
——————————————————————
যুগচাহিদা ও সময়ের প্রয়োজনে দুটি মাদ্রাসা শিক্ষাধারার উদ্ভব হয়েছে ভারতীয় উপমহাদেশে। একটি আলিয়া, অপরটি কওমি। আলিয়া পদ্ধতি চালু হয়েছে ১৭৮০ সালে আর কওমি শিক্ষাপদ্ধতি প্রবর্তিত হয়েছে ১৮৬৬ সালে। প্রেক্ষাপট আলাদা হলেও লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য ছিল অভিন্ন। আলিয়া পদ্ধতি প্রবর্তনের লক্ষ্য ছিল ধর্মীয় শিক্ষার বিকাশ ও ইসলামী আইনে পারদর্শী বিচারক তৈরি করা যাতে তাঁরা মুসলিম পারিবারিক আইনে সংশ্লিষ্ট মামলাগুলো নিষ্পত্তি করতে পারেন।
আলিয়াধারার মাদ্রাসার সূচনায় দখলদার ইংরেজদেরকে চাপ দিয়ে অথবা রাজি করিয়ে অথবা সহযোগিতা নিয়ে ইসলামী শিক্ষা পুনঃপ্রবর্তনের একনিষ্ঠ প্রয়াস লক্ষণীয় অপর দিকে ইংরেজদের কর্তৃত্ববলয় থেকে নিরাপদ দূরত্বে অবস্থান করে নিজস্ব অর্থায়নে অধিকারহারা मुसलमानों সহায়তায় ইসলামী শিক্ষার নবতর যাত্রার পদক্ষেপ ছিল কওমি ধারার স্বতন্ত্রতা। দেওবন্দ মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠার পেছনে ধর্মীয় শিক্ষার পাশাপাশি শামিল ছিল সাম্রাজ্যবাদের বিরোধিতা। দারুল উলুম দেওবন্দের ইতিহাস গ্রন্থে আছে এক সময় আত্মরক্ষার জন্য দেওবন্দের ছাত্রদের আধা সামরিক ট্রেনিং দেয়া হতো। এ ধারার মাদ্রাসায় অন্যায় ও অসত্যের বিরুদ্ধে একটি প্রতিবাদী মানসিকতার লালন লক্ষ্য করা যায়। দেওবন্দ যে কোন প্রকার সহিংসতা থেকে দূরে থেকে মধ্যপন্থাকে উৎসাহিত করে। অর্থাৎ বাড়াবাড়িও না আবার ছাড়াছাড়িও না। জন্মলগ্ন থেকে আজ অবধি দেওবন্দ মাদ্রাসা কখনো রাষ্ট্রীয় সাহায্য নেয়নি।
আলিয়াধারা ধর্মীয় শিক্ষার পাশাপাশি আধুনিকতার চেতনাকে লালন করে অপর দিকে দেওবন্দধারা ইসলামের প্রাচীন রূপের পৃষ্ঠপোষকতা করে। আলিয়া মাদ্রাসাসমূহের শিক্ষক, কর্মচারীদের বেতন, ভাতা ও অবকাঠামোর খরচ আসে সরকারি কোষাগার থেকে। সরকারি নির্দেশনা পরিপালনে আলিয়া মাদ্রাসাগুলো আইনত বাধ্য। কওমি মাদ্রাসায় সে বাধ্যবাধকতা নেই। সমাজের দ্বীনদার জনগোষ্ঠীই কওমি মাদ্রাসাসমূহের অর্থের মূল জোগানদাতা। ফলে তাদের সাথে সমাজের তৃণমূল মানুষের সম্পর্ক গড়ে ওঠে।
১৭৫৭ সালে পলাশীর বিপর্যয়ের পর ব্রিটিশ সরকার ভারতের রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা হাতে নিয়ে মসজিদ, মাদ্রাসা ও খানকাহর নামে সুলতানি ও মুঘল আমলে বরাদ্দকৃত অনুদান ও লাখেরাজ সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করে ফেলেন। ইংরেজি স্কুল চালু করার ধুম পড়ে যায়। স্থানীয় মুসলমানদের সহযোগিতায় মসজিদগুলো চালু থাকলেও বহু দ্বীনি মাদ্রাসা বন্ধ হয়ে যায়। ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে আলেম বানানোর পথ রুদ্ধ করে দেয়া হয়। এভাবে চলতে থাকলে সাধারণ মানুষ ধর্মীয় অনুশাসন ও মাসআলা-মাসায়েল শেখার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হয়ে যাবে।
