Dhaka ০৮:৪৯ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ২৫ অগাস্ট ২০২৬, ১০ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
শিরনাম:
ঝিনাইদহে অজ্ঞান পার্টির দুই সদস্য গ্রেফতার আদমদীঘিতে নববিবাহিত যুবকের ঝুলন্ত মরদেহ উদ্ধার!! পাহাড়ধসের ঝুঁকি মোকাবিলায় বাঁশখালীতে ৪২০ পরিবার পেল নগদ সহায়তা বগুড়ায় জাল টিপসই দিয়ে খাদ্যবান্ধবের চাল আত্মসাতের চেষ্টা, ডিলার আটক! নরসিংদীর শিবপুরে বীর মুক্তিযোদ্ধাকে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় দাফন সম্পন্ন কুমারখালীতে গড়াই নদীতে মাছ ধরতে গিয়ে এক জেলের মৃত্যু কালিয়াকৈর হাইটেক সিটির লাখ টাকা মূল্যের তামার তার ও পাইপ চুরির ঘটনায় ৬ জন আটক কালীগঞ্জে বাকপ্রতিবন্ধী যুবতীকে ধর্ষণচেষ্টা মামলায় ৭০ বছরের আসামি ভাটারা থেকে গ্রেপ্তার বদলগাছীতে উপজেলা বিএনপির প্রচার সম্পাদককে ছুরিকাঘাতে জখমের অভিযোগ, বহিষ্কৃত কৃষকদল নেতার বিরুদ্ধে নড়াইলে ৩টি প্লাস্টিক বোতলে ১ গাছের চারা, পরিবেশ রক্ষায় চলো পাল্টাই বাংলাদেশের ব্যতিক্রমী উদ্যোগ
বিজ্ঞাপন :
জেলা-উপজেলা ও বিভাগীয় চীফ নিয়োগ দেয়া হচ্ছে। সাংবাদিকতায় আগ্রহীরা দ্রুত যোগাযোগ করুন। পরীক্ষামূলক সম্প্রচার ও নিবন্ধন প্রক্রিয়াধীন । সম্পদক-ইমদাদুল হক তৈয়ব-01711576603, সিভি পাঠান এই ইমেইলে- editor.manobjibon@gmail.com

জালালাবাদে পাহাড় কেটে গরুর খামার ও স্থাপনা, নীরব প্রশাসন নিয়ে প্রশ্ন

  • Reporter Name
  • সময়: ০৫:১০:৩৪ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ২৪ অগাস্ট ২০২৬
  • ২৪ Time View

 

চট্টগ্রাম নগরের খুলশী থানাধীন পূর্ব পাহাড়তলীর জালালাবাদ কো-অপারেটিভ হাউজিং সোসাইটির রোড নম্বর-৩, লেইন নম্বর-৯ এলাকায় পাহাড় কাটার অভিযোগ ঘিরে চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে। সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, অত্র গলির শেষ প্রান্তে বাহারের গরুর খামারের পেছনে প্রবেশ করতেই চোখে পড়ে পাহাড় কাটার বিস্তৃত চিত্র। স্থানীয়দের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে ধাপে ধাপে পাহাড় কেটে একটি বিশাল এলাকা সমতল করা হয়েছে। কোথাও পাহাড়ের উচ্চতা ১০ থেকে ১৫ ফুটেরও বেশি, আবার কোথাও পাহাড়ের অস্তিত্বই যেন মুছে ফেলা হয়েছে। স্থানীয়দের দাবি, কাটা পাহাড়ের বিস্তৃতি প্রায় ৫০০ ফুটেরও বেশি দীর্ঘ এলাকাজুড়ে ছড়িয়ে রয়েছে।অভিযোগ রয়েছে, বাহার, আলমগীর, জাহাঙ্গীর ও নাসরিন নামের ব্যক্তিদের প্রভাব ও ক্ষমতার কারণে এসব পাহাড় কর্তনের ঘটনা দীর্ঘদিন ধরে চলে আসছে।

