Dhaka ০৩:০৩ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ০২ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১৭ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
শিরনাম:
বিএনপির ৪৮তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে বালিয়াডাঙ্গীতে শোভাযাত্রা ও সমাবেশ শাহজালাল বিমানবন্দরে ৪০ ভরি স্বর্ণালংকারসহ আটক ২ বুড়িচং কালীনারায়ণ বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ে কৃতি শিক্ষার্থীদের সংবর্ধনা ইমরান খানকে একাকী কারাবাসে না রাখার নির্দেশ পাকিস্তান হাইকোর্টের দিনাজপুরের ঐতিহাসিক কান্তজীউ মন্দির পরিদর্শনে মার্কিন রাষ্ট্রদূত ব্রেন্ট ক্রিস্টেনসেন স্বাভাবিক ছন্দে শুরু হয়েছে সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক পিএলসির কার্যক্রম, গ্রাহকদের পূর্ণ নিরাপত্তার আশ্বাস হাতিয়ায় উপজেলা বিএনপির উদ্যোগে ৪৮তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী পালিত বর্ণাঢ্য আয়োজনে ঝিনাইদহে ‘সবুজ বাংলা টিভি’র দ্বিতীয় প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উদযাপন মানবিকতার দৃষ্টান্ত জুলাই যোদ্ধা রাসেল, পাশে দাঁড়ালেন অসুস্থ মোশাররফের ঝিকরগাছায় সরকারি পরিপত্র উপেক্ষা করে এতিম ছাত্রীকে বেত্রাঘাতের অভিযোগ, ধামাচাপার চেষ্টার অভিযোগ
বিজ্ঞাপন :
জেলা-উপজেলা ও বিভাগীয় চীফ নিয়োগ দেয়া হচ্ছে। সাংবাদিকতায় আগ্রহীরা দ্রুত যোগাযোগ করুন। পরীক্ষামূলক সম্প্রচার ও নিবন্ধন প্রক্রিয়াধীন । সম্পদক-ইমদাদুল হক তৈয়ব-01711576603, সিভি পাঠান এই ইমেইলে- editor.manobjibon@gmail.com

অর্থ আর স্বার্থ ছাড়া কেউ ফিরে তাকায় না: আত্মীয়তার অবক্ষয়ের সমাজচিত্র!

  • Reporter Name
  • সময়: ০৭:০০:৩০ অপরাহ্ন, রবিবার, ২৮ ডিসেম্বর ২০২৫
  • ৩৬০ Time View

অ্যাডভোকেট মোঃ কামরুজ্জামান ভূঁইয়া,


একসময় মানুষ মানুষকে ভালোবাসতো নিঃস্বার্থভাবে। এক ভাই অন্য ভাইয়ের পাশে দাঁড়াত, এক প্রতিবেশী অন্যের দুঃখে কান্না মিশিয়ে দিত নিজের হৃদয়ে। আত্মীয়তা ছিল এক গভীর মানবিক বন্ধন—যেখানে সম্পর্কের ভিত্তি ছিল ভালোবাসা, সম্মান ও পারস্পরিক শ্রদ্ধা। কিন্তু আজকের সমাজে সেই সম্পর্কগুলো যেন অর্থ, স্বার্থ ও অবস্থানের হিসেবের খাতায় পরিণত হয়েছে।

বর্তমান প্রেক্ষাপটে আমরা দেখছি— আত্মীয়তার বন্ধন যতটা রক্তের সম্পর্কের, তার চেয়ে বেশি হয়ে উঠেছে স্বার্থের সম্পর্ক। যেখানে অর্থ আছে, ক্ষমতা আছে, প্রভাব আছে— সেখানে আত্মীয়দের উপস্থিতি চোখে পড়ে; কিন্তু যেখানে অভাব, সংকট, দুরবস্থা— সেখানে সবাই মুখ ফিরিয়ে নেয়।

অর্থই এখন সম্পর্কের পরিমাপক: বাংলাদেশসহ বিশ্বজুড়ে সামাজিক কাঠামোর এক বড় পরিবর্তন ঘটেছে। অর্থনৈতিক প্রতিযোগিতা, ভোগবাদ ও স্বার্থনির্ভর জীবনযাত্রা মানুষের মানসিক কাঠামোকেই বদলে দিয়েছে।

সমাজবিজ্ঞানীরা বলছেন— “আধুনিক যুগে আত্মীয়তার সংজ্ঞা অর্থনৈতিক মানদণ্ডে নির্ধারিত হচ্ছে।” অর্থাৎ, যে সাহায্য করতে পারে, যে প্রভাবশালী, যে আর্থিকভাবে স্থিতিশীল— তিনিই এখন “আত্মীয়”, “প্রিয়জন” বা “সম্মানিত ব্যক্তি” হিসেবে গণ্য।

