অ্যাডভোকেট মোঃ কামরুজ্জামান ভূঁইয়া,
লেখক, গবেষক ও কলামিস্ট
সাংগঠনিক সম্পাদক, ঢাকাস্থ মানিকগঞ্জ কল্যাণ সমিতি
সাধারণ সম্পাদক, মানিকগঞ্জ যুব সমিতি, ঢাকা
ঢাকার খুব কাছে, অথচ বাস্তবে অনেক দূরে—এই এক বৈপরীত্যের নাম মানিকগঞ্জের হরিরামপুর উপজেলা। কাগজে কলমে দেড় থেকে দুই ঘণ্টার পথ, কিন্তু গুলিস্তান থেকে সেখানে পৌঁছাতে পাঁচ থেকে সাত ঘণ্টা সময় লেগে যায়। কারণ একটাই—ভগ্নদশার সড়ক, অনুন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থা এবং দীর্ঘদিনের অবহেলা।
নদীভাঙন: জীবনের অনিবার্য ট্র্যাজেডি
হরিরামপুর মানেই পদ্মা নদীর তীরবর্তী জনপদ। এখানে নদী শুধু সম্পদ নয়, একই সঙ্গে অভিশাপও। বছরের পর বছর নদীভাঙনে অসংখ্য পরিবার তাদের ভিটেমাটি হারিয়েছে। মাথাপিছু জমির পরিমাণ ক্রমাগত কমেছে। অনেকেই সর্বস্ব হারিয়ে ঢাকা ও অন্যান্য শহরে পাড়ি জমিয়েছে জীবিকার সন্ধানে।
আমিও সেই নদীভাঙনের শিকার। হরিরামপুরের বাহাদুরপুর গ্রামে আমার জন্ম। একসময় আমাদের বসতভিটা, আবাদি জমি সবই ছিল। আজ সেসব পদ্মার গর্ভে বিলীন। এখন ঢাকায় রিক্ত ও নিঃস্ব জীবন সংগ্রামই বাস্তবতা। এই অভিজ্ঞতা শুধু আমার একার নয়; হাজারো মানুষের জীবনের প্রতিচ্ছবি।
অবহেলার রাজনীতি ও উন্নয়নের ঘাটতি
দীর্ঘদিন ধরে জাতীয় পর্যায়ে শক্তিশালী প্রতিনিধিত্বের অভাব, রাজনৈতিক অগ্রাধিকারের বাইরে পড়ে থাকা এবং পরিকল্পিত উন্নয়ন না হওয়ায় হরিরামপুর পিছিয়ে পড়েছে। অথচ এখানে রয়েছে বিশাল প্রাকৃতিক সম্পদ—নদী, খাল-বিল, বিস্তীর্ণ চরাঞ্চল। রয়েছে সৎ, মেধাবী ও শিক্ষিত জনবল।
রাজনীতির সংঘাতে এ জনপদ বারবার অবহেলিত হয়েছে। কিন্তু সময় বদলাচ্ছে। এখন প্রয়োজন দলমত নির্বিশেষে ঐক্যবদ্ধ উন্নয়ন ভাবনা।
সম্ভাবনার নতুন স্বপ্ন
হরিরামপুরের চরাঞ্চলকে ঘিরে সাহসী ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নেওয়া গেলে এ অঞ্চল বদলে যেতে পারে। উদাহরণস্বরূপ—
-
চরাঞ্চলে আধুনিক বিমানবন্দর স্থাপন
-
গার্মেন্টস ও রপ্তানিমুখী শিল্পপ্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা
-
নদীভাঙন রোধে সমন্বিত প্রতিরক্ষা প্রকল্প
-
পরিকল্পিত নগরায়ণ ও শিল্প জোন
যদি এসব প্রকল্প বাস্তবায়ন করা যায়, তাহলে একাধিক সুফল মিলবে—
-
ঢাকার যানজট ও অতিরিক্ত চাপ কমবে
-
নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে
-
নদীভাঙন প্রতিরোধে স্থায়ী অবকাঠামো গড়ে উঠবে
-
একটি নতুন অর্থনৈতিক কেন্দ্র গড়ে উঠবে
-
পর্যটনের সম্ভাবনাও তৈরি হবে, কারণ নদীর মাঝে পরিকল্পিত অবকাঠামো বিশ্বে বিরল উদাহরণ হতে পারে
একটি পরিকল্পনার ভেতরে বহু সমাধান নিহিত থাকতে পারে—শুধু প্রয়োজন দূরদর্শিতা ও রাজনৈতিক সদিচ্ছা।
দায়িত্বশীল নেতৃত্বের প্রত্যাশা
মাননীয় সংসদ সদস্য মঈনুল ইসলাম খান এবং আফরোজা খানম রিতাসহ সংশ্লিষ্ট প্রতিনিধিদের প্রতি আমাদের আন্তরিক আহ্বান—হরিরামপুরের জন্য একটি সমন্বিত উন্নয়ন মহাপরিকল্পনা গ্রহণ করুন। নদীভাঙনের শিকার মানুষের দীর্ঘশ্বাস যেন উন্নয়নের শক্তিতে রূপ নেয়।
দলমত নয়, উন্নয়ন হোক মুখ্য
এই প্রস্তাব কোনো ব্যক্তিগত বা দলীয় স্বার্থে নয়। এটি নদীভাঙনে সর্বস্ব হারানো মানুষের বাঁচার আকুতি। হরিরামপুরকে ঘিরে হিংসা নয়, গঠনমূলক আলোচনা প্রয়োজন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শুধু আবেগ নয়, দায়িত্বশীল শেয়ার ও সচেতনতা দরকার।
আজ যদি আমরা স্বপ্ন দেখতে শিখি, আগামী প্রজন্ম বাস্তবতা দেখবে। হরিরামপুরকে অবহেলার জনপদ নয়, সম্ভাবনার মানচিত্রে তুলে আনাই হোক আমাদের অঙ্গীকার।
সবার প্রতি ভালোবাসা ও শুভকামনা।
Reporter Name 



