এদিকে সরেজমিনে সরাসরি ভিডিও ধারণ করতে গেলে প্রতিবেদকের সঙ্গে কয়েকজনের অসদাচরণের অভিযোগ উঠেছে। তাদের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়, বৃষ্টির কারণে পাহাড় ভেঙে পড়ে যাওয়ায় তারা পাহাড়ের মাটি কেটে সমান করে দিয়েছেন। কিন্তু প্রতিবেদকের ধারণ করা চিত্রে বিশাল উঁচু পাহাড় কেটে সমতল করার চিত্র দেখা গেছে। কোথাও পাহাড় কেটে গরুর বিশাল খামার নির্মাণ করা হয়েছে, আবার কোথাও কাটা পাহাড়ের স্থানে নতুন ঘর ও রান্নাঘর নির্মাণের চিত্রও দেখা গেছে।ফলে প্রশ্ন উঠছে, প্রাকৃতিকভাবে পাহাড় ভেঙে পড়লে সেখানে এত বিস্তৃত এলাকাজুড়ে পাহাড় কেটে সমতল করার প্রয়োজন কেন হলো? পাহাড় কাটার পর সেই স্থানে একের পর এক স্থাপনা নির্মাণের অনুমতি বা বৈধতার বিষয়টিই বা কী? এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কার্যকর তদন্ত প্রয়োজন বলে মনে করছেন স্থানীয়রা।পাহাড় প্রকৃতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ। পাহাড় বৃষ্টির পানি ধারণ করে, পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা করে এবং নগরীর প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ও জীববৈচিত্র্য ধরে রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। নির্বিচারে পাহাড় কেটে ফেলা হলে বর্ষা মৌসুমে পাহাড়ধস, জলাবদ্ধতা, মাটি ক্ষয়সহ নানা ধরনের দুর্যোগের ঝুঁকি বেড়ে যায়।

আরও পড়ুনঃ  আল মোস্তফা সুন্নিয়া মডেল মাদ্রাসায় সবক প্রদান ও জশনে জুলুছে ঈদ-এ মিলাদুন্নবী (সঃ) অনুষ্ঠিত

অতীতে চট্টগ্রামে পাহাড়ধসে প্রাণহানির ঘটনাও ঘটেছে। তারপরও যদি রাতের আঁধারে কিংবা সুযোগ বুঝে পাহাড় কাটা অব্যাহত থাকে, তাহলে এর দায়ভার কে নেবে?স্থানীয়দের অভিযোগ, রাত যত গভীর হয়, ততই কোনো কোনো স্থানে পাহাড় কাটার তৎপরতা বেড়ে যায়। দিনের আলোতে যে কাজ করা কঠিন, রাতের আঁধারে সেই কাজই নির্বিঘ্নে চালানোর অভিযোগ রয়েছে।

এ বিষয়ে পরিবেশ অধিদপ্তরের কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তারা জানান, পাহাড় কাটার সংবাদ পেলে তারা অভিযান পরিচালনা করেন এবং আইন অনুযায়ী জরিমানা ও মামলা করা হয়। কর্মকর্তাদের এমন বক্তব্যের পরও প্রশ্ন উঠছে, যদি নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করা হয়, পাহাড় কাটার বিরুদ্ধে মামলা ও জরিমানা করা হয়, তাহলে একই এলাকায় পাহাড় কাটা বারবার কীভাবে চলতে থাকে? অভিযান শেষ হওয়ার পর আবার যদি পাহাড় কাটা শুরু হয়, তাহলে নজরদারির ঘাটতি কোথায়, সেটিও খতিয়ে দেখা দরকার।

এলাকাবাসীর একের পর এক অভিযোগের পরও যদি পাহাড় ধ্বংস বন্ধ না হয়, তাহলে সাধারণ মানুষের মধ্যে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন সৃষ্টি হয়, পাহাড়খেকোদের ক্ষমতা কি প্রশাসনের নজরদারির চেয়েও বেশি? নাকি কোনো অদৃশ্য প্রভাবের কারণে পাহাড় ধ্বংসের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া যাচ্ছে না? এসব প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার দায় সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের।খুলশী থানা পুলিশের পক্ষ থেকেও মাঝেমধ্যে অভিযান পরিচালনার কথা জানা গেলেও স্থানীয়দের অভিযোগ, তারপরও জালালাবাদের পাহাড় কাটা থামছে না। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও পরিবেশ অধিদপ্তরের তৎপরতার পরও যদি একই এলাকায় পাহাড়ের পর পাহাড় নিশ্চিহ্ন হতে থাকে, তাহলে সমন্বিতভাবে বিষয়টি তদন্ত করে দায়ীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি।স্থানীয়দের অভিযোগ, একসময় জালালাবাদ এলাকাটি ছিল পাহাড়ে ঘেরা সবুজ প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের অন্যতম স্থান। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে প্রভাবশালী ব্যক্তি ও ভূমিদস্যুদের দৌরাত্ম্যে সেই পাহাড়গুলো একের পর এক কেটে ফেলা হয়েছে। পাহাড়ের জায়গায় গড়ে উঠেছে বসতঘর, খামারসহ বিভিন্ন স্থাপনা। ফলে হারিয়ে যাচ্ছে চট্টগ্রামের ঐতিহ্যবাহী পাহাড়ি সৌন্দর্য।

