মো. আফজাল হোসেন, সুনামগঞ্জ
সরকারি কর্মসম্পাদন পরিবীক্ষণ পদ্ধতি (GPMS)-এর আওতায় সরকারের প্রথম ১৮০ দিনের অর্জন ও ভবিষ্যৎ উন্নয়ন পরিকল্পনা বাস্তবায়নে গণমাধ্যমের ভূমিকা নিয়ে সুনামগঞ্জে মতবিনিময় সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে। সভায় জেলার বিভিন্ন উন্নয়ন কর্মকাণ্ড, জনদুর্ভোগ, প্রশাসনিক জটিলতা, তথ্যপ্রাপ্তির প্রতিবন্ধকতা, গুজব ও অপপ্রচারসহ বিভিন্ন বিষয়ে সাংবাদিকরা মতামত তুলে ধরেন।
শনিবার সকাল ১০টা থেকে দিনব্যাপী জেলা সমাজসেবা কার্যালয়ের সম্মেলন কক্ষে এ সভা অনুষ্ঠিত হয়। সিলেট আঞ্চলিক তথ্য অফিসের আয়োজনে এবং সুনামগঞ্জ জেলা তথ্য অফিসের সহযোগিতায় সভাটি অনুষ্ঠিত হয়।
সভায় প্রধান অতিথি হিসেবে তথ্য অধিদপ্তরের প্রধান তথ্য অফিসার সৈয়দ আবদাল আহমদের উপস্থিত থাকার কথা থাকলেও তিনি সশরীরে উপস্থিত হতে পারেননি। পরে প্রধান অতিথির বক্তব্য দেন সিলেট আঞ্চলিক তথ্য অফিসের উপপ্রধান তথ্য অফিসার হাছিনা আক্তার। তথ্য অধিদপ্তরের ওয়েবসাইটেও হাছিনা আক্তারকে উপপ্রধান তথ্য অফিসার হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন সিলেট আঞ্চলিক তথ্য অফিসের প্রশাসনিক কর্মকর্তা মোহাম্মদ মহসিন ও আঞ্চলিক তথ্য অফিসার মো. আকিকুর রেজা। সুনামগঞ্জ জেলা তথ্য অফিসের উপপরিচালক শেখ ওয়ালিদ ফয়েজের সভাপতিত্বে সভায় জেলার বিভিন্ন প্রিন্ট, ইলেকট্রনিক ও অনলাইন গণমাধ্যমে কর্মরত সাংবাদিকরা অংশ নেন।
সভায় গুজব ও অপপ্রচার প্রতিরোধ, সরকারের উন্নয়ন পরিকল্পনা, ভবিষ্যৎ চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় গণমাধ্যমের ভূমিকা এবং উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের তথ্য জনগণের কাছে পৌঁছে দিতে তথ্য অধিদপ্তরের ভূমিকা নিয়ে আলোচনা হয়। একই সঙ্গে জেলার বিভিন্ন সমস্যা ও সম্ভাবনা সম্পর্কে সাংবাদিকদের মতামত জানতে চান তথ্য অফিসের কর্মকর্তারা।
হাওর, বালুমহাল ও আইনশৃঙ্খলা নিয়ে উদ্বেগ
মতবিনিময় সভায় সাংবাদিকরা সুনামগঞ্জের হাওরাঞ্চলে ধান উৎপাদন ও সরকারি সংগ্রহ কার্যক্রমে বিভিন্ন সমস্যার কথা তুলে ধরেন। কৃষকদের উৎপাদিত ধান সংগ্রহে মধ্যস্বত্বভোগী ও সিন্ডিকেটের প্রভাব, খাদ্যগুদামে ধান-চাল সংগ্রহসংক্রান্ত তথ্যপ্রাপ্তির জটিলতা এবং নির্ধারিত বরাদ্দের তুলনায় বেশি ধান সংগ্রহের সুযোগ তৈরির বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দৃষ্টি আকর্ষণ করা হয়।
এ ছাড়া জেলার বিভিন্ন বালুমহালে অনিয়ম ও অবৈধভাবে বালু উত্তোলনের অভিযোগ তুলে রাষ্ট্রীয় সম্পদ রক্ষায় প্রশাসনিক নজরদারি জোরদারের দাবি জানান সাংবাদিকরা।
আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি, চাঁদাবাজি, খুন, ধর্ষণ, ছিনতাই, চুরি এবং ‘মব জাস্টিস’-এর নামে আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার প্রবণতা নিয়েও আলোচনা হয়। প্রশাসনিক কার্যক্রমে রাজনৈতিক প্রভাবের অভিযোগও কয়েকজন সাংবাদিক তুলে ধরেন।
সম্প্রতি তাহিরপুরে পারিবারিক বিরোধের জেরে তিন সন্তানসহ এক ব্যক্তির বিষপানের ঘটনাটিও আলোচনায় আসে। সাংবাদিকরা বলেন, এ ধরনের সামাজিক সংকটের কারণ চিহ্নিত করে কার্যকর প্রতিরোধমূলক উদ্যোগ প্রয়োজন।
স্বাস্থ্যসেবা ও প্রশাসনিক সেবা নিয়েও প্রশ্ন
সুনামগঞ্জ ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট সদর হাসপাতালে চিকিৎসক ও নার্স সংকট, চিকিৎসা সরঞ্জাম ও ওষুধের ঘাটতি এবং রোগীদের খাবারের মান নিয়ে অসন্তোষের বিষয়ও সভায় তুলে ধরা হয়।
এ ছাড়া বিভিন্ন সরকারি দপ্তরে তথ্য প্রদানে অনীহা, নাগরিকদের সঙ্গে অসদাচরণ, ঘুষ-বাণিজ্যের অভিযোগ, বৈষম্যমূলক আচরণ ও প্রশাসনিক অব্যবস্থাপনা নিয়েও সাংবাদিকরা তাঁদের অভিজ্ঞতা তুলে ধরেন।
