Dhaka ০৯:০৩ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ২২ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ৭ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
শিরনাম:
দিনাজপুরের বীরগঞ্জে নারী স্মৃতি ফুটবল টুর্নামেন্ট অনুষ্ঠিত আরকান বা নামাজের ছেফত ছয়টি চরভদ্রাসনে ১০৫ পিস ইয়াবাসহ নারী আটক চরভদ্রাসনে মাদকবিরোধী অভিযানে যুবকের ৬ মাসের কারাদণ্ড মূল্যবৃদ্ধি ও আইনশৃঙ্খলার অবনতিতে জনগণ দিশেহারা: বিএসপি পঞ্চগড়ে ওলামা দলের ভিডিও-ছবি জামায়াতের নামে প্রচার, ছাত্রদলের ৬ নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে অভিযোগ টেকনাফে পুলিশের কর্মকর্তার বিরুদ্ধে সাংবাদিকের জমি দখলের অভিযোগ নবীনগরের বিদ্যাকুটে নিখোঁজের ২ দিন পর ঝোপঝাড়ে মিলল মাদ্রাসাছাত্রীর অর্ধগলিত লাশ ডিমলায় গ্রাহককে পিটালেন আলম ফিলিং স্টেশনের মালিক চন্দনাইশ পৌরসভার খসড়া মহাপরিকল্পনা উপস্থাপন কর্মশালা অনুষ্ঠিত
বিজ্ঞাপন :
জেলা-উপজেলা ও বিভাগীয় চীফ নিয়োগ দেয়া হচ্ছে। সাংবাদিকতায় আগ্রহীরা দ্রুত যোগাযোগ করুন। পরীক্ষামূলক সম্প্রচার ও নিবন্ধন প্রক্রিয়াধীন । সম্পদক-ইমদাদুল হক তৈয়ব-01711576603, সিভি পাঠান এই ইমেইলে- editor.manobjibon@gmail.com

গরু-লাঙলের চাষাবাদ হারিয়ে যাচ্ছে, ঐতিহ্য আঁকড়ে ডিমলার বনমালী

  • Reporter Name
  • সময়: ১২:৫৩:৪৪ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ২১ সেপ্টেম্বর ২০২৬
  • ৩৮ Time View

মোঃ বাদশা সেকেন্দার ভুট্টো,
ডিমলা (নীলফামারী) প্রতিনিধি:

সময়ের পরিবর্তন আর আধুনিক কৃষিপ্রযুক্তির বিস্তারে নীলফামারীর ডিমলা উপজেলায় হারিয়ে যেতে বসেছে গরু ও লাঙলনির্ভর চাষাবাদের ঐতিহ্য। একসময় যে লাঙল, জোয়াল আর বলদ গরু ও মহিষ ছিল গ্রামীণ কৃষকের নিত্যদিনের সঙ্গী, এখন তা অনেকটাই অতীতের স্মৃতিতে পরিণত হয়েছে। তবে আধুনিকতার এই সময়ে এখনও ঐতিহ্যবাহী পদ্ধতিতে জমি চাষ করে চলেছেন উপজেলার কয়েকজন কৃষক।

ডিমলা উপজেলার দক্ষিণ তিতপাড়া ঝেল্লাপাড়া গ্রামের বাসিন্দা বনমালী রায় (৭০) তাঁদেরই একজন। বয়সের ভারে ন্যুব্জ হলেও গরু ও লাঙলের মাধ্যমে চাষাবাদের পুরোনো পদ্ধতি ধরে রেখেছেন তিনি। অবশ্য আগের মতো বিস্তীর্ণ জমিতে নয়, বর্তমানে সামান্য কিছু জমিতেই এই পদ্ধতিতে চাষ করেন তিনি।

একই গ্রামের আবুল হাসেম (৬৫) বলেন, “গরু দিয়ে লাঙল চাষাবাদ আমাদের অতীতের অনেক স্মৃতিকে ঢেকে দিয়েছে। এখন সেই অতীতের কথা মনে পড়লে বড় অসহায় লাগে। এখন আধুনিক যন্ত্রের মাঝে আমাদের অতীতের স্মৃতি হারিয়ে গেছে।”

আরেক কৃষক মোঃ ফজলু ঘাটু (৭৭) নামের এক বৃদ্ধ তাঁর বাড়িতে নিয়ে গিয়ে স্মৃতি হিসেবে রাখা লাঙল, মইসহ কিছু সরঞ্জাম দেখান। একটি বাঁশের লাঠি দেখিয়ে তিনি বলেন, “এটাকে আমরা পেন্টি বলি। বাবা রে, এটা কি তোরা দেখেছিস? এটা দিয়ে আমরা গরুকে ভয় দেখিয়ে আমাদের মতো করে চাষ করে নিতাম।”

