
বিশেষ প্রতিনিধি:
প্রধানমন্ত্রী ঘোষিত মাদকের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতির মধ্যেও কুমিল্লার ব্রাহ্মণপাড়া থানার ১ নম্বর মাধবপুর ইউনিয়নের দইখোলা এলাকায় মাদকের অঘোষিত হাট গড়ে ওঠার অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, এ মাদক স্পটের নেতৃত্বে রয়েছেন গ্রাম পুলিশ তথা চৌকিদার শাহীন। সরেজমিন অনুসন্ধানে স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও সাধারণ মানুষের সঙ্গে কথা বলে এমন নানা অভিযোগের তথ্য পাওয়া গেছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে দলীয়ভাবে প্রভাবশালী ১ নম্বর মাধবপুর ইউনিয়নের তৎকালীন চেয়ারম্যান ফরিদ উদ্দিনের আশীর্বাদ ও মদদে চৌকিদার শাহীন এলাকায় একটি শক্তিশালী নেটওয়ার্ক গড়ে তোলেন। স্থানীয় ভুক্তভোগী ও শান্তিপ্রিয় বাসিন্দাদের বক্তব্যে শাহীনের বিরুদ্ধে মাদক ব্যবসা, প্রতারণা, চাঁদাবাজি, ভূমি-সংক্রান্ত অনিয়মসহ নানা অভিযোগ উঠে এসেছে।
এছাড়া বিধবা ভাতা আত্মসাৎ, বয়স্ক ভাতা লুটপাট এবং গুচ্ছগ্রামের নামে সরকারি ঘর দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়ে অসহায় মানুষের শেষ সম্বলটুকু হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগও রয়েছে এই গ্রাম পুলিশ (চৌকিদার শাহীন)-এর বিরুদ্ধে। অসহায় পরিবারের মেয়েকে বিয়ে দেওয়ার নামে অর্থ আত্মসাতের অভিযোগও করেছেন স্থানীয়রা।
স্থানীয়দের আরও অভিযোগ, অন্যের গরু চুরি করে বিক্রির সঙ্গেও শাহীনের সম্পৃক্ততার অভিযোগ রয়েছে। দইখোলা গ্রামের হতদরিদ্র অটোরিকশাচালকদের কাছ থেকেও নিয়মিত চাঁদা আদায়ের অভিযোগ উঠেছে তার বিরুদ্ধে।
স্থানীয়দের দাবি, এলাকায় শাহীনের নেটওয়ার্ক এতটাই শক্তিশালী যে তার বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠলেও কার্যকর কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। এসিল্যান্ড ও ভূমি অফিস থেকে জমির প্রয়োজনীয় নকল সংগ্রহ করে দেওয়ার কথা বলে দইখোলা গ্রামের বাসিন্দা মানিক মিয়ার কাছ থেকে ৫ লাখ টাকা নেওয়ার অভিযোগও রয়েছে শাহীনের বিরুদ্ধে। এ বিষয়ে মানিক মিয়া গত ২৮ জুলাই ২০২৬ তারিখে অভিযোগ দাখিল করেন।
অভিযোগের ভিত্তিতে ওই দিনই বিষয়টি নিয়ে শুনানি হয় বলে জানা গেছে। পরবর্তীতে ৩০ জুলাই ২০২৬ তারিখে এসিল্যান্ডের কার্যালয়ে সংশ্লিষ্টদের উপস্থিতিতে ভুক্তভোগীর কাছ থেকে নেওয়া ৫ লাখ টাকার মধ্যে ৩ লাখ টাকা ফেরত দেওয়ার সিদ্ধান্ত মেনে নেওয়া হয় বলে অভিযোগকারীর দাবি। তবে পরবর্তীতে অর্থ ফেরত দেওয়ার প্রতিশ্রুতি থাকলেও বিষয়টি থেকে সংশ্লিষ্টরা সরে আসেন বলে অভিযোগ উঠেছে।
স্থানীয় সাধারণ মানুষ ও জনপ্রতিনিধিদের কেউ কেউ মনে করছেন, কোনো অদৃশ্য প্রভাবের কারণে বিষয়টির পরবর্তী কার্যক্রম থেমে গেছে। তবে এ অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্টদের বক্তব্য পাওয়া গেলে তা পরবর্তী প্রতিবেদনে তুলে ধরা হবে।