রাস্তা, ঘাট, সেতু, কালভার্ট ও ভবন নির্মাণকাজে অনিয়ম-দুর্নীতির অভিযোগের পাশাপাশি রাজনৈতিক প্রভাব ও স্বজনপ্রীতি বন্ধে কার্যকর নজরদারির দাবিও জানানো হয়।
জেলা প্রশাসনের সহযোগিতা নিয়ে সাংবাদিকদের ক্ষোভ
সরকারের উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের তথ্য গণমাধ্যমে তুলে ধরার ক্ষেত্রে জেলা প্রশাসনের কাছ থেকে পর্যাপ্ত সহযোগিতা না পাওয়ার অভিযোগ করেন কয়েকজন সাংবাদিক। বিশেষ করে জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ মিনহাজুর রহমানের সঙ্গে যোগাযোগ এবং সরকারি উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের তথ্য সংগ্রহে জটিলতার অভিযোগ তুলে তাঁরা ক্ষোভ প্রকাশ করেন।
সাংবাদিকদের কয়েকজন দাবি করেন, বর্তমান জেলা প্রশাসক দায়িত্ব নেওয়ার পর গণমাধ্যমকর্মীদের সঙ্গে যোগাযোগ ও সরকারি কর্মকাণ্ড সম্পর্কে তথ্য প্রদানের ক্ষেত্রে আগের তুলনায় সীমাবদ্ধতা তৈরি হয়েছে। সরকারি বিভিন্ন কার্যক্রম সম্পর্কে জানতে জেলা প্রশাসকের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করেও অনেক সময় সাড়া পাওয়া যায় না বলেও তাঁরা অভিযোগ করেন।
বালুমহালসহ বিভিন্ন বিষয়ে প্রশাসনের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন সাংবাদিকরা। তাঁদের বক্তব্য, সরকারি উন্নয়ন কর্মকাণ্ড ও প্রশাসনের কার্যক্রম সম্পর্কে গণমাধ্যমকে নিয়মিত তথ্য দেওয়া হলে জনগণের কাছে উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের তথ্য আরও কার্যকরভাবে পৌঁছে দেওয়া সম্ভব হবে।
কয়েকজন সাংবাদিক জেলা প্রশাসকের ভূমিকা নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করে তাঁকে অন্যত্র বদলির দাবিও জানান। তবে সভায় উত্থাপিত এসব অভিযোগের বিষয়ে জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ মিনহাজুর রহমানের বক্তব্য তাৎক্ষণিকভাবে জানা যায়নি।
তথ্যপ্রাপ্তি নিশ্চিতের দাবি
সভায় বক্তারা বলেন, উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের সাফল্য ও সীমাবদ্ধতা জনগণের সামনে তুলে ধরতে গণমাধ্যমের স্বাধীন, দায়িত্বশীল ও তথ্যভিত্তিক ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। একই সঙ্গে গুজব, অপপ্রচার ও বিভ্রান্তিকর তথ্য প্রতিরোধে সাংবাদিকদের দায়িত্বশীল ভূমিকার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়।
সাংবাদিকরা বলেন, সরকারের উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের ইতিবাচক দিক যেমন গণমাধ্যমে তুলে ধরতে হবে, তেমনি উন্নয়ন বাস্তবায়নে অনিয়ম, দুর্নীতি, অব্যবস্থাপনা ও জনদুর্ভোগের বিষয়ও নিরপেক্ষভাবে প্রকাশের সুযোগ থাকতে হবে। সংশ্লিষ্ট সরকারি দপ্তরগুলো থেকে সময়মতো তথ্য পাওয়া গেলে অনুসন্ধানী ও জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট সাংবাদিকতা আরও শক্তিশালী হবে।
সভায় সুনামগঞ্জের বিভিন্ন সমস্যা সমাধানে প্রশাসন, জনপ্রতিনিধি ও সংশ্লিষ্ট সরকারি দপ্তরের সমন্বিত উদ্যোগ এবং গণমাধ্যমের সঙ্গে কার্যকর যোগাযোগ বৃদ্ধির ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়।
সভায় দৈনিক সুনামকণ্ঠের সম্পাদক ও প্রকাশক বিজন সেন রায়, সুনামগঞ্জ প্রেস ক্লাবের সভাপতি শেরগুল আহমেদ, সাংবাদিক মো. মিজানুর রহমান, আল হেলাল, দৈনিক সুনামগঞ্জ খবরের সম্পাদক ও প্রকাশক পঙ্কজ কান্তি দে, প্রথম আলোর নিজস্ব প্রতিবেদক খলিলুর রহমান, সময় টিভির জেলা প্রতিনিধি হিমাদ্রী শেখর ভদ্র, বাংলাদেশ প্রতিদিন ও বাংলা ভিশনের জেলা প্রতিনিধি মাসুম হেলালসহ জেলার বিভিন্ন গণমাধ্যমের সাংবাদিকরা উপস্থিত ছিলেন।
Reporter Name 




