আইনের দৃষ্টিতেও আমরা দেখি, পারিবারিক মামলা, উত্তরাধিকার, সম্পত্তি ও হেফাজত সংক্রান্ত বিরোধের বেশিরভাগই আত্মীয়স্বজনের মধ্যেই। একই রক্তের মানুষ একে অপরের বিরুদ্ধে আদালতে লড়ছে, শুধুমাত্র অর্থ ও সম্পদের বিভাজন নিয়ে। যেখানে একসময় পৈতৃক জমি ছিল ঐক্যের প্রতীক, এখন তা বিভেদের কারণ।

আত্মীয়তার অবক্ষয়: সমাজবিজ্ঞান ও বাস্তবতা: বিশ্বব্যাপী সমাজবিজ্ঞানীরা মনে করেন— আত্মীয়তার অবক্ষয়ের মূল কারণ হলো “মানবিক মূল্যবোধের সংকট”।

যেখানে একসময় “একজনের সুখ মানেই পরিবারের সুখ” ছিল, এখন সেখানে “আমি” কেন্দ্রিক চিন্তা প্রাধান্য পাচ্ছে। শহুরে জীবনযাত্রা, ব্যস্ততা, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভার্চুয়াল সম্পর্ক— সবকিছু মিলিয়ে সম্পর্কের গভীরতা হারিয়ে যাচ্ছে।

বাংলাদেশের গ্রামীণ সমাজেও এখন আত্মীয়তার উষ্ণতা ক্রমশ কমে যাচ্ছে। পূর্বে গ্রামের এক আত্মীয়ের অসুস্থতায় সবাই ছুটে যেত, এখন ফোনে খোঁজ নেওয়াই যথেষ্ট মনে করা হয়। “সময় নেই” — এই অজুহাতেই আমরা হারাচ্ছি মানবিকতার আসল মূল্যবোধ।

আরও পড়ুনঃ  কর্মজীবনে চাকরি নয়, আত্মউন্নয়নই হোক লক্ষ্য

আইন ও নৈতিকতার দৃষ্টিতে সম্পর্কের দায়বদ্ধতা: ইসলামসহ বিশ্বের প্রায় সব ধর্মই আত্মীয়তা রক্ষাকে নৈতিক ও ধর্মীয় দায়িত্ব হিসেবে বিবেচনা করেছে।

কুরআনে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে— “আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্ন করো না।” এমনকি দেওয়ানি আইনেও উত্তরাধিকার ও পারিবারিক অধিকারের ক্ষেত্রে আত্মীয়তার গুরুত্ব সর্বাধিক। তবুও বাস্তবে দেখা যায়— যখন উত্তরাধিকার বিভাজনের প্রশ্ন আসে, তখন ভাই ভাইয়ের শত্রু হয়ে যায়। পারিবারিক আইন, ফ্যামিলি কোর্ট অ্যাক্ট ১৯৮৫ অনুসারে, পরিবারে বিবাদ নিষ্পত্তির জন্য আদালতের পাশাপাশি মধ্যস্থতার গুরুত্বও উল্লেখ করা হয়েছে। কিন্তু বাস্তবতা হলো— আত্মীয়তার মধ্যে যখন অর্থ ঢোকে, তখন আদালতও অনেক সময় সম্পর্কের মানসিক ক্ষতি পূরণ করতে পারে না।

আধুনিক সমাজের চ্যালেঞ্জ: আজকের সমাজে অর্থ অপরিহার্য — কিন্তু তা যদি মানবতার উপরে স্থান পায়, তবে সম্পর্কগুলো যান্ত্রিক হয়ে যায়।

যে সমাজে আত্মীয়তা কেবল লেনদেনের উপর নির্ভর করে, সেখানে ভালোবাসা বিলুপ্ত হয়, সহানুভূতি হারিয়ে যায়। অর্থের ঝলকে চোখ অন্ধ হয়ে গেলে মানুষ ভুলে যায়— জীবনের শেষ প্রান্তে অর্থ নয়, সম্পর্কই শান্তি দেয়।

পথ নির্দেশ: মানবিকতার পুনর্জাগরণ: আমাদের সমাজে এখন প্রয়োজন আত্মীয়তার প্রতি নতুন দৃষ্টিভঙ্গি— যেখানে অর্থ নয়, মূল্যবোধই হবে সম্পর্কের ভিত্তি। শিক্ষা, পরিবার ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে মানবিকতা ও পারস্পরিক শ্রদ্ধার চর্চা বাড়াতে হবে। আইনের পাশাপাশি নৈতিকতার চর্চাই পারে এই অবক্ষয় থামাতে।