আরও পড়ুনঃ  রোকেয়া মনসুর মহিলা কলেজের অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক মমতাজুর রহমানের ইন্তেকাল

একজন স্থানীয় বিএনপি নেতার অভিযোগ, যে রাজনৈতিক দলই ক্ষমতায় থাকুক না কেন, ক্ষমতাসীন দলের সঙ্গে সম্পৃক্ত কিছু প্রভাবশালী ব্যক্তি বিভিন্ন সময়ে পাহাড় কাটার সঙ্গে জড়িত থাকার সুযোগ পেয়েছেন বলে এলাকায় আলোচনা রয়েছে। তাই নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত সত্য বের করে আনার দাবি জানিয়েছেন তিনি।তার ভাষ্য, যেভাবে প্রতিনিয়ত পাহাড় কাটা চলছে, তাতে অদূর ভবিষ্যতে জালালাবাদে পাহাড়ের অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়াই কঠিন হয়ে পড়বে। চট্টগ্রামের পাহাড় ও প্রাকৃতিক সৌন্দর্য চট্টগ্রামবাসীর অহংকার। এই সম্পদ রক্ষায় এখনই সামাজিকভাবে প্রতিরোধ গড়ে তোলা না গেলে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য পাহাড়ের অস্তিত্ব ধরে রাখা কঠিন হবে।এদিকে পাহাড় কাটার ঘটনাকে কেন্দ্র করে কথিত ভুয়া সাংবাদিকদের দৌরাত্ম্যের অভিযোগও সামনে এসেছে। এলাকাবাসীর অভিযোগ, নগরীর বিভিন্ন স্থানে পাহাড় কাটা বা অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের খবর পেয়ে নিজেদের সাংবাদিক পরিচয় দিয়ে কিছু ব্যক্তি ঘটনাস্থলে যান এবং সংবাদ প্রকাশের ভয় দেখিয়ে সুবিধা নেওয়ার চেষ্টা করেন।

তবে কারা প্রকৃত সাংবাদিক আর কারা সাংবাদিকতার পরিচয় ব্যবহার করে অপতৎপরতায় জড়িত, তা যথাযথ তদন্তের বিষয়।অভিযোগ রয়েছে, জালালাবাদ এলাকায় পাহাড় কাটার ঘটনায় এমন কয়েকজন কথিত সাংবাদিকও সক্রিয় রয়েছেন। তাদের কেউ কেউ পাহাড় কাটার সংবাদ প্রকাশের পরিবর্তে সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে যোগাযোগ করে বিষয়টি ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা করেন বলে অভিযোগ উঠেছে। এমনকি একজন কথিত সাংবাদিক প্রতিবেদককে ফোন করে সংবাদ প্রকাশ না করার অনুরোধ করেছেন এবং দেখা করে বিষয়টি মীমাংসার প্রস্তাব দিয়েছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে।সাংবাদিকতা কোনো ব্যক্তিগত সুবিধা নেওয়ার মাধ্যম নয়। সাংবাদিকতার মূল কাজ হলো সত্য তুলে ধরা, অন্যায়ের বিরুদ্ধে জনমত সৃষ্টি করা এবং সমাজের মানুষের অধিকার ও স্বার্থ রক্ষা করা। কোনো ব্যক্তি সাংবাদিক পরিচয় ব্যবহার করে যদি অপরাধীদের সঙ্গে আঁতাত করেন কিংবা সংবাদ প্রকাশের ভয় দেখিয়ে সুবিধা নেওয়ার চেষ্টা করেন, তাহলে তার বিরুদ্ধে তদন্ত করে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি।