সে সময় সচেতন মুসলমানরা পরিকল্পনা নিলেন যে কোন প্রকারে দ্বীনি মাদ্রাসা চালু করতে হবে। ভারতের গভর্নর জেনারেল ওয়ারেন হেস্টিংস মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠায় প্রথমে সম্মত হননি। ব্রিটিশ শাসিত ভারতবর্ষে মাদ্রাসা শিক্ষা না থাকলে জনগণ ধীরে ধীরে দ্বীন থেকে দূরে সরে যাবে ও মূল্যবোধ হারিয়ে ফেলবে এমন আশঙ্কা মুসলমানদের মধ্যে ছিল। ইংলিশ স্কুল চালু হওয়ায় পার্থিব সুবিধা প্রাপ্তির প্রত্যাশায় বহু মুসলিম পরিবার ওইদিকে ধাবিত হয়। কতিপয় সরকার সমর্থক দ্বীনদরদি মুসলমান বড়লাটের প্রতি আবেদন, নিবেদন ও চাপ সৃষ্টি করতে থাকেন মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠার জন্য। এক পর্যায়ে তিনি সম্মত হন এবং বেশ কিছু শর্ত জুড়ে দেন। এর মধ্যে ইংরেজ প্রিন্সিপাল নিয়োগ অন্যতম।
কুরআন, হাদিস ও ফিকহের সিলেবাস সংক্ষেপিত করা হয়। সে সময় মুসলমানরা ইংরেজ প্রিন্সিপাল মেনে না নিলে মাদ্রাসা কায়েমের স্বপ্ন বাস্তবায়িত হতো না। আলিয়া পদ্ধতির মাদ্রাসা না থাকলে ৮৬ বছর প্রায় এক শতাব্দী উপমহাদেশের শিক্ষার্থীরা দ্বীনি তালিম থেকে মাহরুম থেকে যেত। দারুল উলুম দেওবন্দ প্রতিষ্ঠা পেয়েছে ১৭৮০ সালে। এর আগে ছিল সরকারি মাদ্রাসা।
ধর্মীয় শিক্ষার পুনঃপ্রবর্তন ব্রিটিশ শাসকরা ভালো চোখে দেখেননি। শিয়ালদার নিকটে ভাড়া করা ঘরে ৪০জন ছাত্র নিয়ে মাদ্রাসা চালু হওয়ার পরও তাঁরা বন্ধ করে দিতে চেয়েছিলেন কিন্তু মুসলিম জনগোষ্ঠীর অব্যাহত দাবির মুখে তাঁরা সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করতে বাধ্য হন। পরবর্তীতে নিজস্ব জায়গায় গড়ে ওঠে Muhammaden College of Calcutta, লোকমুখে যা কলকাতা আলিয়া মাদ্রাসা নামে পরিচিতি লাভ করে। মোল্লা মওজুদ্দিন নামে আরবি ভাষায় পারদর্শী এক আলেম মাদ্রাসার তত্ত্বাবধায়ক ছিলেন। ১৮৫০ থেকে ১৯২৭ সাল পর্যন্ত ২৬ জন ইংরেজ কলকাতা আলিয়া মাদ্রাসার প্রিন্সিপালের দায়িত্ব পালন করেন। এর মধ্যে প্রখ্যাত প্রাচ্যবিদ ড. স্প্রেঙ্গার অন্যতম।
১৯৪৭ সালে ভারত বিভক্তির পর কলকাতা আলিয়া ঢাকার বকশীবাজারে স্থানান্তরিত হয়। তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান ও বর্তমান বাংলাদেশে ঢাকা আলিয়া মাদ্রাসা ইসলামী শিক্ষার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রে পরিণত হয়। বর্তমানে ১০ হাজার ৪৫০টি আলিয়া মাদ্রাসা রয়েছে গোটা বাংলাদেশে। এসব মাদ্রাসায় দাখিল থেকে কামিল পর্যন্ত ২০ লাখ শিক্ষার্থী অধ্যয়ন করে (Bangladesh Bureau of Educational Information and Statistics, BANBEIS, Dhaka, 2016)।
