
হাকিকুল ইসলাম খোকন, বাপসনিউজঃ চাঁদপুর জেলার ফরিদগঞ্জ উপজেলাজুড়ে সাংবাদিকতার পরিচয় ব্যবহার করে শিক্ষক-শিক্ষিকা, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এবং সাধারণ মানুষের ওপর দীর্ঘদিন ধরে ভয়ভীতি, হয়রানি ও চাঁদাবাজির অভিযোগ উঠেছে আব্দুল কাদের নামের এক ব্যক্তির বিরুদ্ধে। নিজেকে “কালবেলা” পত্রিকার প্রতিনিধি পরিচয়দানকারী এই ব্যক্তির কর্মকাণ্ডে উপজেলার শিক্ষা অঙ্গনে চরম আতঙ্ক ও ক্ষোভ বিরাজ করছে বলে আইবিএননিউজকে জানিয়েছেন একাধিক শিক্ষক, অভিভাবক ও স্থানীয় সচেতন মহল।খবর বাপসনিউজ ।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, গত দুই থেকে তিন বছর ধরে আব্দুল কাদের উপজেলার বিভিন্ন সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, মাধ্যমিক বিদ্যালয় ও কলেজে আকস্মিকভাবে প্রবেশ করে কোনো ধরনের প্রশাসনিক অনুমতি ছাড়াই শ্রেণিকক্ষে ঢুকে ভিডিও ধারণ, শিক্ষক-শিক্ষিকাদের জিজ্ঞাসাবাদ এবং বিভিন্ন অভিযোগ তুলে ভয়ভীতি প্রদর্শনের মাধ্যমে এক ধরনের অরাজক পরিস্থিতি সৃষ্টি করে আসছেন। ভুক্তভোগীদের দাবি, অনেক ক্ষেত্রেই তিনি কোনো অনিয়মের প্রমাণ না পেলেও ইচ্ছাকৃতভাবে ভিডিও ধারণ করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচারের ভয় দেখিয়ে প্রতিষ্ঠান প্রধান ও শিক্ষকদের ওপর চাপ সৃষ্টি করেন।
ভয় দেখিয়ে অর্থ আদায়ের অভিযোগ
একাধিক শিক্ষকের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, আব্দুল কাদের বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানকে তার কাছ থেকে ইন্টারনেট সংযোগ গ্রহণ কিংবা স্কুলের ওয়েবসাইট নির্মাণের জন্য চাপ প্রয়োগ করতেন। কেউ তার প্রস্তাবে রাজি না হলে তিনি অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ, মানহানির হুমকি এবং ফেসবুকে নেতিবাচক প্রচারণা চালানোর ভয় দেখিয়ে মোটা অঙ্কের অর্থ দাবি করতেন বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক প্রধান শিক্ষক এনওয়াইবিডি নিউজকে বলেন,
“তিনি হঠাৎ স্কুলে এসে ক্যামেরা নিয়ে ভিডিও করতে শুরু করেন। পরে বলেন স্কুলের নানা অনিয়ম তিনি প্রকাশ করবেন। এরপর নিজেই ওয়েবসাইট ও ইন্টারনেট সেবার প্রস্তাব দেন। আমরা রাজি না হলে তিনি আমাদের বিরুদ্ধে অপপ্রচার চালানোর হুমকি দেন এবং টাকা দাবি করেন।”
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, গত দুই বছরে ফরিদগঞ্জ উপজেলার অন্তত ১৫ থেকে ২০টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষিকাদের কাছ থেকে বিভিন্ন অজুহাতে প্রায় ৮ থেকে ১০ লাখ টাকা আদায়ের অভিযোগ উঠেছে তার বিরুদ্ধে।
প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোই প্রধান টার্গেট
অনুসন্ধানে আরও জানা যায়, অভিযুক্তের প্রধান টার্গেট ছিল উপজেলার সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলো। বিশেষ করে প্রত্যন্ত অঞ্চলের সহজ-সরল শিক্ষক-শিক্ষিকাদের ভয়ভীতি দেখিয়ে আর্থিক সুবিধা আদায়ের একাধিক অভিযোগ পাওয়া গেছে। ফলে অনেক শিক্ষক বর্তমানে নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন এবং স্বাভাবিক শিক্ষাকার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