আরও পড়ুনঃ  বন্যার পর আজ থেকে চট্টগ্রামে ফের শুরু এইচএসসি ও আলিম পরীক্ষা

এ বিষয়ে একাধিক স্থানীয় ব্যক্তি প্রশ্ন তুলেছেন, চট্টগ্রামে কর্মরত প্রকৃত ও জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক সংগঠনগুলো কি এসব কথিত সাংবাদিকের কর্মকাণ্ড সম্পর্কে অবগত নয়? সাংবাদিকতার মর্যাদা রক্ষায় পেশাদার সাংবাদিকদেরই এগিয়ে আসতে হবে। কারণ হাতে গোনা কিছু ব্যক্তির অপকর্মের কারণে পুরো সাংবাদিক সমাজের ভাবমূর্তি ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।আরেকটি গুরুতর অভিযোগ হলো, বাহারের গরুর খামারটি পাহাড় কেটে তৈরি করা হয়েছে। স্থানীয়দের দাবি, বিশাল পরিমাণ পাহাড় কেটে সেই স্থান সমতল করে সেখানে গরুর খামার এবং অন্যান্য স্থাপনা নির্মাণ করা হয়েছে। খামার ও স্থাপনাগুলোর অনুমোদন রয়েছে কি না এবং পাহাড় কাটার অনুমতি তাকে কে কে দিয়েছেন?

এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন, জালালাবাদের পাহাড়গুলো রক্ষা করবে কে? পরিবেশ অধিদপ্তর বলছে তারা অভিযান চালাচ্ছে, পুলিশও মাঝেমধ্যে অভিযান চালাচ্ছে, স্থানীয়রা একের পর এক অভিযোগ করছেন, তারপরও যদি পাহাড় কাটা বন্ধ না হয়, তাহলে কোথায় রয়েছে সেই দুর্বলতা? অভিযানের পর আবার পাহাড় কাটা শুরু হলে শুধু জরিমানা করলেই দায় শেষ হয় না; পাহাড় কাটা বন্ধ হয়েছে কি না, সেটিও নিয়মিত তদারকির আওতায় আনতে হবে।

পাহাড় ধ্বংস করে আজ হয়তো কেউ জমি বা স্থাপনা তৈরি করতে পারবে, কিন্তু এর খেসারত দিতে হবে পুরো নগরবাসীকে। একদিন পাহাড় থাকবে না, থাকবে না সবুজের সেই সৌন্দর্য, আর বর্ষার দিনে সামান্য অতিবৃষ্টিই হয়ে উঠতে পারে বড় বিপদের কারণ।তাই জালালাবাদের অভিযোগগুলোকে গুরুত্ব দিয়ে জেলা প্রশাসন, পরিবেশ অধিদপ্তর, সিটি করপোরেশন ও সংশ্লিষ্ট আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সমন্বিত তদন্ত জরুরি। পাহাড় কাটা হয়েছে কি না, কারা কেটেছে, কোন উদ্দেশ্যে কেটেছে, কাটা মাটি কোথায় গেছে, সেখানে কী কী স্থাপনা নির্মাণ করা হয়েছে এবং এসব স্থাপনার বৈধতা কী-প্রতিটি বিষয় তদন্তের আওতায় আনা হোক।প্রশ্ন একটাই, ক্ষমতাবান হলেই কি পাহাড় কাটার অধিকার পাওয়া যায়?

Tag :
জনপ্রিয় নিউজ

ঝিনাইদহে অজ্ঞান পার্টির দুই সদস্য গ্রেফতার

জালালাবাদে পাহাড় কেটে গরুর খামার ও স্থাপনা, নীরব প্রশাসন নিয়ে প্রশ্ন

সময়: ০৫:১০:৩৪ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ২৪ অগাস্ট ২০২৬

 

চট্টগ্রাম নগরের খুলশী থানাধীন পূর্ব পাহাড়তলীর জালালাবাদ কো-অপারেটিভ হাউজিং সোসাইটির রোড নম্বর-৩, লেইন নম্বর-৯ এলাকায় পাহাড় কাটার অভিযোগ ঘিরে চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে। সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, অত্র গলির শেষ প্রান্তে বাহারের গরুর খামারের পেছনে প্রবেশ করতেই চোখে পড়ে পাহাড় কাটার বিস্তৃত চিত্র। স্থানীয়দের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে ধাপে ধাপে পাহাড় কেটে একটি বিশাল এলাকা সমতল করা হয়েছে। কোথাও পাহাড়ের উচ্চতা ১০ থেকে ১৫ ফুটেরও বেশি, আবার কোথাও পাহাড়ের অস্তিত্বই যেন মুছে ফেলা হয়েছে। স্থানীয়দের দাবি, কাটা পাহাড়ের বিস্তৃতি প্রায় ৫০০ ফুটেরও বেশি দীর্ঘ এলাকাজুড়ে ছড়িয়ে রয়েছে।অভিযোগ রয়েছে, বাহার, আলমগীর, জাহাঙ্গীর ও নাসরিন নামের ব্যক্তিদের প্রভাব ও ক্ষমতার কারণে এসব পাহাড় কর্তনের ঘটনা দীর্ঘদিন ধরে চলে আসছে।

