নিজস্ব প্রতিবেদক
অবশেষে সাভার মডেল থানার বিতর্কিত উপপরিদর্শক (এসআই) মোহাম্মদ নেয়ামত উল্লাহকে ক্লোজ করা হয়েছে। সোমবার (১৭ আগস্ট) রাতে তাকে ঢাকা জেলা পুলিশ লাইনে সংযুক্ত করা হয়। ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের পরামর্শে ঢাকা জেলার পুলিশ সুপার (এসপি) শামীমা পারভীনের নির্দেশে তাকে পুলিশ লাইনে সংযুক্ত করা হয়েছে বলে পুলিশের একাধিক সূত্র বিষয়টি নিশ্চিত করেছে।
দীর্ঘদিন ধরে তার বিরুদ্ধে ওঠা একের পর এক অভিযোগ, গণমাধ্যমে প্রকাশিত অনুসন্ধানী প্রতিবেদন এবং সর্বশেষ আদালতে দায়ের হওয়া চাঁদাবাজি মামলার পর এই পদক্ষেপের ঘটনা ঘটল।
অভিযুক্ত নেয়ামত উল্লাহকে ঘিরে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে সহকর্মীদের সঙ্গে অসদাচরণ, ঊর্ধ্বতনদের নাম ভাঙিয়ে সহকর্মীদের চাকরি খাওয়ার ভয় দেখানো, মিথ্যা নাটক সাজিয়ে অন্যান্য পুলিশ সদস্যদের ফাঁসানো, বাদী ও বিবাদীর সঙ্গে দ্বৈরথের খেলা, তার হেফাজতে থাকা অবস্থায় সাভারের পশ্চিম রাজাশন এলাকার একটি রিকশা গ্যারেজ লুট, নিজেকে লুটের মামলা থেকে বাঁচাতে বিভ্রান্তিকর মিথ্যা তথ্য ছড়িয়ে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে ম্যানেজ করে মারামারি মামলার আসামিকে একের পর এক রাজনৈতিক মামলায় ঢুকানো, সাংবাদিক মারধরের মামলার আসামি গ্যারেজ মালিক শামীম রেজা ও তার প্রতিপক্ষ কিশোর নির্যাতন ও চুরির মামলার আসামি মাহাবুব হোসেন সামির ওরফে ফেন্সি সামিরকে গ্রেপ্তার না করেই নাম ফাটানো, আর্থিক বাণিজ্য, অর্থের বিনিময়ে অবৈধ সুবিধা দেওয়া, ভুক্তভোগী পরিবারের কাছে অর্থ দাবি, দুটি দামি আইফোন নেওয়া এবং অন্য মামলায় ফাঁসিয়ে দেওয়ার ভয় দেখিয়ে পরিবারের অন্যান্য সদস্যদের নির্যাতন করার অভিযোগ।
এর আগে গত ১৬ আগস্ট অভিযুক্ত এই পুলিশ কর্মকর্তাকে প্রধান আসামি করে ১১ জনের বিরুদ্ধে ঢাকার অতিরিক্ত চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেটের আদালতে শামীম রেজার মা সুরাইয়া বেগম চাঁদাবাজির অভিযোগে মামলা দায়ের করেন। অন্য আসামিরা হলেন মাহাবুব হোসেন সামির ওরফে ফেন্সি সামির এবং সাদ্দাম হোসেনসহ অজ্ঞাতনামা আরও ৭/৮ জন।
বাদীর জবানবন্দি গ্রহণের পর আদালত প্রাথমিক সত্যতা পাওয়ায় অভিযোগটি আমলে নিয়ে তদন্তের জন্য পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনকে (পিবিআই) নির্দেশ দিয়েছেন।
মামলার এজাহার সূত্রে জানা যায়, এসআই মোহাম্মদ নেয়ামত উল্লাহর পরোক্ষ মদদে দীর্ঘদিন ধরে সুরাইয়া বেগমের ছেলে শামীম রেজার কাছে চাঁদা দাবি করে আসছিলেন আসামিরা। এর ধারাবাহিকতায় গত ২২ মে তারা আরও কয়েকজনকে সঙ্গে নিয়ে শামীমের রিকশার গ্যারেজে যান। সেখানে শামীমের কাছে ৩৮ লাখ টাকা চাঁদা দাবি করা হয়। টাকা দিতে অস্বীকৃতি জানালে গ্যারেজে ভাঙচুর চালিয়ে প্রায় ১২ লাখ টাকার ক্ষতি করা হয়। একই সময় গ্যারেজে থাকা নগদ ৯০ হাজার টাকা এবং প্রায় ৬ লাখ টাকা মূল্যের একটি মোটরসাইকেল নিয়ে যায় অভিযুক্তরা। সেদিন দুই পক্ষের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনাও ঘটে।
