
অ্যাডভোকেট মোঃ কামরুজ্জামান ভূঁইয়া,
বাংলাদেশের সংবিধান নাগরিকের মৌলিক অধিকার হিসেবে পরিচয় ও মর্যাদার নিশ্চয়তা দিয়েছে। কিন্তু বাস্তবতার কঠিন পর্দায় আজও দেশের অসংখ্য শিশু সেই মৌলিক অধিকার থেকে বঞ্চিত। কারণ একটাই—তাদের বাবা-মা নেই, কিংবা তাদের পরিচয় অজানা। এই অজুহাতেই অনেক ক্ষেত্রেই জন্ম নিবন্ধন করা হয় না এসব শিশুর। ফলে, জন্মের পর থেকেই তারা রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতিহীন, অধিকারবঞ্চিত এক জীবনের পথে হাঁটতে শুরু করে।
জন্ম নিবন্ধন একটি শিশুর জীবনের প্রথম ও সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আইনগত স্বীকৃতি। এটি কেবল জন্মের প্রমাণই নয়, নাগরিকত্বের প্রতীকও বটে। বাংলাদেশ সরকারের বিধান অনুযায়ী, জন্মের ৪৫ দিনের মধ্যে নিবন্ধন সম্পন্ন করা বাধ্যতামূলক। কিন্তু গ্রাম-শহর সর্বত্র দেখা যায়—অনাথ আশ্রম, রাস্তার পাশে বেড়ে ওঠা শিশু, কিংবা দারিদ্র্যপীড়িত পরিবারের সন্তানরা এই প্রক্রিয়ার বাইরে থেকে যাচ্ছে। স্থানীয় জন্ম নিবন্ধন অফিসগুলোতে গিয়ে তারা শুনে এক কথাই—“বাবা-মায়ের নাম ছাড়া জন্ম নিবন্ধন সম্ভব নয়।”
এই প্রশাসনিক অনমনীয়তা শুধু আইনগত ত্রুটি নয়, এটি মানবিকতারও পরিপন্থী। কারণ জাতিসংঘের শিশু অধিকার সনদে (UN Convention on the Rights of the Child – UNCRC) স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে—“Every child shall be registered immediately after birth and shall have the right from birth to a name and a nationality.” বাংলাদেশ এই সনদে স্বাক্ষরকারী রাষ্ট্র, কিন্তু বাস্তবে এর প্রয়োগে আমরা ব্যর্থ।
ফলাফল ভয়াবহ। জন্ম নিবন্ধন না থাকলে এসব শিশু বিদ্যালয়ে ভর্তি হতে পারে না, প্রাথমিক শিক্ষা থেকে শুরু করে যেকোনো সরকারি সেবা প্রাপ্তিতেও বাধার মুখে পড়ে। স্বাস্থ্যসেবা, টিকাদান, পাসপোর্ট, ভোটার আইডি, এমনকি সমাজকল্যাণের সুযোগ থেকেও তারা বঞ্চিত থাকে। সবচেয়ে ভয়াবহ দিক হলো—পরিচয়হীনতা থেকে জন্ম নেয় এক ধরনের সামাজিক বঞ্চনা। যখন একটি শিশু জানে না সে কোথা থেকে এসেছে, তখন সমাজও তাকে “অপরিচিত” হিসেবেই দেখতে শেখে।
এই সংকট সমাধানে সরকারের নীতিগত সংস্কার অত্যাবশ্যক। অনাথ বা বাবা-মা পরিচয়বিহীন শিশুদের জন্য আলাদা নিবন্ধন ব্যবস্থা চালু করা যেতে পারে। “Institutional Guardian System” বা “Certified Guardian Process” প্রবর্তনের মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট আশ্রয়কেন্দ্র বা সমাজসেবা দপ্তরকে অভিভাবক হিসেবে স্বীকৃতি দিয়ে জন্ম নিবন্ধন করা যেতে পারে। এভাবে শিশুরাও নাগরিক অধিকার ও মর্যাদায় ফিরতে পারে।
তাছাড়া জন্ম নিবন্ধনের অনলাইন প্ল্যাটফর্মে “Parent Unknown” বা “Orphan” বিভাগ যুক্ত করা গেলে, এসব শিশুদের জন্য আলাদা একটি পরিচয় নম্বর নির্ধারণ করা সম্ভব হবে। এতে শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও সামাজিক সুরক্ষা প্রোগ্রামে তাদের অন্তর্ভুক্তি সহজ হবে।
এখন সময় এসেছে নীতিনির্ধারকদের মানবিক দৃষ্টিতে এই বিষয়টি পুনর্বিবেচনা করার। কারণ, শিশুর জন্ম নিবন্ধন শুধু একটি দলিল নয়—এটি তার নাগরিকত্বের স্বীকৃতি, তার ভবিষ্যতের ভিত্তি। রাষ্ট্র যদি একজন শিশুর জন্মকেও স্বীকার না করে, তবে তার জীবনের প্রতিটি স্বপ্নই শুরুতেই ব্যর্থতার মুখে পড়ে।
মানবিকতা ও ন্যায়বিচারের সমাজ গড়তে হলে এই শিশুদেরও রাষ্ট্রীয় ছায়ায় নিতে হবে। কারণ—যে শিশুর জন্ম রাষ্ট্রের নথিতে নেই, সে কেবল সমাজের নয়, পুরো জাতির বিবেকের প্রশ্ন।
অ্যাডভোকেট মোঃ কামরুজ্জামান ভূঁইয়া
লেখক, গবেষক, গীতিকার ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক।
দৈনিক মানবজীবন পত্রিকা
অ্যাডভোকেট মোঃ কামরুজ্জামান ভূঁইয়া 
























