
অ্যাডভোকেট মোঃ কামরুজ্জামান ভূঁইয়া,
১৮ই ডিসেম্বর ১৯৭১—বাংলাদেশের ইতিহাসে এক অবিস্মরণীয় দিন। ১৬ই ডিসেম্বরের মহান বিজয়ের পর এই দিনটি ছিল একটি নবজাত রাষ্ট্রের প্রথম বাস্তব সকাল। যুদ্ধ শেষ হয়েছে, কিন্তু সংগ্রাম শেষ হয়নি। ধ্বংসস্তূপের মধ্য দিয়ে সদ্য স্বাধীন বাংলাদেশ তখন ভবিষ্যতের পথে প্রথম পা বাড়াচ্ছে। ১৮ই ডিসেম্বর ছিল বিজয়ের উল্লাসের পর দায়িত্বের মুখোমুখি হওয়ার দিন—যেদিন স্বাধীনতার অর্থ বাস্তব জীবনে অনুবাদ করার কঠিন কাজ শুরু হয়।
যুদ্ধবিধ্বস্ত বাংলাদেশের বাস্তবতা ছিল নির্মম। যোগাযোগ ব্যবস্থা ভেঙে পড়েছিল, শিল্পকারখানা ধ্বংসপ্রাপ্ত, খাদ্যসংকট চরমে, ব্যাংকিং ব্যবস্থা অকার্যকর এবং প্রশাসনিক কাঠামো প্রায় শূন্য। এক কোটির বেশি শরণার্থী তখনও দেশে ফিরছিলেন। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ছিল ভঙ্গুর। ১৮ই ডিসেম্বর থেকেই অস্থায়ী সরকার ও মুক্তিযোদ্ধাদের সামনে প্রধান চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ায়—রাষ্ট্র পরিচালনার কাঠামো দাঁড় করানো এবং সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা।
এই দিন থেকেই স্পষ্ট হয় যে স্বাধীনতা শুধু রাজনৈতিক মুক্তি নয়, বরং অর্থনৈতিক, সামাজিক ও মানবিক মুক্তির প্রতিশ্রুতি। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান তখনও পাকিস্তানের কারাগারে বন্দি, কিন্তু তাঁর অনুপস্থিতিতেও স্বাধীন বাংলাদেশের রূপরেখা প্রণয়নে অস্থায়ী সরকার কাজ শুরু করে। আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি অর্জন, যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের প্রশ্ন এবং সংবিধান প্রণয়নের প্রস্তুতি—সবকিছুর সূচনা ঘটে বিজয়ের পরপরই।
১৮ই ডিসেম্বরের বাংলাদেশ ও আজকের বাংলাদেশের মধ্যে পার্থক্য বিস্ময়কর। একসময়ের ভিক্ষাপ্রার্থী রাষ্ট্র আজ উন্নয়নশীল অর্থনীতির অংশীদার। খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা, অবকাঠামোগত উন্নয়ন, বিদ্যুৎ উৎপাদন বৃদ্ধি, ডিজিটাল সেবা—এসব অর্জন অস্বীকার করার উপায় নেই। আজ বাংলাদেশ বৈশ্বিক শান্তিরক্ষা মিশনে অংশ নিচ্ছে, আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে সক্রিয় ভূমিকা রাখছে।
কিন্তু এই অর্জনের পাশাপাশি প্রশ্ন উঠছে—১৮ই ডিসেম্বরের সেই স্বপ্ন কতটা বাস্তবায়িত হয়েছে? সেদিনের আকাঙ্ক্ষা ছিল একটি বৈষম্যহীন, ন্যায়ভিত্তিক রাষ্ট্র। আজ বাস্তবতা বলছে—আয়বৈষম্য বেড়েছে, দ্রব্যমূল্যের চাপে মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্ত বিপর্যস্ত, তরুণদের কর্মসংস্থানের সংকট গভীর হচ্ছে। রাষ্ট্রের উন্নয়নের পরিসংখ্যান থাকলেও সাধারণ মানুষের জীবনে স্বস্তি ক্রমেই দুর্লভ।
গণতন্ত্র ও মানবাধিকারের প্রশ্নেও ১৮ই ডিসেম্বর আমাদের সামনে আয়না ধরে। মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ছিল মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ও ন্যায়বিচার। কিন্তু আজও বিচারহীনতা, রাজনৈতিক সহনশীলতার অভাব এবং প্রশাসনিক জবাবদিহিতার সংকট আলোচনার কেন্দ্রে। স্বাধীনতার পরদিনের বাংলাদেশ যে রাষ্ট্রকাঠামোর স্বপ্ন দেখেছিল, তার পূর্ণ বাস্তবায়ন এখনো অসম্পূর্ণ।
১৮ই ডিসেম্বর আমাদের শেখায়—বিজয় মানেই সব অর্জন নয়, বরং বিজয় হলো দায়িত্ব গ্রহণের সূচনা। রাষ্ট্র যদি নাগরিকের মর্যাদা রক্ষা করতে না পারে, তবে স্বাধীনতা অর্থহীন হয়ে পড়ে। আজকের বাংলাদেশে উন্নয়ন ও মানবিকতার মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করাই সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।
এই দিনে আমাদের প্রশ্ন করা জরুরি—আমরা কি সেই বাংলাদেশ গড়তে পেরেছি, যার জন্য শহীদরা জীবন দিয়েছিলেন? যদি না পেরে থাকি, তবে ১৮ই ডিসেম্বর আমাদের কাছে শুধুই স্মৃতি নয়, বরং একটি চলমান অঙ্গীকার।
স্বাধীনতার পরদিনের বাংলাদেশ আমাদের শিখিয়েছিল—রাষ্ট্র মানে মানুষ। আজও সেই সত্য অমলিন। ১৮ই ডিসেম্বর তাই অতীত নয়, বর্তমান ও ভবিষ্যতের পথনির্দেশক।
— অ্যাডভোকেট মোঃ কামরুজ্জামান ভূঁইয়া
লেখক ও গবেষক
দৈনিক মানবজীবন
Reporter Name 


























