেশে ফলজ ও বনজ গাছ রোপণের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। অথচ তাঁর জমিতে থাকা একটি পুরোনো ফলজ কাঁঠাল গাছ কেটে জমি দখলের চেষ্টা করা হচ্ছে বলে তিনি অভিযোগ করেন।
নিজের সম্পত্তি রক্ষায় স্থানীয় সংসদ সদস্য ও পুলিশ প্রশাসনের সার্বিক সহযোগিতা কামনা করেন অমিত মোস্তফা খাঁন।
তবে জমির মালিকানা, গাছ কাটার ঘটনা ও জমি দখলের অভিযোগ নিয়ে উভয় পক্ষের মধ্যে বিরোধ থাকায় বিষয়টি বর্তমানে আইনগত প্রক্রিয়ায় রয়েছে। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের তদন্ত ও আদালতের সিদ্ধান্তের পরই প্রকৃত মালিকানা ও দায়-দায়িত্বের বিষয়টি চূড়ান্তভাবে নির্ধারিত হবে।
Reporter Name 






