এদিকে সরেজমিনে সরাসরি ভিডিও ধারণ করতে গেলে প্রতিবেদকের সঙ্গে কয়েকজনের অসদাচরণের অভিযোগ উঠেছে। তাদের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়, বৃষ্টির কারণে পাহাড় ভেঙে পড়ে যাওয়ায় তারা পাহাড়ের মাটি কেটে সমান করে দিয়েছেন। কিন্তু প্রতিবেদকের ধারণ করা চিত্রে বিশাল উঁচু পাহাড় কেটে সমতল করার চিত্র দেখা গেছে। কোথাও পাহাড় কেটে গরুর বিশাল খামার নির্মাণ করা হয়েছে, আবার কোথাও কাটা পাহাড়ের স্থানে নতুন ঘর ও রান্নাঘর নির্মাণের চিত্রও দেখা গেছে।ফলে প্রশ্ন উঠছে, প্রাকৃতিকভাবে পাহাড় ভেঙে পড়লে সেখানে এত বিস্তৃত এলাকাজুড়ে পাহাড় কেটে সমতল করার প্রয়োজন কেন হলো? পাহাড় কাটার পর সেই স্থানে একের পর এক স্থাপনা নির্মাণের অনুমতি বা বৈধতার বিষয়টিই বা কী? এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কার্যকর তদন্ত প্রয়োজন বলে মনে করছেন স্থানীয়রা।পাহাড় প্রকৃতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ। পাহাড় বৃষ্টির পানি ধারণ করে, পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা করে এবং নগরীর প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ও জীববৈচিত্র্য ধরে রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। নির্বিচারে পাহাড় কেটে ফেলা হলে বর্ষা মৌসুমে পাহাড়ধস, জলাবদ্ধতা, মাটি ক্ষয়সহ নানা ধরনের দুর্যোগের ঝুঁকি বেড়ে যায়।

আরও পড়ুনঃ  বন্যার পর আজ থেকে চট্টগ্রামে ফের শুরু এইচএসসি ও আলিম পরীক্ষা

অতীতে চট্টগ্রামে পাহাড়ধসে প্রাণহানির ঘটনাও ঘটেছে। তারপরও যদি রাতের আঁধারে কিংবা সুযোগ বুঝে পাহাড় কাটা অব্যাহত থাকে, তাহলে এর দায়ভার কে নেবে?স্থানীয়দের অভিযোগ, রাত যত গভীর হয়, ততই কোনো কোনো স্থানে পাহাড় কাটার তৎপরতা বেড়ে যায়। দিনের আলোতে যে কাজ করা কঠিন, রাতের আঁধারে সেই কাজই নির্বিঘ্নে চালানোর অভিযোগ রয়েছে।

এ বিষয়ে পরিবেশ অধিদপ্তরের কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তারা জানান, পাহাড় কাটার সংবাদ পেলে তারা অভিযান পরিচালনা করেন এবং আইন অনুযায়ী জরিমানা ও মামলা করা হয়। কর্মকর্তাদের এমন বক্তব্যের পরও প্রশ্ন উঠছে, যদি নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করা হয়, পাহাড় কাটার বিরুদ্ধে মামলা ও জরিমানা করা হয়, তাহলে একই এলাকায় পাহাড় কাটা বারবার কীভাবে চলতে থাকে? অভিযান শেষ হওয়ার পর আবার যদি পাহাড় কাটা শুরু হয়, তাহলে নজরদারির ঘাটতি কোথায়, সেটিও খতিয়ে দেখা দরকার।