আলিয়া পদ্ধতির মাদ্রাসা উপমহাদেশে অনেক বিদগ্ধ মুফাসসির, মুহাদ্দিস, আলেম, রাজনীতিক ও সমাজসেবকের জন্ম দিয়েছে। সমাজে ইসলামী শিক্ষার বিকাশ, নৈতিকতার উজ্জীবনে তাঁদের অবদান স্মরণীয় হয়ে থাকবে। প্রতিষ্ঠার পর প্রায় একশ’ বছর যাবত কলকাতা আলিয়া তথা আলিয়াধারার মাদ্রাসার প্রভাব ও আধিপত্য ছিল একচ্ছত্র। তখন অন্য ধারার কোন মাদ্রাসা গড়ে ওঠেনি। ১৮৬৬ সালে জন্ম লাভ করে দেওবন্দ মাদ্রাসা।
আলিয়া মাদ্রাসার ব্যাকগ্রাউন্ড আছে এমন বিপুল সংখ্যক শিক্ষার্থী পরবর্তী সময়ে মাদ্রাসা, স্কুল, college, বিশ্ববিদ্যালয়, সিভিল প্রশাসন, সেনাবাহিনী ও আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীতে দায়িত্বশীল পদে যোগ দিয়ে দেশ ও জাতির খিদমত করে গেছেন এবং যাচ্ছেন। স্মর্তব্য যে, তৎকালীন ভারতীয় উপমহাদেশে বাংলাদেশ ও পশ্চিমবঙ্গ ছাড়া কোথাও আলিয়া পদ্ধতির মাদ্রাসা ছিল না। পরবর্তীতে আসাম, বিহার, ওড়িশা ও উত্তর প্রদেশে এ পদ্ধতির কিছু মাদ্রাসা গড়ে ওঠে।
১৭৫৭ সালের সিপাহি বিদ্রোহে ইংরেজ বাহিনী দিল্লিতে ৩৩ হাজার আলেমকে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করে। রাষ্ট্রক্ষমতা কেড়ে নেয় ও সম্পত্তি লুটে নেয়। এখান থেকে বেসরকারি মাদ্রাসা কায়েমের পরিকল্পনা। ওয়ারিছে আম্বিয়া তৈরি, সিলেবাসভুক্ত সব কিতাবের পূর্ণ পাঠদান ও সরকারি কর্তৃত্বের গণ্ডি থেকে পেরিয়ে আল্লাহর তায়ালার সাহায্য ও জনগণের স্বতঃস্ফূর্ত সহযোগিতায় কওমি মাদ্রাসার যাত্রা শুরু। ১৮৬৬ সালে ভারতের উত্তর প্রদেশের সাহারানপুর জেলার দেওবন্দ নামক কসবায় দারুল উলুম নামে প্রথম কওমি মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠিত হয়। আল্লামা কাসেম নানুতুবী ও হাজী আবিদ হোসেন ছিলেন এর প্রতিষ্ঠাতা। কোন ধরনের অবকাঠামোগত সুবিধা ছাড়া একজন ছাত্র ও একজন শিক্ষক দিয়ে মাদ্রাসা চালু করা হয় ডালিম গাছের ছায়ায়। এটাই পরবর্তীতে বিশ্বখ্যাত দারুল উলুম দেওবন্দ। সরকার থেকে কোন ধরনের রাষ্ট্রীয় অনুদান, বেতন-ভাতাও অবকাঠামোগত সুবিধা নিতে কওমি মাদ্রাসা কর্তৃপক্ষ সম্মত হননি। ‘আট নীতিমালা’ (উসূলে হাশতেগানা)-এর আলোকে মজলিসে শূরার মাধ্যমে এ মাদ্রাসা পরিচালিত হয়ে আসছে। বর্তমান সময়ে দারুল উলুম দেওবন্দ পৃথিবীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ দ্বীনি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। এশিয়া, আফ্রিকা, ইংল্যান্ড, কানাডা, ইউরোপ ও অস্ট্রেলিয়াসহ সারা দুনিয়ায় এর শাখা ছড়িয়ে আছে।
