

বিশ্ব ইতিহাসের পাতা উল্টালে আমরা দু’টি ভয়াবহ অধ্যায় দেখতে পাই— World War I এবং World War II। প্রথম বিশ্বযুদ্ধে প্রায় দেড় কোটির বেশি মানুষ প্রাণ হারায়, আর দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ মানবসভ্যতার ইতিহাসে সবচেয়ে রক্তক্ষয়ী সংঘাতে রূপ নেয়; নিহতের সংখ্যা প্রায় ৭ থেকে ৮ কোটির মধ্যে। যুদ্ধ শুধু সামরিক পরাজয় বা বিজয়ের হিসাব নয়, এটি ছিল মানবতার চরম বিপর্যয়, অর্থনীতির ধস, দুর্ভিক্ষ, উদ্বাস্তু স্রোত এবং নৈতিকতার অবক্ষয়ের নির্মম দলিল।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ভয়াবহতা বিশ্বকে বাধ্য করেছিল নতুন আন্তর্জাতিক কাঠামো গড়ে তুলতে। এর ফলশ্রুতিতে প্রতিষ্ঠিত হয় United Nations, যার লক্ষ্য ছিল ভবিষ্যৎ যুদ্ধ প্রতিরোধ, আন্তর্জাতিক শান্তি রক্ষা এবং মানবাধিকার সুরক্ষা নিশ্চিত করা। কিন্তু প্রশ্ন থেকে যায়— আমরা কি সত্যিই যুদ্ধমুক্ত পৃথিবী গড়তে পেরেছি
বর্তমান বিশ্ব প্রেক্ষাপটে সরাসরি বিশ্বযুদ্ধ না হলেও আঞ্চলিক যুদ্ধ, প্রক্সি সংঘাত এবং ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা বিশ্বকে অস্থিতিশীল করে তুলেছে। Russia-Ukraine War ইউরোপের নিরাপত্তা কাঠামোকে নাড়িয়ে দিয়েছে। একইভাবে মধ্যপ্রাচ্যে Israel-Hamas War মানবিক বিপর্যয়ের নতুন অধ্যায় তৈরি করেছে। লক্ষাধিক মানুষ বাস্তুচ্যুত, হাজার হাজার প্রাণহানি, ধ্বংসস্তূপে পরিণত জনপদ— এসব কেবল সংবাদ শিরোনাম নয়, এগুলো মানবিক ট্র্যাজেডির বাস্তব চিত্র।
যুদ্ধের প্রভাব কেবল যুদ্ধক্ষেত্রে সীমাবদ্ধ থাকে না। খাদ্য সংকট, জ্বালানি মূল্য বৃদ্ধি, বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থার ভাঙন এবং অর্থনৈতিক মন্দা বিশ্বজুড়ে সাধারণ মানুষের জীবনকে বিপর্যস্ত করে তোলে। উন্নয়নশীল দেশগুলো বিশেষভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। যুদ্ধের কারণে গম, জ্বালানি ও সার রপ্তানি ব্যাহত হলে তার প্রভাব পড়ে কৃষি উৎপাদনে; ফলশ্রুতিতে মূল্যস্ফীতি বেড়ে যায়, দারিদ্র্য গভীর হয়।
আইন ও মানবাধিকার দৃষ্টিকোণ থেকেও পরিস্থিতি উদ্বেগজনক। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইন, জেনেভা কনভেনশনসহ বিভিন্ন চুক্তি বেসামরিক নাগরিকদের সুরক্ষার নিশ্চয়তা দিলেও বাস্তবে বহু ক্ষেত্রে তা লঙ্ঘিত হচ্ছে। যুদ্ধাপরাধ, গণহত্যা, জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুতি— এসব অপরাধ আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের এখতিয়ারভুক্ত হলেও রাজনৈতিক বাস্তবতা অনেক সময় ন্যায়বিচারের পথে বাধা হয়ে দাঁড়ায়।

বিশ্বযুদ্ধের সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা যখন ঘনীভূত হয়, তখন পারমাণবিক অস্ত্রভাণ্ডারের বিষয়টি সামনে আসে। পারমাণবিক শক্তিধর রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে সরাসরি সংঘাত মানবসভ্যতার জন্য অস্তিত্বের সংকট ডেকে আনতে পারে। তাই কূটনৈতিক সংলাপ, আঞ্চলিক সহযোগিতা এবং আন্তর্জাতিক আইনের প্রতি শ্রদ্ধা আজ আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি প্রয়োজন।
আমাদের মনে রাখতে হবে, যুদ্ধের সবচেয়ে বড় শিকার সাধারণ মানুষ। শিশুর কান্না, মায়ের আহাজারি, শরণার্থীর দীর্ঘশ্বাস— এগুলো কোনো রাষ্ট্রীয় কৌশলের অংশ নয়; এগুলো মানবতার বেদনা। শান্তি প্রতিষ্ঠা কেবল রাজনৈতিক অঙ্গীকার নয়, এটি নৈতিক দায়বদ্ধতা।
আজকের পৃথিবীতে স্থায়ী শান্তির জন্য প্রয়োজন ন্যায়ভিত্তিক আন্তর্জাতিক ব্যবস্থা, শক্তিশালী কূটনীতি এবং মানবাধিকারের প্রতি আন্তরিক প্রতিশ্রুতি। ইতিহাস আমাদের সতর্ক করে দিয়েছে— বিশ্বযুদ্ধের আগুন একবার জ্বলে উঠলে তা নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন। তাই সংঘাত নয়, সংলাপ; প্রতিশোধ নয়, ন্যায়বিচার; আধিপত্য নয়, সহাবস্থান— এ পথেই টিকে থাকতে পারে মানবসভ্যতা।
অ্যাড. মোঃ কামরুজ্জামান ভূঁইয়া
লেখক, গবেষক ও কলামিষ্ট।
অ্যাড. মোঃ কামরুজ্জামান ভূঁইয়া 



























