এনামুল হক রাশেদী, চট্টগ্রাম প্রতিনিধি:
চট্টগ্রাম বন্দরের বহির্নোঙরে মাত্র ১৮ দিনের ব্যবধানে তিনটি জাহাজে সশস্ত্র জলদস্যু হামলার ঘটনায় দেশের প্রধান সমুদ্রবন্দরকে ঘিরে নতুন করে নিরাপত্তা উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। এসব হামলায় প্রায় ১০ কোটি টাকার যন্ত্রাংশ ও মূল্যবান সরঞ্জাম লুট হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। এ পরিস্থিতিতে আমদানিকারক, শিপিং অপারেটর ও বন্দর ব্যবহারকারীরা উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। নিরাপত্তা জোরদারের দাবি জানিয়ে নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ে চিঠিও দিয়েছে চট্টগ্রাম চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি।
সংশ্লিষ্টদের মতে, দেশের প্রায় ৯২ শতাংশ আমদানি-রপ্তানি কার্যক্রম চট্টগ্রাম বন্দরকে কেন্দ্র করে পরিচালিত হয়। ফলে বহির্নোঙরের নিরাপত্তা বিঘ্নিত হলে জাতীয় অর্থনীতি, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য এবং দেশের সামুদ্রিক ভাবমূর্তি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
সবশেষ গত ১৬ জুলাই ভোরে চার্লি অ্যাঙ্করেজে নোঙর করা সিয়েরা লিওনের পতাকাবাহী ট্যাংকার ‘তাই শুয়েন’-এ প্রায় ২০ জন সশস্ত্র জলদস্যু হামলা চালায়। পাঁচটি কাঠের নৌকায় করে এসে তারা জাহাজে উঠে নোঙরের দড়ি, ব্যাটারি ও অন্যান্য মূল্যবান সরঞ্জাম লুট করে নিয়ে যায়। হংকং থেকে সীতাকুণ্ডের জনতা স্টিল শিপ ব্রেকিং ইয়ার্ডে ভাঙার জন্য জাহাজটি আনা হয়েছিল।
শিপিং এজেন্ট বেন লাইনের মালিক মোশাররফ হোসেন জানান, নাবিকদের ব্যস্ত রেখে দস্যুরা পরিকল্পিতভাবে জাহাজের ডেক থেকে সরঞ্জাম খুলে নেয়। জাহাজের ক্যাপ্টেন তাৎক্ষণিকভাবে বন্দর নিয়ন্ত্রণ কক্ষে বার্তা পাঠালেও কোস্টগার্ড ঘটনাস্থলে পৌঁছানোর আগেই হামলাকারীরা পালিয়ে যায়।
এর আগে ২৯ জুন চার্লি অ্যাঙ্করেজে ডায়নামিক শিপ রিসাইক্লিংয়ের আমদানি করা ‘এমভি হাই জু’ জাহাজে ২০ থেকে ২৫ জন সশস্ত্র দস্যু উঠে নাবিকদের জিম্মি করে প্রায় এক কোটি টাকার যন্ত্রাংশ লুট করে। পরদিন যমুনা শিপ ব্রেকার্সের ‘এমটি আইআরওএস’ জাহাজ থেকেও কয়েক কোটি টাকার সরঞ্জাম চুরি হয়। পরে নৌপুলিশ রাজধানীর বাংলাবাজার এলাকা থেকে প্রায় দুই কোটি টাকার চোরাই মালামাল উদ্ধার করে।
ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, প্রতিটি ঘটনায় কোস্টগার্ড ও বন্দর কর্তৃপক্ষকে দ্রুত জানানো হলেও তাৎক্ষণিক সহায়তা পাওয়া যায়নি। চট্টগ্রাম চেম্বারের পাঠানো চিঠিতেও একই অভিযোগ তুলে ধরা হয়েছে। পাশাপাশি লুট হওয়া অধিকাংশ মালামাল এখনও উদ্ধার না হওয়ার বিষয়টিও উল্লেখ করা হয়েছে।
আন্তর্জাতিক সমুদ্র নিরাপত্তা সংস্থা রিক্যাপ (ReCAAP)-এর সর্বশেষ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে এপ্রিল পর্যন্ত চট্টগ্রাম বন্দরে জলদস্যুতা বা চুরির কোনো ঘটনা ঘটেনি। তবে অল্প সময়ের ব্যবধানে টানা তিনটি হামলার ঘটনায় নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
বর্তমানে নাব্য সংকটের কারণে চট্টগ্রাম বন্দরের প্রায় ৭০ শতাংশ পণ্য বহির্নোঙরে খালাস করা হয়। প্রতিদিন গড়ে ৪০ থেকে ৫০টি বড় জাহাজ সেখানে অবস্থান করে এবং প্রায় দেড় লাখ টন পণ্য লাইটার জাহাজে খালাস করা হয়।
চট্টগ্রাম চেম্বারের সভাপতি মোহাম্মদ আমিরুল হক বলেন, বহির্নোঙরের নিরাপত্তা দুর্বল হলে বিদেশি শিপিং কোম্পানির ঝুঁকি, বীমা ব্যয় এবং আমদানি-রপ্তানির খরচ বেড়ে যেতে পারে। তাই দ্রুত কার্যকর নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিশ্চিত করা জরুরি।
বাংলাদেশ বার্থ অপারেটর অ্যান্ড শিপ হ্যান্ডলিং অপারেটর অ্যাসোসিয়েশনের চেয়ারম্যান সরওয়ার হোসেন বলেন, বছরের প্রথম চার মাস কোনো দস্যুতার ঘটনা না ঘটলেও হঠাৎ এ ধরনের হামলা অত্যন্ত উদ্বেগজনক।
ওয়াটার ট্রান্সপোর্ট কো-অর্ডিনেশন সেলের মুখপাত্র পারভেজ আহমেদ বলেন, ছোট নৌকায় করে সংঘবদ্ধভাবে বড় জাহাজে উঠে দস্যুরা হামলা চালাচ্ছে। এ ধরনের অপরাধ দমনে কোস্টগার্ড ও বন্দর কর্তৃপক্ষের নজরদারি আরও জোরদার করা প্রয়োজন।
সাম্প্রতিক ঘটনাগুলোর পর চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ ও বাংলাদেশ কোস্টগার্ড যৌথভাবে পরিস্থিতি পর্যালোচনা করেছে। বহির্নোঙরে টহল বৃদ্ধি, অনুমোদিত ওয়াচম্যান নিয়োগ নিশ্চিত করা, জাহাজ আগমনের তথ্য বাধ্যতামূলকভাবে সরবরাহ এবং প্রযুক্তিনির্ভর নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদারের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের সচিব রেফায়েত হামীম বলেন, বহির্নোঙরের নিরাপত্তা আরও কঠোর করা হয়েছে। কোস্টগার্ড নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করছে এবং চুরির ঘটনায় জড়িত কয়েকজনকে ইতোমধ্যে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
Reporter Name 






