এলাকাবাসীর একের পর এক অভিযোগের পরও যদি পাহাড় ধ্বংস বন্ধ না হয়, তাহলে সাধারণ মানুষের মধ্যে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন সৃষ্টি হয়, পাহাড়খেকোদের ক্ষমতা কি প্রশাসনের নজরদারির চেয়েও বেশি? নাকি কোনো অদৃশ্য প্রভাবের কারণে পাহাড় ধ্বংসের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া যাচ্ছে না? এসব প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার দায় সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের।খুলশী থানা পুলিশের পক্ষ থেকেও মাঝেমধ্যে অভিযান পরিচালনার কথা জানা গেলেও স্থানীয়দের অভিযোগ, তারপরও জালালাবাদের পাহাড় কাটা থামছে না। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও পরিবেশ অধিদপ্তরের তৎপরতার পরও যদি একই এলাকায় পাহাড়ের পর পাহাড় নিশ্চিহ্ন হতে থাকে, তাহলে সমন্বিতভাবে বিষয়টি তদন্ত করে দায়ীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি।স্থানীয়দের অভিযোগ, একসময় জালালাবাদ এলাকাটি ছিল পাহাড়ে ঘেরা সবুজ প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের অন্যতম স্থান। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে প্রভাবশালী ব্যক্তি ও ভূমিদস্যুদের দৌরাত্ম্যে সেই পাহাড়গুলো একের পর এক কেটে ফেলা হয়েছে। পাহাড়ের জায়গায় গড়ে উঠেছে বসতঘর, খামারসহ বিভিন্ন স্থাপনা। ফলে হারিয়ে যাচ্ছে চট্টগ্রামের ঐতিহ্যবাহী পাহাড়ি সৌন্দর্য।

আরও পড়ুনঃ  টাঙ্গুয়ার হাওরে হাউসবোট থেকে পড়ে ১০ বছরের শিশু নিখোঁজ, উদ্ধার অভিযান চলছে

একজন স্থানীয় বিএনপি নেতার অভিযোগ, যে রাজনৈতিক দলই ক্ষমতায় থাকুক না কেন, ক্ষমতাসীন দলের সঙ্গে সম্পৃক্ত কিছু প্রভাবশালী ব্যক্তি বিভিন্ন সময়ে পাহাড় কাটার সঙ্গে জড়িত থাকার সুযোগ পেয়েছেন বলে এলাকায় আলোচনা রয়েছে। তাই নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত সত্য বের করে আনার দাবি জানিয়েছেন তিনি।তার ভাষ্য, যেভাবে প্রতিনিয়ত পাহাড় কাটা চলছে, তাতে অদূর ভবিষ্যতে জালালাবাদে পাহাড়ের অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়াই কঠিন হয়ে পড়বে। চট্টগ্রামের পাহাড় ও প্রাকৃতিক সৌন্দর্য চট্টগ্রামবাসীর অহংকার। এই সম্পদ রক্ষায় এখনই সামাজিকভাবে প্রতিরোধ গড়ে তোলা না গেলে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য পাহাড়ের অস্তিত্ব ধরে রাখা কঠিন হবে।এদিকে পাহাড় কাটার ঘটনাকে কেন্দ্র করে কথিত ভুয়া সাংবাদিকদের দৌরাত্ম্যের অভিযোগও সামনে এসেছে। এলাকাবাসীর অভিযোগ, নগরীর বিভিন্ন স্থানে পাহাড় কাটা বা অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের খবর পেয়ে নিজেদের সাংবাদিক পরিচয় দিয়ে কিছু ব্যক্তি ঘটনাস্থলে যান এবং সংবাদ প্রকাশের ভয় দেখিয়ে সুবিধা নেওয়ার চেষ্টা করেন।

