দেশের চামড়া শিল্পকে আবারও বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় শক্ত অবস্থানে ফিরিয়ে আনতে ট্যানারি খাতে ব্যাপক সংস্কার, নতুন বিনিয়োগ আকর্ষণ এবং আন্তর্জাতিক মানের উৎপাদন ব্যবস্থা নিশ্চিত করার উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। একই সঙ্গে এশিয়া ও ইউরোপের গুরুত্বপূর্ণ বাজারে বাংলাদেশের চামড়া ও চামড়াজাত পণ্যের রপ্তানি বাড়ানোর পরিকল্পনাও নেওয়া হচ্ছে।
রাজধানীর মহাখালীর ব্র্যাক সেন্টারে আয়োজিত ‘Advancing Bangladesh’s Leather Sector: Challenges, Opportunities and Reform’ শীর্ষক নীতি সংলাপে বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির এসব পরিকল্পনার কথা জানান।
ট্যানারি খাতে সংস্কার ও নতুন বিনিয়োগ
মন্ত্রী বলেন, হাজারীবাগ থেকে সাভারের হেমায়েতপুরে ট্যানারি স্থানান্তরের সিদ্ধান্তটি সঠিক ছিল। তবে স্থানান্তরের পর শিল্প এলাকার ব্যবস্থাপনা ও বাস্তবায়নে নানা দুর্বলতার কারণে চামড়া শিল্প ক্ষতির মুখে পড়েছে।
দীর্ঘদিন বিনিয়োগ করার পর যেসব উদ্যোক্তা বর্তমানে নতুন করে বিনিয়োগ করতে আগ্রহী বা সক্ষম নন, তাদের জন্য ‘গ্রেসফুল এক্সিট’ বা সম্মানজনকভাবে ব্যবসা থেকে বের হয়ে যাওয়ার সুযোগ তৈরি করা হবে। এর ফলে নতুন উদ্যোক্তা ও বিনিয়োগকারীদের জন্য খাতে বিনিয়োগের সুযোগ সৃষ্টি হবে বলে জানান তিনি।
আন্তর্জাতিক মান নিশ্চিত করতে LWG সনদ
ভবিষ্যতে দেশের ট্যানারি শিল্পে শতভাগ কমপ্লায়েন্স নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হবে। আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের চামড়ার গ্রহণযোগ্যতা বাড়াতে Leather Working Group (LWG) সনদ অর্জন বাধ্যতামূলক করার পরিকল্পনার কথাও জানান বাণিজ্যমন্ত্রী।
সরকারের লক্ষ্য হচ্ছে কাঁচা চামড়া রপ্তানির পরিবর্তে দেশে চামড়া প্রক্রিয়াজাত করে জুতা, ব্যাগসহ বিভিন্ন উচ্চমূল্যের চামড়াজাত পণ্য তৈরি ও রপ্তানি করা। এর মাধ্যমে আন্তর্জাতিক বাজারে ‘বাংলাদেশ লেদার’ নামে একটি শক্তিশালী ব্র্যান্ড প্রতিষ্ঠা করতে চায় সরকার।
CETP সংকট সমাধানে নতুন উদ্যোগ
সাভারের ট্যানারি শিল্পের অন্যতম বড় সমস্যা কেন্দ্রীয় বর্জ্য শোধনাগার বা CETP। এ সমস্যা সমাধানে নতুন বিশ্বমানের CETP নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি বিদ্যমান CETP সংস্কারের বিষয়টিও বিবেচনায় রয়েছে।
মন্ত্রী জানান, প্রকল্প অনুযায়ী CETP-এর বর্জ্য শোধন ক্ষমতা ২৫ হাজার ঘনমিটার হলেও বর্তমানে কার্যকরভাবে মাত্র ১৪ থেকে ১৫ হাজার ঘনমিটার বর্জ্য শোধন করা সম্ভব হচ্ছে।
বড় ট্যানারিগুলোর জন্য নিজস্ব ETP স্থাপন বাধ্যতামূলক করা হবে। আর ছোট ট্যানারিগুলো কেন্দ্রীয় CETP ব্যবস্থার সঙ্গে সমন্বয় করে শতভাগ পরিবেশগত কমপ্লায়েন্স নিশ্চিত করবে।
বর্জ্য থেকেই তৈরি হবে নতুন শিল্প