ভারতীয় সীমান্তের নিকটবর্তী হওয়ায় মাদকসহ বিভিন্ন অবৈধ কর্মকাণ্ডে চৌকিদার শাহীন গ্রাম পুলিশের পরিচয় ব্যবহার করে জড়িয়ে পড়েছেন বলেও অভিযোগ স্থানীয়দের। তাদের দাবি, পুলিশের কতিপয় অসাধু সদস্যের সঙ্গে যোগসাজশে গ্রামাঞ্চলে মাদক বিক্রির একটি অঘোষিত হাট গড়ে উঠেছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, ইউনিয়ন পরিষদে দীর্ঘদিন—এমনকি এক থেকে দেড় বছর পর্যন্ত—উপস্থিত না থেকেও চৌকিদার শাহীন গ্রাম পুলিশের চাকরিতে বহাল রয়েছেন। এ সময় তিনি পূর্ণাঙ্গ সরকারি বেতন-ভাতাসহ অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা ভোগ করেছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে। হাজিরা খাতায় অনুপস্থিত থাকার পরও প্রভাব খাটিয়ে হাজিরা দেখানোর অভিযোগও করেছেন স্থানীয়রা।
স্থানীয়দের আরও অভিযোগ, ৫ আগস্ট ২০২৪-এর গণঅভ্যুত্থানের পরও চৌকিদার শাহীনের বিরুদ্ধে ওঠা মাদক ব্যবসা, প্রতারণা, চাঁদাবাজি ও সরকারি অর্থ আত্মসাতের অভিযোগের বিষয়ে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। বরং সাবেক চেয়ারম্যান ফরিদ উদ্দিনের প্রভাব ও তদবিরের কারণে শাহীন এখনো এলাকায় প্রভাব বিস্তার করে চলেছেন বলে অভিযোগ স্থানীয়দের।
এ কারণে স্থানীয়দের মধ্যে আতঙ্ক বিরাজ করছে। তাদের দাবি, প্রভাবশালী মহলের আশ্রয়-প্রশ্রয়ের কারণে অভিযুক্ত শাহীন বারবার আইনের আওতার বাইরে থেকে যাচ্ছেন।
চৌকিদার শাহীনের মাধ্যমে সংঘটিত একাধিক অপরাধের অভিযোগের বিষয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে ইউএনও মুন্নী ইসলাম সরকারি বিধি অনুযায়ী যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়ার কথা জানিয়েছেন। তিনি বলেন, প্রমাণিত সত্যের মুখোমুখি সবাইকে হতে হবে। মাদকের বিষয়ে তিনি জিরো টলারেন্স নীতির কথা উল্লেখ করেন। অপরাধী যতই প্রভাবশালী হোক না কেন, প্রমাণ পাওয়া গেলে তাকে আইনের আওতায় আনা হবে বলেও জানান তিনি।
এদিকে চৌকিদার শাহীনের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের সুষ্ঠু তদন্ত দাবি করেছেন ভুক্তভোগী পরিবার, স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও দইখোলা গ্রামের শান্তিপ্রিয় বাসিন্দারা। তারা পুলিশ প্রশাসন, মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরসহ সংশ্লিষ্ট সরকারি দপ্তরের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের জরুরি হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন।
স্থানীয়দের দাবি, অভিযোগগুলো নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করে সত্যতা যাচাই করা হোক। অভিযোগ প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি সীমান্তবর্তী এলাকায় মাদকের বিস্তার রোধে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন। এতে বর্তমান প্রজন্মকে মাদকের ভয়াল থাবা থেকে রক্ষা করা এবং মাদকের বিরুদ্ধে সরকারের জিরো টলারেন্স নীতি বাস্তবায়ন আরও শক্তিশালী হবে বলে মনে করছেন তারা।
Reporter Name 






