স্থানীয় বয়োজ্যেষ্ঠ কৃষকদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, আশি ও নব্বইয়ের দশকে ডিমলার গ্রামীণ কৃষিজীবনে গরু-লাঙলের ব্যবহার ছিল ব্যাপক। অনেক কৃষকের বাড়িতেই ছিল এক বা একাধিক জোড়া বলদ গরু। ভোরের আলো ফোটার আগেই কৃষকেরা গরুর ঘাড়ে জোয়াল তুলে মাঠের পথে রওনা দিতেন। দিনভর জমিতে হালচাষ শেষে সূর্যাস্তের পর ক্লান্ত শরীরে ফিরতেন বাড়িতে।

সে সময় কৃষিকাজে গবাদিপশুর গোবর সার ব্যবহারের প্রচলন ছিল। কৃষকেরা জমির উর্বরতা ধরে রাখতে প্রাকৃতিক উপকরণের ওপর নির্ভর করতেন। গ্রামীণ জীবনের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে ছিল গরু পালন, লাঙল তৈরি এবং মাঠে চাষাবাদের নানা প্রথা।

আরও পড়ুনঃ  নাগরিক তথ্য অধিকার ফোরাম মধ্যনগর শাখার ২ বছর মেয়াদি কমিটি ঘোষণা

কিন্তু সময়ের সঙ্গে কৃষিতে এসেছে ব্যাপক পরিবর্তন। পাওয়ার টিলার, ট্রাক্টরসহ বিভিন্ন আধুনিক যন্ত্রপাতির ব্যবহার বেড়ে যাওয়ায় দ্রুত ও কম সময়ে জমি চাষ করা সম্ভব হচ্ছে। ফলে গরু-লাঙলের প্রয়োজনীয়তা কমেছে, আর ধীরে ধীরে হারিয়ে যাচ্ছে এই ঐতিহ্যবাহী কৃষিপদ্ধতি।

বয়োজ্যেষ্ঠ কৃষকদের ভাষ্য, আধুনিক কৃষিযন্ত্র কাজের গতি বাড়িয়েছে এবং শ্রম ও সময় সাশ্রয় করেছে। তবে এর ফলে গ্রামবাংলার কৃষিজীবনের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা অনেক পুরোনো রীতি ও চর্চা এখন আর আগের মতো দেখা যায় না। একসময় মাঠে মাঠে শোনা যেত লাঙলের শব্দ, কৃষকের হাঁকডাক ও রাখালদের সুর। বর্তমানে সেই পরিচিত দৃশ্য অনেকটাই বিলীন।

বনমালী রায়ের মতো কৃষকেরা ঐতিহ্য ধরে রাখলেও গরু-লাঙলের চাষাবাদ এখন আর প্রধান কৃষিপদ্ধতি নয়। আধুনিক প্রযুক্তির অগ্রযাত্রার পাশাপাশি পুরোনো কৃষিসংস্কৃতির এই নিদর্শনগুলোও ধীরে ধীরে হারিয়ে যাচ্ছে। ফলে ডিমলার গ্রামীণ জীবনে গরু-লাঙলের চাষাবাদ আজ কেবল কৃষিকাজের একটি পদ্ধতি নয়, বরং অতীতের এক স্মরণীয় অধ্যায়।

Tag :
জনপ্রিয় নিউজ

দিনাজপুরের বীরগঞ্জে নারী স্মৃতি ফুটবল টুর্নামেন্ট অনুষ্ঠিত

গরু-লাঙলের চাষাবাদ হারিয়ে যাচ্ছে, ঐতিহ্য আঁকড়ে ডিমলার বনমালী

সময়: ১২:৫৩:৪৪ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ২১ সেপ্টেম্বর ২০২৬

মোঃ বাদশা সেকেন্দার ভুট্টো,
ডিমলা (নীলফামারী) প্রতিনিধি:

সময়ের পরিবর্তন আর আধুনিক কৃষিপ্রযুক্তির বিস্তারে নীলফামারীর ডিমলা উপজেলায় হারিয়ে যেতে বসেছে গরু ও লাঙলনির্ভর চাষাবাদের ঐতিহ্য। একসময় যে লাঙল, জোয়াল আর বলদ গরু ও মহিষ ছিল গ্রামীণ কৃষকের নিত্যদিনের সঙ্গী, এখন তা অনেকটাই অতীতের স্মৃতিতে পরিণত হয়েছে। তবে আধুনিকতার এই সময়ে এখনও ঐতিহ্যবাহী পদ্ধতিতে জমি চাষ করে চলেছেন উপজেলার কয়েকজন কৃষক।

