
১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৫ |স্থান: কিশোরগঞ্জ
মোঃ জোনায়েদ হোসেন জুয়েল,কিশোরগঞ্জ জেলা প্রতিনিধি ঃ
ঢাকা-কিশোরগঞ্জ রুটের অন্যতম জনপ্রিয় আন্তঃনগর ট্রেন “এগারো সিন্ধুর প্রভাতী”-তে আবারও ধরা পড়লো চরম অনিয়ম। প্রতিদিন শত শত যাত্রী পরিবহনকারী এই ট্রেনে নিয়মিতই বিনা টিকিটে যাত্রী ওঠানোর অভিযোগ থাকলেও এবার ঘটনাটি হাতে-নাতে ধরা পড়েছে।
আজ ১৭ সেপ্টেম্বর, ভোর ৬টার দিকে কিশোরগঞ্জ রেলস্টেশন থেকে ঢাকাগামী “এগারো সিন্ধুর প্রভাতী” ছাড়ার মুহূর্তে একজন যাত্রীকে টিকিট ছাড়াই ট্রেনে তুলতে দেখা যায়। তাৎক্ষণিকভাবে বিষয়টি সাংবাদিকদের নজরে আসলে অভিযুক্ত যাত্রীকে আটক করা হয়।
ম্যানেজারের অস্পষ্ট অবস্থান ঘটনার বিষয়ে ট্রেনের দায়িত্বপ্রাপ্ত ম্যানেজারের কাছে জানতে চাইলে তিনি বিষয়টি এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেন এবং একাধিক প্রশ্নের জবাবে বলেন, “এটা স্টাফদের ভুলও হতে পারে।” এই ধরনের অস্পষ্ট এবং দায়িত্বহীন বক্তব্য রেলওয়ের জবাবদিহিতা ও স্বচ্ছতা নিয়ে বড় প্রশ্ন তুলে দিচ্ছে।
রেলপুলিশের আশ্বাস: ব্যবস্থা নেওয়া হবে৷
ঘটনার বিষয়ে কিশোরগঞ্জ রেলওয়ে থানার এক কর্মকর্তা জানান,
“বিনা টিকিটে যাত্রী তোলা আইনত দণ্ডনীয় অপরাধ। আমাদের নিয়মিত টহল ও নজরদারি চলছে। কেউ অনিয়মে জড়িত থাকলে, সে রেলকর্মী হোক বা যাত্রী—আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
কিশোরগঞ্জ রেলস্টেশনের সহকারী স্টেশন মাস্টার রফিকুল ইসলাম বলেন,
“বিষয়টি অত্যন্ত দুঃখজনক। অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণ ট্রেন পরিচালনাকারী টিমের উপর নির্ভর করে। তবুও আমি বিষয়টি যথাযথ কর্তৃপক্ষকে জানাবো।”
ভুক্তভোগী যাত্রীদের ক্ষোভ: টিকিট কিনেও দাঁড়িয়ে ভ্রমণ
নিয়মিত যাত্রীরা জানান, ট্রেনে উঠেই দেখা যায় নির্ধারিত আসন ইতোমধ্যেই দখল করে রেখেছে টিকিটবিহীন যাত্রীরা। ফলে টিকিট কেটেও দাঁড়িয়ে বা গেটের পাশে বসে যাতায়াত করতে হয়। এক নিয়মিত নারী যাত্রী বলেন,
“মেয়ে সন্তান নিয়ে ট্রেনে উঠি, কিন্তু আসন পাই না। আগেই দালাল চক্রের লোকজন সিট দখল করে বসে থাকে—যাদের টিকিটই নেই৷”
রেলওয়ের আর্থিক ক্ষতি ও ভাবমূর্তির অবনতি
টিকিট ছাড়া যাত্রী পরিবহনের ফলে সরকার প্রতি বছর কোটি কোটি টাকার রাজস্ব হারাচ্ছে। একদিকে সাধারণ যাত্রীরা হয়রানির শিকার, অন্যদিকে রেলওয়ের সেবার মান ও প্রতিষ্ঠানের ভাবমূর্তি দুটোই প্রশ্নবিদ্ধ হচ্ছে।
বিশ্লেষকের মতামত: সমাধানে কার্যকর পদক্ষেপ জরুরি
রেলপথ বিশ্লেষক ইঞ্জিনিয়ার নাসির উদ্দিন খান বলেন:
“এই সমস্যার পেছনে দীর্ঘদিনের অনিয়ম ও অভ্যন্তরীণ দুর্নীতির যোগসূত্র রয়েছে। জরুরি ভিত্তিতে নিচের পদক্ষেপগুলো গ্রহণ করা দরকার:
- ট্রেন ও স্টেশনে সিসিটিভি নজরদারি বাড়ানো৷
- প্রতিটি ট্রিপে ভ্রাম্যমাণ টিকিট চেকিং টিম মোতায়েন
- রেলকর্মীদের জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা
- অনিয়মে জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর শাস্তি নিশ্চিত
- ডিজিটাল সিট অ্যালোকেশন ও টিকিটিং ব্যবস্থা চালু”
“এগারো সিন্ধুর প্রভাতী” ট্রেনে টিকিট ছাড়া যাত্রী তোলা এখন আর বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা নয়—এটি একটি প্রাতিষ্ঠানিক ব্যর্থতা ও অব্যবস্থাপনার প্রতিচ্ছবি। রেলওয়ের মতো একটি গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানকে দুর্নীতি ও গাফিলতি থেকে রক্ষা করতে হলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে এখনই জবাবদিহিমূলক, দৃষ্টান্তমূলক এবং প্রযুক্তিনির্ভর ব্যবস্থা নিতে হবে। নইলে ভবিষ্যতে রেলওয়ের ওপর সাধারণ মানুষের আস্থা আরও কমে যাবে, আর রাষ্ট্র হারাবে রাজস্ব, বিশ্বাস, ও ন্যায্যতার নীতি।

Reporter Name 

























