স্টাফ রিপোর্টার,
মোঃ হামিদুজ্জামান জলিল
ঝিনাইদহের কোটচাঁদপুরে ভুল চিকিৎসা, চরম অবহেলা এবং অদক্ষতার মাধ্যমে এক প্রসূতি মায়ের জীবন বিপন্ন করা ও জরায়ু কেটে বাদ দেওয়ার অভিযোগে দুই চিকিৎসকের বিরুদ্ধে আদালতে সিআর (CR) মামলা দায়ের করা হয়েছে।
গত রোববার (২ আগস্ট) কোটচাঁদপুর আমলী আদালতের বিজ্ঞ অতিরিক্ত চীফ জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট মোঃ মেহেদী হাসান-এর আদালতে মামলাটি দায়ের করেন ভুক্তভোগীর স্বামী মোঃ তৌহিদুর রহমান। মামলার নম্বর ২৬৮/২০২৬। বিজ্ঞ বিচারক বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করে আলামত ও নথিপত্র সংগ্রহপূর্বক ঝিনাইদহ পিবিআই-এর পুলিশ সুপারকে (এসপি) তদন্তের নির্দেশ দিয়েছেন।
মামলার আসামিরা হলেন— কোটচাঁদপুর হাসপাতাল রোডে অবস্থিত ‘সামউদ্দীন মেমোরিয়াল (প্রা.) হাসপাতাল অ্যান্ড ডায়াগনস্টিক কমপ্লেক্স’-এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক ডাঃ মোঃ ছহি উদ্দিন এবং একই প্রতিষ্ঠানের তদারকি কর্মকর্তা ও চিকিৎসক দাবিদার ডাঃ মোঃ আসলাম হোসেন।
মামলার আরজি ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, উপজেলার এলাঙ্গী গ্রামের মোঃ তৌহিদুর রহমান-এর সন্তানসম্ভবা স্ত্রী ইয়াফা আফরিন-কে গত ৩ জুলাই ২০২৬ সিজারিয়ান অপারেশনের জন্য সামউদ্দীন মেমোরিয়াল হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। অভিযোগে বলা হয়েছে, আধুনিক যন্ত্রপাতি ও দক্ষ চিকিৎসক না থাকা সত্ত্বেও রোগীর পরিবারকে আশ্বস্ত করে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। পরবর্তীতে ডাঃ আসলাম হোসেন তড়িঘড়ি করে সিজারিয়ান অপারেশন সম্পন্ন করে অপারেশন থিয়েটার ত্যাগ করেন। অভিযোগ অনুযায়ী, পেট যথাযথভাবে পরিষ্কার না করেই সেলাই দেওয়া হয় এবং ৬ জুলাই রোগীকে ছাড়পত্র দেওয়া হয়।
বাড়ি ফেরার পর প্রসূতির তীব্র পেটব্যথা ও রক্তক্ষরণ শুরু হলে ১৮ জুলাই ভোররাতে তাকে পুনরায় একই ক্লিনিকে নেওয়া হয়। অভিযোগে বলা হয়েছে, সেখানে ডাঃ ছহি উদ্দিন প্রসূতির জরায়ুর ভেতরে অতিরিক্ত গজ ও ব্যান্ডেজ প্রবেশ করান, যার ফলে অবস্থার আরও অবনতি ঘটে। পরে রোগী অচেতন হয়ে পড়লে তাকে দ্রুত খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়।
১৯ জুলাই খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের জরুরি বিভাগে ভর্তি করার পর বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের সমন্বয়ে গঠিত মেডিকেল বোর্ড পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে জানায়, পূর্বের চিকিৎসার কারণে পেটে ময়লা থেকে গেছে, সিজারের সেলাই ফেটে গেছে এবং জরায়ুতে গজ-ব্যান্ডেজ প্রবেশ করানোর ফলে মারাত্মক সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়েছে। রোগীর জীবন রক্ষায় অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে তার জরায়ুর প্রধান অংশ কেটে বাদ দিতে হয়।
মামলায় দণ্ডবিধির ৪০৬ (বিশ্বাসভঙ্গ), ৪২০ (প্রতারণা), ২৭০ (জীবন বিপন্নকারী রোগের সংক্রমণ ছড়ানো) এবং ৩২৬ (গুরুতর অঙ্গহানি) ধারায় অভিযোগ আনা হয়েছে।
বাদীপক্ষের আইনজীবী অ্যাডভোকেট আশরাফুল আলম মালিতা বলেন,
“এটি অত্যন্ত স্পর্শকাতর ও জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট একটি ঘটনা। প্রসূতি মায়ের জীবন বিপন্ন করা ও অঙ্গহানির ঘটনায় দণ্ডবিধির কঠোর ধারায় মামলাটি করা হয়েছে। আদালত পিবিআইকে দ্রুত তদন্ত করে প্রতিবেদন দাখিলের নির্দেশ দিয়েছেন। আমরা আশা করছি, ভুক্তভোগী পরিবার ন্যায়বিচার পাবে।”
ভুক্তভোগী প্রসূতির স্বামী ও মামলার বাদী মোঃ তৌহিদুর রহমান বলেন,
“চিকিৎসার নামে আমার স্ত্রীর সঙ্গে যে বর্বরতা করা হয়েছে, তাতে সে চিরতরে স্বাভাবিক মাতৃত্বের ক্ষমতা হারিয়েছে। আমি এই ঘটনার সুষ্ঠু বিচার, দায়ীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি এবং সংশ্লিষ্ট ক্লিনিকের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানাচ্ছি।”
এ বিষয়ে ঝিনাইদহ পিবিআই জানিয়েছে, আদালতের নির্দেশনার কপি হাতে পাওয়ার পর নিরপেক্ষ তদন্ত শুরু করা হবে। ঘটনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট আলামত ও চিকিৎসা-সংক্রান্ত তথ্য-প্রমাণ সংগ্রহ করে নির্ধারিত সময়ে তদন্ত প্রতিবেদন আদালতে দাখিল করা হবে।
Reporter Name 





