সাহেবগঞ্জের কুঠির বাজার এলাকার এক শিক্ষক, যিনি নিরাপত্তার স্বার্থে নাম প্রকাশ করতে চাননি, স্থানীয় প্রতিবেদকের কাছে মোটা অঙ্কের চাঁদা দাবির বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য ও কিছু প্রমাণ উপস্থাপন করেছেন বলে জানা গেছে। তিনি ফরিদগঞ্জ থানায় মামলা দায়েরের প্রস্তুতি নিচ্ছেন বলেও সংশ্লিষ্ট সূত্র নিশ্চিত করেছে।
মাদক ব্যবসা ও রাজনৈতিক পরিচয় ব্যবহারের অভিযোগ
শুধু শিক্ষা প্রতিষ্ঠানকেন্দ্রিক চাঁদাবাজিই নয়, আব্দুল কাদেরের বিরুদ্ধে আরও গুরুতর অভিযোগ রয়েছে বলে স্থানীয় একাধিক সূত্র জানিয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, তিনি ফরিদগঞ্জ এলাকায় মাদক বিস্তার ও মাদক ব্যবসার সঙ্গে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে জড়িত এবং উঠতি বয়সী তরুণদের মাঝে মাদক সরবরাহের একটি নেটওয়ার্ক পরিচালনায় সম্পৃক্ত।
স্থানীয়দের দাবি, বিগত সরকারের সময় তিনি নিজেকে ছাত্রলীগের কর্মী পরিচয় দিয়ে বিভিন্ন ব্যবসা প্রতিষ্ঠান থেকে চাঁদা আদায় করতেন। পরবর্তীতে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর সাংবাদিক পরিচয় ব্যবহার করে নতুনভাবে প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা শুরু করেন। অভিযোগ রয়েছে, সাংবাদিকতার নাম ব্যবহার করে সাধারণ মানুষ, শিক্ষক-শিক্ষিকা এবং ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের ভয়ভীতি দেখিয়ে ব্যক্তিস্বার্থ হাসিলের অপচেষ্টা চালিয়ে আসছেন তিনি।
শিক্ষক সমাজে ক্ষোভ ও উদ্বেগ
ফরিদগঞ্জের শিক্ষক সমাজ এই ঘটনায় তীব্র উদ্বেগ ও ক্ষোভ প্রকাশ করেছে। শিক্ষক ফোরামের কয়েকজন নেতা বলেন,
“সাংবাদিকতা একটি সম্মানজনক পেশা। কিন্তু কিছু ব্যক্তি এই পরিচয় ব্যবহার করে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করছে। শিক্ষকদের সম্মানহানি ও ভয় দেখিয়ে অর্থ আদায় কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। দ্রুত কঠোর ব্যবস্থা না নিলে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হবে।”
প্রশাসনের হস্তক্ষেপ দাবি
ভুক্তভোগী শিক্ষক, সচেতন নাগরিক ও স্থানীয় অভিভাবকরা অবিলম্বে এই অভিযোগগুলোর নিরপেক্ষ তদন্ত এবং অভিযুক্তের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন। তাদের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে এসব কর্মকাণ্ড চললেও অজ্ঞাত কারণে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। ফলে অভিযুক্ত আরও বেপরোয়া হয়ে উঠেছে।
এ বিষয়ে অভিযুক্ত আব্দুল কাদেরের বক্তব্য নেওয়ার জন্য একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তার পক্ষ থেকে কোনো সদুত্তর পাওয়া যায়নি।
স্থানীয়দের প্রশ্ন—সাংবাদিকতার মতো মর্যাদাপূর্ণ পেশার আড়ালে যদি চাঁদাবাজি, ভয়ভীতি ও প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ ওঠে, তবে এর দায় কে নেবে? এখন দেখার বিষয়, প্রশাসন ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ এসব গুরুতর অভিযোগের বিষয়ে কত দ্রুত এবং কতটা কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করে।
Reporter Name 

