ট্যানারি শিল্পের কঠিন বর্জ্যকে বোঝা হিসেবে না দেখে সম্পদে পরিণত করার পরিকল্পনাও নেওয়া হচ্ছে। এ জন্য ট্যানারির বর্জ্য থেকে ট্যালো, হাড়ের গুঁড়া ও অন্যান্য ব্যবহারযোগ্য পণ্য তৈরির জন্য কয়েকটি কারখানা স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হবে।
এর মাধ্যমে সাভারের হেমায়েতপুর ট্যানারি শিল্প এলাকাকে একটি সমন্বিত বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও পুনর্ব্যবহারভিত্তিক শিল্পাঞ্চলে রূপান্তর করার পরিকল্পনা রয়েছে সরকারের।
জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া ও ইউরোপের বাজারে নজর
বাংলাদেশের চামড়া ও চামড়াজাত পণ্যের রপ্তানি বাড়াতে জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া ও ইউরোপের বাজারে বাণিজ্য সুবিধা সম্প্রসারণের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
একই সঙ্গে স্পেন ও ইতালির বড় চামড়া শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোকে বাংলাদেশে বিনিয়োগে উৎসাহিত করার পরিকল্পনা রয়েছে। এসব উদ্যোগ সফল হলে দেশে নতুন বিনিয়োগের পাশাপাশি প্রযুক্তি, দক্ষতা ও আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে সংযোগ বাড়বে বলে আশা করা হচ্ছে।
দক্ষতা ও ডিজাইন উন্নয়নে নতুন কেন্দ্র
চামড়া শিল্পের ভবিষ্যৎ উন্নয়নে দক্ষ জনবল ও আধুনিক ডিজাইনের গুরুত্বও তুলে ধরেন বাণিজ্যমন্ত্রী। তিনি জানান, ২০২৭ সালের মধ্যে সাভারে চামড়া ও অন্যান্য শিল্পের জন্য দক্ষতা ও ডিজাইন উন্নয়ন কেন্দ্র চালুর লক্ষ্য রয়েছে।
এই কেন্দ্রের মাধ্যমে শিল্পের প্রয়োজন অনুযায়ী দক্ষ কর্মী তৈরি, আধুনিক ডিজাইন ও উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হবে।
বৈশ্বিক বাজারে ফিরতে সমন্বিত পরিকল্পনা
সরকারের পরিকল্পনা অনুযায়ী, দক্ষতা উন্নয়ন, আধুনিক ডিজাইন, পরিবেশবান্ধব উৎপাদন, নতুন বিনিয়োগের সুযোগ সৃষ্টি, ETP ও CETP ব্যবস্থার উন্নয়ন এবং বন্ডসংক্রান্ত জটিলতা দূর করার মাধ্যমে দেশের চামড়া শিল্পকে পুনর্গঠন করা হবে।
বাণিজ্যমন্ত্রী বলেন, এসব সংস্কার বাস্তবায়ন করা গেলে বাংলাদেশের চামড়া শিল্প আবারও আন্তর্জাতিক বাজারে শক্ত অবস্থান তৈরি করতে পারবে। কাঁচা চামড়া রপ্তানির পরিবর্তে উচ্চমূল্যের জুতা, ব্যাগ ও অন্যান্য চামড়াজাত পণ্য রপ্তানির মাধ্যমে রপ্তানি আয় বাড়ানোর পাশাপাশি দেশে একটি শক্তিশালী ‘বাংলাদেশ লেদার’ ব্র্যান্ড গড়ে তোলাই সরকারের মূল লক্ষ্য।
অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশে নিযুক্ত অস্ট্রেলীয় ডেপুটি হাইকমিশনার ক্লিনটন পবকে। আলোচনায় আরও অংশ নেন FLAXA-এর সভাপতি সৈয়দ নাসিম মঞ্জুর, SANEM-এর নির্বাহী পরিচালক ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক ড. সেলিম রায়হানসহ চামড়া খাতের ব্যবসায়ী, ট্যানারি ও পাদুকা উদ্যোক্তা, শ্রমিক প্রতিনিধি এবং উন্নয়ন সহযোগীরা।
Reporter Name 






