মূলত কওমি শিক্ষাধারা একটি আন্দোলন। মিশনারি স্পৃহা নিয়ে কওমি আলেমগণ কাজ করে যাচ্ছেন। বাংলাদেশসহ উপমহাদেশের বিভিন্ন স্থানে রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতা ও অনুদান ছাড়া এত বিশাল আয়তনের মাদ্রাসাগুলো গড়ে উঠেছে যা রীতিমত বিস্ময়ের উদ্রেক করে। ক্রমান্বয়ে কওমি শিক্ষাধারা শহরে ও গ্রামাঞ্চলে বিস্তৃতি লাভ করছে। দারুল উলুম দেওবন্দ শত বছরের পথপরিক্রমায় লাখ লাখ বিশেষজ্ঞ আলেম, ইমাম, খতিব, লেখক তার্কিক তৈরি করেন। পবিত্র কুরআনের প্রামাণ্য তাফসির, হাদিসে রাসুলের (সা) গবেষণাধর্মী ভাষ্য ও ফিকহে ইসলামীর ব্যাখ্যাগ্রন্থ তাঁদের হাতে তৈরি হয়।
ভারত মহাসাগরের আন্দামান নিকোবারে স্থাপিত ব্রিটিশ বন্দিশালায় ইংরেজদের অকথ্য নির্যাতনে যারা প্রাণ হারিয়েছেন, তাঁদের মধ্যে সিংহভাগ আলেম দেওবন্দ ঘরানার। ভারত-বাংলাদেশে সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় কোন ফিতনা মাথাচাড়া দিয়ে উঠলে কওমি ঘরানার ছাত্র-শিক্ষকদের রাজপথে প্রতিবাদমুখর হতে দেখা যায়। ‘বিশ্বের বহুদেশের মুসলিমগণ ধর্মীয় পথনির্দেশনার জন্য তাকিয়ে থাকেন ভারতের দারুল উলুম দেওবন্দের দিকে’ (শুভজ্যোতি ঘোষ, বিবিসি বাংলা, দিল্লি)। সরকারি তথ্যানুসারে বাংলাদেশে কওমি মাদ্রাসার সংখ্যা ১৩ হাজার ৯০২ টি। শিক্ষার্থীর সংখ্যা ১৪ লাখেরও বেশি। তবে বেসরকারি হিসেবে মতে কওমি মাদ্রাসার সংখ্যা ২০ হাজারেরও বেশি (Bangladesh Bureau of Educational Information and Statistics, BANBEIS, Dhaka, 2015)।
বহু বছর ‘দর্সে নিজামী’ ছিল উভয়ধারার মাদ্রাসার অভিন্ন পাঠ্যক্রম। ফিকহ, আরবি সাহিত্য, মানতিক, হিকমত ও প্রাচীন দর্শন ছিল এ পাঠ্যক্রমের বিশেষ বৈশিষ্ট্য। পরবর্তীতে সিহাহ সিত্তা বা ষষ্ঠ প্রামাণিক হাদিস গ্রন্থ সংযোজিত হয়। সময়ের ব্যবধানে সিলেবাসে পরিবর্তন আসে।
একই সিলেবাসে পাঠদান পদ্ধতি চালু থাকায় আলিয়া ও কওমি মাদ্রাসার ছাত্র-শিক্ষকের মধ্যে মানসিকতার মেলবন্ধন, চেতনার ঐক্য ও চিন্তার সাযুজ্য পরিলক্ষিত হয়। বাতিল শক্তির প্রতিবাদে উভয়ধারার আলেমগণ একে অপরের সাথে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে আন্দোলনে ঝাঁপিয়ে পড়েন। দেওবন্দ, সাহারানপুর, লাহোর, মুলতান, করাচি, লালবাগ, হাটহাজারী, জিরি ও পটিয়া থেকে দাওরায়ে হাদিস ডিগ্রিধারী বহু আলেম আলিয়া পদ্ধতির দাখিল, আলিম, ফাজিল ও কামিল পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে দ্বীনের বিভিন্ন খিদমতে নিয়োজিত ছিলেন এবং রয়েছেন। অপর দিকে দাখিল, আলিম, ফাজিল ও কামিল পাস করে আবার কওমি মাদ্রাসায় ভর্তি হয়ে প্রাথমিক স্তর থেকে দাওরায়ে হাদিস সম্পন্ন করেন এমন আলেমের সংখ্যাও নেহাত কম নয়।
