
মো. মুক্তাদির হোসেন,
স্টাফ রিপোর্টার
গাজীপুরের কালীগঞ্জে বাল্যবিবাহ, মাদক এবং গ্রাম আদালত বিষয়ে এক সচেতনতামূলক সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে। সভায় বক্তারা মাদকমুক্ত সমাজ গঠন, বাল্যবিবাহ প্রতিরোধ এবং গ্রাম আদালতের কার্যকারিতা সম্পর্কে জনসচেতনতা বৃদ্ধির ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
বৃহস্পতিবার (১১ জুন) বিকেলে উপজেলা প্রশাসনের আয়োজনে এবং তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তির মাধ্যমে নারীদের ক্ষমতায়ন প্রকল্প (দ্বিতীয় পর্যায়) ‘তথ্য আপা’র সহযোগিতায় তুমলিয়া ইউনিয়নের উত্তর সোম দারোগা বাড়িতে এ সচেতনতামূলক সভা অনুষ্ঠিত হয়।
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন কালীগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) এটিএম কামরুল ইসলাম।
সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি বলেন, “মাদক কোনো সমাধান নয়; বরং এটি জীবন ধ্বংসের অন্যতম কারণ। মাদকাসক্ত ব্যক্তি শুধু নিজেই ক্ষতিগ্রস্ত হয় না, তার পরিবার ও সমাজও ক্ষতির মুখে পড়ে। তাই মাদকমুক্ত সমাজ গড়তে হলে পরিবার থেকে শুরু করে সামাজিকভাবে সবাইকে একযোগে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে।”
তিনি আরও বলেন, স্থানীয় সরকারের সবচেয়ে তৃণমূল স্তর হলো ইউনিয়ন পরিষদ এবং ছোটখাটো বিরোধ নিষ্পত্তির একটি কার্যকর ব্যবস্থা হচ্ছে গ্রাম আদালত। ১৯৭৬ সাল থেকে আইনের মাধ্যমে গ্রাম আদালতের কার্যক্রম চালু রয়েছে। ২০০৬ সালে আইন সংশোধন এবং ২০১৬ সালে বিধিমালা প্রণয়নের পর গ্রাম আদালতকে আরও সক্রিয় করার উদ্যোগ নেওয়া হয়।
তিনি জানান, মামলাভেদে গ্রাম আদালত গঠিত হয়। এতে ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যানসহ মোট পাঁচ সদস্যের একটি প্যানেল থাকে। আবেদনকারী ও প্রতিবাদী পক্ষ থেকে দুজন করে চারজন সদস্য মনোনীত হন। নারীর স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয় হলে নারী সদস্য মনোনয়ন বাধ্যতামূলক। গ্রাম আদালতের মাধ্যমে কম খরচে এবং স্বল্প সময়ে বিরোধ নিষ্পত্তি সম্ভব হয়।
বাল্যবিবাহ প্রতিরোধ প্রসঙ্গে ইউএনও বলেন, “বাল্যবিবাহ নিরোধ আইন, ২০১৭ অনুযায়ী ১৮ বছরের নিচে কোনো মেয়ের বিয়ে দেওয়া যাবে না। ‘২০-তে বুড়ি নয়, ১৮ বছরের নিচে মেয়েদের বিয়ে নয়’—এই বার্তা সবাইকে মনে রাখতে হবে। আগামীতে যাতে কোনো বাল্যবিবাহ না ঘটে, সে বিষয়ে সমাজের প্রতিটি মানুষকে সচেতন থাকতে হবে।”
কালীগঞ্জ উপজেলার তথ্যসেবা কর্মকর্তা সোহা তামান্নার সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন কালীগঞ্জ থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মো. জাকির হোসেন এবং তুমলিয়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মো. আবু বকর মিয়া।
ওসি মো. জাকির হোসেন বলেন, “মাদকমুক্ত কালীগঞ্জ গড়ি, সুস্থ-সবল জীবন গড়ি। মাদক শুধু একজন মানুষকে ধ্বংস করে না; এটি একটি পরিবার এবং পুরো সমাজকে পঙ্গু করে দেয়। একটি ছেলে মাদকে জড়িয়ে পড়লে শুধু তার জীবন নয়, তার বাবা-মায়ের স্বপ্ন এবং ভবিষ্যৎও ধ্বংস হয়ে যায়। তাই মাদকের বিরুদ্ধে লড়াই মানে নিজের ভবিষ্যৎকে রক্ষা করার লড়াই। মাদকাসক্তকে নয়, মাদককে ঘৃণা করুন।”
তিনি আরও বলেন, বিভিন্ন স্কুল-কলেজ এবং স্থানীয় পর্যায়ে মাদকের ভয়াল থাবা থেকে যুবসমাজকে রক্ষা এবং সামাজিক অবক্ষয় প্রতিরোধে সবাইকে সম্মিলিতভাবে এগিয়ে আসতে হবে।
তুমলিয়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মো. আবু বকর মিয়া বলেন, “গ্রাম আদালতে দেওয়ানি ও ফৌজদারি—উভয় ধরনের বিরোধের নিষ্পত্তি করা যায়। এখানে নিজের কথা নিজেই বলা যায়, আইনজীবীর প্রয়োজন হয় না। দেওয়ানি মামলার জন্য মাত্র ২০ টাকা এবং ফৌজদারি মামলার জন্য ১০ টাকা ফি নির্ধারিত রয়েছে। এছাড়া এখতিয়ারভুক্ত মামলার ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ তিন লাখ টাকা পর্যন্ত ক্ষতিপূরণ প্রদানের আদেশ দিতে পারে গ্রাম আদালত।”
এ সময় উপজেলার বিভিন্ন দপ্তরের কর্মকর্তা, ইউনিয়ন পরিষদের সদস্যবৃন্দ এবং স্থানীয় বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন।
বক্তারা বলেন, সচেতনতা বৃদ্ধি এবং সামাজিক অংশগ্রহণের মাধ্যমেই মাদক, বাল্যবিবাহ ও সামাজিক বিরোধ কমিয়ে একটি নিরাপদ, মানবিক ও সুস্থ সমাজ গড়ে তোলা সম্ভব।
Reporter Name 



