আজ আমরা যদি আত্মীয়তার জায়গায় স্বার্থের দেয়াল তুলতে থাকি, তবে সমাজের মূল কাঠামো ধসে পড়বে। অর্থ প্রয়োজন, কিন্তু তা যেন মানবিকতার বিকল্প না হয়।
সত্যিকারের আত্মীয় সে-ই, যে বিপদে পাশে থাকে — না যে সুবিধার সময় হাসিমুখে আসে।

অ্যাডভোকেট মোঃ কামরুজ্জামান ভূঁইয়া
আইনজীবী, সমাজ বিশ্লেষক,লেখক ও গবেষক।
(দৈনিক মানবজীবন কলাম বিভাগ)

Tag :
জনপ্রিয় নিউজ

বিএনপির ৪৮তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে বালিয়াডাঙ্গীতে শোভাযাত্রা ও সমাবেশ

অর্থ আর স্বার্থ ছাড়া কেউ ফিরে তাকায় না: আত্মীয়তার অবক্ষয়ের সমাজচিত্র!

সময়: ০৭:০০:৩০ অপরাহ্ন, রবিবার, ২৮ ডিসেম্বর ২০২৫

অ্যাডভোকেট মোঃ কামরুজ্জামান ভূঁইয়া,


একসময় মানুষ মানুষকে ভালোবাসতো নিঃস্বার্থভাবে। এক ভাই অন্য ভাইয়ের পাশে দাঁড়াত, এক প্রতিবেশী অন্যের দুঃখে কান্না মিশিয়ে দিত নিজের হৃদয়ে। আত্মীয়তা ছিল এক গভীর মানবিক বন্ধন—যেখানে সম্পর্কের ভিত্তি ছিল ভালোবাসা, সম্মান ও পারস্পরিক শ্রদ্ধা। কিন্তু আজকের সমাজে সেই সম্পর্কগুলো যেন অর্থ, স্বার্থ ও অবস্থানের হিসেবের খাতায় পরিণত হয়েছে।

বর্তমান প্রেক্ষাপটে আমরা দেখছি— আত্মীয়তার বন্ধন যতটা রক্তের সম্পর্কের, তার চেয়ে বেশি হয়ে উঠেছে স্বার্থের সম্পর্ক। যেখানে অর্থ আছে, ক্ষমতা আছে, প্রভাব আছে— সেখানে আত্মীয়দের উপস্থিতি চোখে পড়ে; কিন্তু যেখানে অভাব, সংকট, দুরবস্থা— সেখানে সবাই মুখ ফিরিয়ে নেয়।

অর্থই এখন সম্পর্কের পরিমাপক: বাংলাদেশসহ বিশ্বজুড়ে সামাজিক কাঠামোর এক বড় পরিবর্তন ঘটেছে। অর্থনৈতিক প্রতিযোগিতা, ভোগবাদ ও স্বার্থনির্ভর জীবনযাত্রা মানুষের মানসিক কাঠামোকেই বদলে দিয়েছে।

সমাজবিজ্ঞানীরা বলছেন— “আধুনিক যুগে আত্মীয়তার সংজ্ঞা অর্থনৈতিক মানদণ্ডে নির্ধারিত হচ্ছে।” অর্থাৎ, যে সাহায্য করতে পারে, যে প্রভাবশালী, যে আর্থিকভাবে স্থিতিশীল— তিনিই এখন “আত্মীয়”, “প্রিয়জন” বা “সম্মানিত ব্যক্তি” হিসেবে গণ্য।

আইনের দৃষ্টিতেও আমরা দেখি, পারিবারিক মামলা, উত্তরাধিকার, সম্পত্তি ও হেফাজত সংক্রান্ত বিরোধের বেশিরভাগই আত্মীয়স্বজনের মধ্যেই। একই রক্তের মানুষ একে অপরের বিরুদ্ধে আদালতে লড়ছে, শুধুমাত্র অর্থ ও সম্পদের বিভাজন নিয়ে। যেখানে একসময় পৈতৃক জমি ছিল ঐক্যের প্রতীক, এখন তা বিভেদের কারণ।

আত্মীয়তার অবক্ষয়: সমাজবিজ্ঞান ও বাস্তবতা: বিশ্বব্যাপী সমাজবিজ্ঞানীরা মনে করেন— আত্মীয়তার অবক্ষয়ের মূল কারণ হলো “মানবিক মূল্যবোধের সংকট”।