এক জামানায় বিপুল সংখ্যায় দেওবন্দী আলেম আলিয়া মাদ্রাসায় ইলমের খিদমতে নিয়োজিত ছিলেন। তেমনিভাবে আলিয়া মাদ্রাসার কামিল ডিগ্রিধারী অনেক আলেমের কওমি মাদ্রাসায় শিক্ষকতা করার রেকর্ডও আছে। আল্লামা আশরাফ আলী থানভীর ভাগ্নে আল্লামা জাফর আহমদ উসমানী ও ঢাকা বায়তুল মোকাররমের জাতীয় মসজিদের খতিব মাওলানা উবায়দুল হক ছিলেন ফাজিলে দেওবন্দ। তাঁরা সারা জীবন শিক্ষকতা করেন ঢাকা আলিয়া মাদ্রাসায় এবং সদরুল মুদাররিসীন হিসেবে দায়িত্ব আঞ্জাম দেন। আল্লামা মুহাম্মদ ফজলুল্লাহ ছিলেন ফাজিলে সাহারানপুর। সারা জীবন নাজিমে আলা হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন চট্টগ্রামের চুনতী হাকিমিয়া আলিয়া মাদ্রাসায়। বুখারীর ব্যাখ্যাগ্রন্থ ‘ইনআমুল বারী’ এর লেখক মাওলানা মুহাম্মদ আমীন, শিকওয়া ও জওয়াবে শিকওয়ার ভাষ্যকার মাওলানা আবদুন নূর ও মুহাদ্দিস মাওলানা আব্দুর রশীদ চুনতী হাকিমিয়া আলিয়া মাদ্রাসা থেকে ফাজিল ডিগ্রি নেওয়ার পর দারুল উলূম দেওবন্দে অধ্যয়ন করে দাওরায়ে হাদিস পাস করেন। দেওবন্দের ফাজিল মাওলানা আফলাতুন কায়সার রায়পুর আলিয়া মাদ্রাসার ভাইস প্রিন্সিপাল হিসেবে আজীবন কর্মরত ছিলেন।
আল্লামা আশরাফ আলী থানভী এর প্রখ্যাত খলিফা মাওলানা ইসহাক বর্ধমানী উত্তর প্রদেশের কানপুর মাদ্রাসার মুহাদ্দিস ও মুহতামিম ছিলেন। জীবনের শেষ দিকে তিনি কলকাতা আলিয়া মাদ্রাসায় হাদিসের উস্তাদ হিসেবে যোগ দেন। ঢাকার লালবাগ থেকে দাওরায়ে হাদিস পাস করার পর মাওলানা শফিউল্লাহ ও মাওলানা হোসাইন আহমদ কাসেমী পাবনা আলিয়া মাদ্রাসায় দীর্ঘ দিন যথাক্রমে হেড মুহাদ্দিস ও ভাইস প্রিন্সিপাল হিসেবে কর্মরত ছিলেন। ঢাকার তামিরুল মিল্লাতে শায়খুল হাদিস হিসেবে শিক্ষাকতা করেন বড় কাটরা কওমি মাদ্রাসার সাবেক মুহতামিম মাওলানা তুরাব আলী।
ঢাকা আলিয়া মাদ্রাসার মুহাদ্দিস আল্লামা সাইয়েদ মুফতি আমিমুল এহসান আল মুজাদ্দেদী লিখিত ৩৪৫ পৃষ্ঠার ‘কাওয়ায়েদুল ফিকহ’ দারুল উলূম দেওবন্দে ইফতা বিভাগে পাঠ্যতালিকাভুক্ত। মাওলানা আব্দুল মান্নান চন্দনপুরা দারুল উলুম আলিয়া থেকে কামিল পাস করে চট্টগ্রামের অন্যতম শীর্ষস্থানীয় মাদ্রাসা পটিয়া আল জামিয়া আল ইসলামিয়ার শিক্ষক হিসেবে নিয়োজিত ছিলেন। বাংলাদেশের প্রাচীনতম কওমি মাদ্রাসা দারুল উলুম হাটহাজারীর দু’জন প্রতিষ্ঠাতা যথাক্রমে মাওলানা মুহাম্মদ হাবিবুল্লাহ সাহেব ও মাওলানা আব্দুল হামিদ সাহেব ছিলেন চট্টগ্রাম মহসীনীয়া আলিয়া মাদ্রাসার ফাজিল।