এই ঘটনার পর থেকেই শামীম রেজাকে ঘিরে শুরু হয় একের পর এক মামলা ও এসআই নেয়ামতের পূর্বপরিকল্পিত পুলিশি তৎপরতা। মাহাবুব হোসেন সামিরসহ সাংবাদিককে মারধরের পর আহত করার ঘটনায় শামীম রেজাকে প্রধান আসামি করে মামলা দায়ের করা হয়। এরপর কয়েক দফায় শামীমের গ্যারেজ লুট করে প্রায় ২৩টি অটোরিকশা, ১৪ লাখ টাকার রিকশার ব্যাটারিসহ মূল্যবান জিনিসপত্র হাতিয়ে নেয় মাহাবুব হোসেন সামির ও তার লোকজন। পরবর্তীতে ১০ জুন শামীম রেজাকে ওই মামলায় গ্রেপ্তার করে সাভার মডেল থানায় নিয়ে আসা হয়।
মামলা সূত্রে আরও জানা যায়, থানায় নেওয়ার পর এসআই নেয়ামত উল্লাহ শামীমকে রিমান্ডে নিয়ে শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের ভয় দেখান। একই সঙ্গে শামীম ও তার স্ত্রীকে বিভিন্ন মামলা, গ্রেপ্তার ও পরোয়ানা-সংক্রান্ত হয়রানি থেকে রক্ষা করার কথা বলে ২০ লাখ টাকা চাঁদা দাবি করেন। আহতদের ক্ষতিপূরণ বাবদ নগদ টাকা এবং ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে ম্যানেজ করতে দুটি আইফোন আদায় করেন বলেও অভিযোগ করা হয়েছে। শুধু তাই নয়, শামীম রেজাকে গ্রেপ্তারের পর তার কাছ থেকে নগদ ৩ লাখ ৩৮ হাজার টাকা, একটি স্বর্ণের আংটি এবং প্রায় ৬ লাখ ৬০ হাজার টাকা মূল্যের তিনটি মোবাইল ফোন নেওয়ার অভিযোগও মামলায় উল্লেখ করা হয়েছে।
বাদীর অভিযোগ, বিষয়টি জানাজানি হওয়ার পর তিনটি মোবাইল ফোন ফেরত দেওয়া হলেও নগদ টাকা ও স্বর্ণের আংটি ফেরত দেওয়া হয়নি।
এর আগে গ্রেপ্তার না করার শর্তে এবং নিরাপদে সরিয়ে দেওয়ার কথা বলে শামীম রেজার পরিবারের কাছে দুই দফায় সাড়ে ৪ লাখ টাকা নেওয়া হয় বলেও মামলার অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে। অন্যদিকে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশে পুলিশের অন্য একটি অভিযানে শামীম রেজা গ্রেপ্তার হলেও এসআই নেয়ামত নিজেই তাকে গ্রেপ্তার করেছেন—এমন প্রচারণা চালিয়ে বাদী পক্ষের অনুকম্পা নেওয়ার চেষ্টা করেন বলেও অভিযোগ রয়েছে। পরবর্তীতে ঢাকা জেলা পুলিশের নির্দেশনায় শামীম রেজার প্রতিপক্ষ মাহাবুব হোসেন সামিরকেও লুটপাটের ঘটনায় গ্রেপ্তার করা হলে সেখানেও নিজের কৃতিত্ব তুলে ধরেন বলে অভিযোগ উঠেছে।