ডিমলা উপজেলার দক্ষিণ তিতপাড়া ঝেল্লাপাড়া গ্রামের বাসিন্দা বনমালী রায় (৭০) তাঁদেরই একজন। বয়সের ভারে ন্যুব্জ হলেও গরু ও লাঙলের মাধ্যমে চাষাবাদের পুরোনো পদ্ধতি ধরে রেখেছেন তিনি। অবশ্য আগের মতো বিস্তীর্ণ জমিতে নয়, বর্তমানে সামান্য কিছু জমিতেই এই পদ্ধতিতে চাষ করেন তিনি।

একই গ্রামের আবুল হাসেম (৬৫) বলেন, “গরু দিয়ে লাঙল চাষাবাদ আমাদের অতীতের অনেক স্মৃতিকে ঢেকে দিয়েছে। এখন সেই অতীতের কথা মনে পড়লে বড় অসহায় লাগে। এখন আধুনিক যন্ত্রের মাঝে আমাদের অতীতের স্মৃতি হারিয়ে গেছে।”

আরেক কৃষক মোঃ ফজলু ঘাটু (৭৭) নামের এক বৃদ্ধ তাঁর বাড়িতে নিয়ে গিয়ে স্মৃতি হিসেবে রাখা লাঙল, মইসহ কিছু সরঞ্জাম দেখান। একটি বাঁশের লাঠি দেখিয়ে তিনি বলেন, “এটাকে আমরা পেন্টি বলি। বাবা রে, এটা কি তোরা দেখেছিস? এটা দিয়ে আমরা গরুকে ভয় দেখিয়ে আমাদের মতো করে চাষ করে নিতাম।”

স্থানীয় বয়োজ্যেষ্ঠ কৃষকদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, আশি ও নব্বইয়ের দশকে ডিমলার গ্রামীণ কৃষিজীবনে গরু-লাঙলের ব্যবহার ছিল ব্যাপক। অনেক কৃষকের বাড়িতেই ছিল এক বা একাধিক জোড়া বলদ গরু। ভোরের আলো ফোটার আগেই কৃষকেরা গরুর ঘাড়ে জোয়াল তুলে মাঠের পথে রওনা দিতেন। দিনভর জমিতে হালচাষ শেষে সূর্যাস্তের পর ক্লান্ত শরীরে ফিরতেন বাড়িতে।

সে সময় কৃষিকাজে গবাদিপশুর গোবর সার ব্যবহারের প্রচলন ছিল। কৃষকেরা জমির উর্বরতা ধরে রাখতে প্রাকৃতিক উপকরণের ওপর নির্ভর করতেন। গ্রামীণ জীবনের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে ছিল গরু পালন, লাঙল তৈরি এবং মাঠে চাষাবাদের নানা প্রথা।

আরও পড়ুনঃ  নাগরিক তথ্য অধিকার ফোরাম মধ্যনগর শাখার ২ বছর মেয়াদি কমিটি ঘোষণা

কিন্তু সময়ের সঙ্গে কৃষিতে এসেছে ব্যাপক পরিবর্তন। পাওয়ার টিলার, ট্রাক্টরসহ বিভিন্ন আধুনিক যন্ত্রপাতির ব্যবহার বেড়ে যাওয়ায় দ্রুত ও কম সময়ে জমি চাষ করা সম্ভব হচ্ছে। ফলে গরু-লাঙলের প্রয়োজনীয়তা কমেছে, আর ধীরে ধীরে হারিয়ে যাচ্ছে এই ঐতিহ্যবাহী কৃষিপদ্ধতি।

বয়োজ্যেষ্ঠ কৃষকদের ভাষ্য, আধুনিক কৃষিযন্ত্র কাজের গতি বাড়িয়েছে এবং শ্রম ও সময় সাশ্রয় করেছে। তবে এর ফলে গ্রামবাংলার কৃষিজীবনের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা অনেক পুরোনো রীতি ও চর্চা এখন আর আগের মতো দেখা যায় না। একসময় মাঠে মাঠে শোনা যেত লাঙলের শব্দ, কৃষকের হাঁকডাক ও রাখালদের সুর। বর্তমানে সেই পরিচিত দৃশ্য অনেকটাই বিলীন।

বনমালী রায়ের মতো কৃষকেরা ঐতিহ্য ধরে রাখলেও গরু-লাঙলের চাষাবাদ এখন আর প্রধান কৃষিপদ্ধতি নয়। আধুনিক প্রযুক্তির অগ্রযাত্রার পাশাপাশি পুরোনো কৃষিসংস্কৃতির এই নিদর্শনগুলোও ধীরে ধীরে হারিয়ে যাচ্ছে। ফলে ডিমলার গ্রামীণ জীবনে গরু-লাঙলের চাষাবাদ আজ কেবল কৃষিকাজের একটি পদ্ধতি নয়, বরং অতীতের এক স্মরণীয় অধ্যায়।