নোয়াখালীর চাটখিলে অবস্থিত জামিয়া উসমানিয়ার শায়খুল হাদিস হিসেবে আমৃত্যু খিদমত করেন প্রখ্যাত ওয়ায়েজ মাওলানা মোস্তফা আল হুসাইনী। তিনি ছিলেন আলিয়া মাদ্রাসার ছাত্র। নোয়াখালী আলিয়া ইসলামিয়া থেকে কামিল পাস করেন। চৌদ্দগ্রামের নারানকরা কওমি মাদ্রাসার মুহতামিম মাওলানা আনোয়ারুল্লাহ সাহেব ছিলেন সরকারি মাদ্রাসার ফারিগ।
এ জাতীয় ঘটনা ভারত ও বাংলাদেশে ভূরি ভূরি। আলিয়া ও কওমিধারার ছাত্র-শিক্ষকের মাঝে পারস্পরিক সৌহার্দ্যপূর্ণ সম্পর্ক বিদ্যমান ছিল এবং এখনো রয়েছে। অনেকে ইতিহাস না জেনে একে অপরের প্রতি কঠিন মন্তব্য ও রূঢ় আচরণ করে থাকেন। এতে দ্বন্দ্ব ও দূরত্ব তৈরি হয়। দেওবন্দী ও বেরলভী ঘরানার আলেমগণ ফিকহের দিক দিয়ে ইমাম আজম আবু হানিফা (রহ.) এর অনুসারী হলেও তাঁরা প্রচণ্ড ধরনের ভ্রাতৃঘাতী বিরোধে লিপ্ত। অতীতে বেরলভী ও দেওবন্দীর মধ্যে বিভিন্ন ইখতিলাফী মাসায়েল নিয়ে অসংখ্য বাহাস ও বিতর্ক হয়েছে।
উভয় ঘরানায় উদারপন্থী, সহনশীল ও বৈশ্বিক চিন্তা চেতনার ওলামা মাশায়েখগণ আছেন। কিছু মাসায়েলে ইখতিলাফ ও ভিন্নতা সত্ত্বেও উভয় তরিকার আলেমগণ সহনশীল মানসিকতার চর্চা করতে পারলে সমাজে ওয়াহদাতে উম্মতের নির্ভুল বার্তা যেত।
চট্টগ্রাম দারুল উলূম আলিয়া মাদ্রাসার শায়খুল হাদিস মাওলানা মুহাম্মদ আমিন ছিলেন আল্লামা আশরাফ আলী থানভীর বিশিষ্ট মুরিদ এবং কওমি মাদ্রাসায় আলেমদের সংগঠন জমিয়তে ওলামায়ে ইসলামের চট্টগ্রাম মহানগরীর দায়িত্বশীল। পটিয়া আল জামিয়াতুল ইসলামিয়ার প্রধান পরিচালক মাওলানা আব্দুল হালিম বুখারী শিক্ষকতা জীবনের সূচনা করেন সাতকানিয়া আলিয়া ও টাঙ্গাইল আলিয়া মাদ্রাসার হাদিসের উস্তাদ হিসেবে। বুখারী সাহেবের বাবা লোহাগাড়া থানার রাজঘাটা হোসাইনিয়া কওমি মাদ্রাসার প্রধান পরিচালক মাওলানা আব্দুল গনি ছিলেন আলিয়া মাদ্রাসার ফারিগ।
বরিশালের চরমোনাইতে একই ক্যাম্পাসে আলিয়া ও কওমি মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠিত। উভয় মাদ্রাসার পরিচালক ও মুরুব্বি হিসেবে রয়েছেন চরমোনাইর পীর শায়েখ মাওলানা সাইয়েদ মুহাম্মদ রেজাউল করিম হাফি.। পারস্পরিক সম্প্রীতির পরিবেশ বিরাজ করছে ক্যাম্পাসে। আলিয়া ও কওমি ঘরানার ওলামা মাশায়েখদের জাতীয় ও আন্তর্জাতিক ইস্যুতে এক প্ল্যাটফর্মে জমায়েত হয়ে অভিন্ন রূপরেখা প্রণয়ন করার ইতিহাস আছে। এ বন্ধন যাতে অটুট থাকে সে প্রয়াস অব্যাহত রাখতে হবে।
লেখক: সাবেক উপদেষ্টা, ধর্ম বিষয়ক মন্ত্রণালয়, বাংলাদেশ সরকার।
Reporter Name 


