যেখানে একসময় “একজনের সুখ মানেই পরিবারের সুখ” ছিল, এখন সেখানে “আমি” কেন্দ্রিক চিন্তা প্রাধান্য পাচ্ছে। শহুরে জীবনযাত্রা, ব্যস্ততা, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভার্চুয়াল সম্পর্ক— সবকিছু মিলিয়ে সম্পর্কের গভীরতা হারিয়ে যাচ্ছে।

বাংলাদেশের গ্রামীণ সমাজেও এখন আত্মীয়তার উষ্ণতা ক্রমশ কমে যাচ্ছে। পূর্বে গ্রামের এক আত্মীয়ের অসুস্থতায় সবাই ছুটে যেত, এখন ফোনে খোঁজ নেওয়াই যথেষ্ট মনে করা হয়। “সময় নেই” — এই অজুহাতেই আমরা হারাচ্ছি মানবিকতার আসল মূল্যবোধ।

আরও পড়ুনঃ  ইরানকে চাপে ফেলতে ট্রাম্পের নতুন অর্থনৈতিক যুদ্ধ, চীনের সহযোগিতা কি মিলবে?

আইন ও নৈতিকতার দৃষ্টিতে সম্পর্কের দায়বদ্ধতা: ইসলামসহ বিশ্বের প্রায় সব ধর্মই আত্মীয়তা রক্ষাকে নৈতিক ও ধর্মীয় দায়িত্ব হিসেবে বিবেচনা করেছে।

কুরআনে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে— “আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্ন করো না।” এমনকি দেওয়ানি আইনেও উত্তরাধিকার ও পারিবারিক অধিকারের ক্ষেত্রে আত্মীয়তার গুরুত্ব সর্বাধিক। তবুও বাস্তবে দেখা যায়— যখন উত্তরাধিকার বিভাজনের প্রশ্ন আসে, তখন ভাই ভাইয়ের শত্রু হয়ে যায়। পারিবারিক আইন, ফ্যামিলি কোর্ট অ্যাক্ট ১৯৮৫ অনুসারে, পরিবারে বিবাদ নিষ্পত্তির জন্য আদালতের পাশাপাশি মধ্যস্থতার গুরুত্বও উল্লেখ করা হয়েছে। কিন্তু বাস্তবতা হলো— আত্মীয়তার মধ্যে যখন অর্থ ঢোকে, তখন আদালতও অনেক সময় সম্পর্কের মানসিক ক্ষতি পূরণ করতে পারে না।

আধুনিক সমাজের চ্যালেঞ্জ: আজকের সমাজে অর্থ অপরিহার্য — কিন্তু তা যদি মানবতার উপরে স্থান পায়, তবে সম্পর্কগুলো যান্ত্রিক হয়ে যায়।

যে সমাজে আত্মীয়তা কেবল লেনদেনের উপর নির্ভর করে, সেখানে ভালোবাসা বিলুপ্ত হয়, সহানুভূতি হারিয়ে যায়। অর্থের ঝলকে চোখ অন্ধ হয়ে গেলে মানুষ ভুলে যায়— জীবনের শেষ প্রান্তে অর্থ নয়, সম্পর্কই শান্তি দেয়।

পথ নির্দেশ: মানবিকতার পুনর্জাগরণ: আমাদের সমাজে এখন প্রয়োজন আত্মীয়তার প্রতি নতুন দৃষ্টিভঙ্গি— যেখানে অর্থ নয়, মূল্যবোধই হবে সম্পর্কের ভিত্তি। শিক্ষা, পরিবার ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে মানবিকতা ও পারস্পরিক শ্রদ্ধার চর্চা বাড়াতে হবে। আইনের পাশাপাশি নৈতিকতার চর্চাই পারে এই অবক্ষয় থামাতে।

আজ আমরা যদি আত্মীয়তার জায়গায় স্বার্থের দেয়াল তুলতে থাকি, তবে সমাজের মূল কাঠামো ধসে পড়বে। অর্থ প্রয়োজন, কিন্তু তা যেন মানবিকতার বিকল্প না হয়।
সত্যিকারের আত্মীয় সে-ই, যে বিপদে পাশে থাকে — না যে সুবিধার সময় হাসিমুখে আসে।

অ্যাডভোকেট মোঃ কামরুজ্জামান ভূঁইয়া
আইনজীবী, সমাজ বিশ্লেষক,লেখক ও গবেষক।
(দৈনিক মানবজীবন কলাম বিভাগ)