তবে কারা প্রকৃত সাংবাদিক আর কারা সাংবাদিকতার পরিচয় ব্যবহার করে অপতৎপরতায় জড়িত, তা যথাযথ তদন্তের বিষয়।অভিযোগ রয়েছে, জালালাবাদ এলাকায় পাহাড় কাটার ঘটনায় এমন কয়েকজন কথিত সাংবাদিকও সক্রিয় রয়েছেন। তাদের কেউ কেউ পাহাড় কাটার সংবাদ প্রকাশের পরিবর্তে সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে যোগাযোগ করে বিষয়টি ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা করেন বলে অভিযোগ উঠেছে। এমনকি একজন কথিত সাংবাদিক প্রতিবেদককে ফোন করে সংবাদ প্রকাশ না করার অনুরোধ করেছেন এবং দেখা করে বিষয়টি মীমাংসার প্রস্তাব দিয়েছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে।সাংবাদিকতা কোনো ব্যক্তিগত সুবিধা নেওয়ার মাধ্যম নয়। সাংবাদিকতার মূল কাজ হলো সত্য তুলে ধরা, অন্যায়ের বিরুদ্ধে জনমত সৃষ্টি করা এবং সমাজের মানুষের অধিকার ও স্বার্থ রক্ষা করা। কোনো ব্যক্তি সাংবাদিক পরিচয় ব্যবহার করে যদি অপরাধীদের সঙ্গে আঁতাত করেন কিংবা সংবাদ প্রকাশের ভয় দেখিয়ে সুবিধা নেওয়ার চেষ্টা করেন, তাহলে তার বিরুদ্ধে তদন্ত করে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি।

আরও পড়ুনঃ  হ্নীলায় ৭০ হাজার ইয়াবা উদ্ধার: কথিত মূল হোতা নিয়ে প্রশ্ন, তদন্তে আসতে পারে আরও তথ্য

এ বিষয়ে একাধিক স্থানীয় ব্যক্তি প্রশ্ন তুলেছেন, চট্টগ্রামে কর্মরত প্রকৃত ও জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক সংগঠনগুলো কি এসব কথিত সাংবাদিকের কর্মকাণ্ড সম্পর্কে অবগত নয়? সাংবাদিকতার মর্যাদা রক্ষায় পেশাদার সাংবাদিকদেরই এগিয়ে আসতে হবে। কারণ হাতে গোনা কিছু ব্যক্তির অপকর্মের কারণে পুরো সাংবাদিক সমাজের ভাবমূর্তি ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।আরেকটি গুরুতর অভিযোগ হলো, বাহারের গরুর খামারটি পাহাড় কেটে তৈরি করা হয়েছে। স্থানীয়দের দাবি, বিশাল পরিমাণ পাহাড় কেটে সেই স্থান সমতল করে সেখানে গরুর খামার এবং অন্যান্য স্থাপনা নির্মাণ করা হয়েছে। খামার ও স্থাপনাগুলোর অনুমোদন রয়েছে কি না এবং পাহাড় কাটার অনুমতি তাকে কে কে দিয়েছেন?

এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন, জালালাবাদের পাহাড়গুলো রক্ষা করবে কে? পরিবেশ অধিদপ্তর বলছে তারা অভিযান চালাচ্ছে, পুলিশও মাঝেমধ্যে অভিযান চালাচ্ছে, স্থানীয়রা একের পর এক অভিযোগ করছেন, তারপরও যদি পাহাড় কাটা বন্ধ না হয়, তাহলে কোথায় রয়েছে সেই দুর্বলতা? অভিযানের পর আবার পাহাড় কাটা শুরু হলে শুধু জরিমানা করলেই দায় শেষ হয় না; পাহাড় কাটা বন্ধ হয়েছে কি না, সেটিও নিয়মিত তদারকির আওতায় আনতে হবে।

পাহাড় ধ্বংস করে আজ হয়তো কেউ জমি বা স্থাপনা তৈরি করতে পারবে, কিন্তু এর খেসারত দিতে হবে পুরো নগরবাসীকে। একদিন পাহাড় থাকবে না, থাকবে না সবুজের সেই সৌন্দর্য, আর বর্ষার দিনে সামান্য অতিবৃষ্টিই হয়ে উঠতে পারে বড় বিপদের কারণ।তাই জালালাবাদের অভিযোগগুলোকে গুরুত্ব দিয়ে জেলা প্রশাসন, পরিবেশ অধিদপ্তর, সিটি করপোরেশন ও সংশ্লিষ্ট আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সমন্বিত তদন্ত জরুরি। পাহাড় কাটা হয়েছে কি না, কারা কেটেছে, কোন উদ্দেশ্যে কেটেছে, কাটা মাটি কোথায় গেছে, সেখানে কী কী স্থাপনা নির্মাণ করা হয়েছে এবং এসব স্থাপনার বৈধতা কী-প্রতিটি বিষয় তদন্তের আওতায় আনা হোক।প্রশ্ন একটাই, ক্ষমতাবান হলেই কি পাহাড় কাটার অধিকার পাওয়া যায়?