অভিযোগ রয়েছে, মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা হিসেবে নিযুক্ত হওয়ার পর মিথ্যার আশ্রয় নিয়ে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের ভুল বুঝিয়ে শামীম রেজার সঙ্গে সখ্যতার অভিযোগ তুলে সাভার মডেল থানার এসআই মনিরুজ্জামান, এএসআই মেরাজুল ইসলাম ও এএসআই আসিফুর রহমানকে সাময়িক বরখাস্ত করতে বাধ্য করেন। চাকরি খাওয়ার ভয় দেখিয়ে এক সাংবাদিককে ব্যবহার করে তাদের কাছে পাঁচ লাখ টাকা চাঁদা দাবি করেন বলেও অভিযোগ করা হয়েছে। পরবর্তীতে এই তিন পুলিশ কর্মকর্তার কাছ থেকে ১ লাখ ৫৫ হাজার টাকা আদায় করা হয় বলে অভিযোগ রয়েছে।
এই ঘটনার বিরোধিতা করায় এবং তাদের টাকা ফেরত দেওয়ার কথা বললে ক্ষিপ্ত হয়ে দায়িত্ব অবহেলার ‘ব্লেম গেম’ খেলে তৎকালীন ওসি আরমান আলী ও পুলিশ পরিদর্শক অপারেশন হেলাল উদ্দিনকেও প্রত্যাহার করতে বিভিন্ন কৌশল অবলম্বন করেন বলে অভিযোগ। এরপর দুই মাস ওসি না থাকায় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, জেলার পুলিশ সুপার (এসপি) এমনকি স্থানীয় সংসদ সদস্যের (এমপি) নাম ভাঙিয়ে পুরো থানা প্রশাসনকে তিনি নিজের মুঠোয় করে রাখেন বলেও অভিযোগ রয়েছে। সাভার মডেল থানা প্রাঙ্গণে আদালত বসিয়ে বিচার, আসামি গ্রেপ্তার, আসামি চালান, মামলার গতিপথ পরিবর্তন থেকে শুরু করে জামিন পাইয়ে দেওয়ার গোপন চুক্তি—সবখানেই ক্ষমতার চরম দাপট দেখিয়েছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
অনুসন্ধান ও থানা সূত্রে জানা যায়, এসআই মোহাম্মদ নেয়ামত উল্লাহ দীর্ঘদিন ধরে রাজনৈতিক প্রভাবশালী মহল ও স্থানীয় সংসদ সদস্যের ঘনিষ্ঠজন পরিচয় দিয়ে থানায় একক আধিপত্য কায়েম করেছিলেন। তিনি সহকর্মী অন্যান্য এসআই ও জুনিয়র পুলিশ সদস্যদের সর্বক্ষণ তটস্থ রাখতেন বলেও অভিযোগ রয়েছে।
সম্প্রতি প্রকাশ্যে আসা একাধিক অডিও রেকর্ডে এসআই নেয়ামতের দাপট ও সহকর্মীদের হুমকি দেওয়ার বিষয়টি উঠে এসেছে। সামান্য হেসে কথা বলা বা তাঁর কথার প্রতিবাদ করার জেরে সহকর্মীদের চাকরিচ্যুত করার হুমকি দিতে শোনা যায় তাঁকে। একটি অডিও ক্লিপে তিনি এক সহকর্মীকে বলেন, “আমি চাইলে ১০ মিনিটে আপনার চাকরিটা চলে যাবে। জাস্ট ১০ মিনিট, আমি আপনাদের গভীরের খবরও জানি। আমার মুখ ছুটাইয়েন না। আমি খুব রিজার্ভ লোক।”
আসামিকে রিমান্ডে নির্যাতন না করা, নতুন মামলায় নাম না জড়ানো এবং দ্রুত মুক্তির ব্যবস্থা করার আশ্বাস দিয়ে অর্থ ও দামি মোবাইল নেওয়ার বিষয়টি গণমাধ্যমে প্রকাশিত হলে নিজের অপকর্ম আড়াল করতে ষড়যন্ত্রের শিকার বলে প্রচারণা চালাতে থাকেন বলেও অভিযোগ রয়েছে।
পরবর্তীতে একের পর এক অভিযোগ সামনে আসতে থাকে এই পুলিশ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে। এমনকি অনুসন্ধানে ফাঁস হওয়া অডিওতে নেয়ামত উল্লাহকে শামীম যেন ‘অন্য কোনো মামলায় না পড়ে’, সে বিষয়ে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে চেষ্টা করার কথা বলতে শোনা যায়। পাশাপাশি আসামির স্ত্রীকে বারবার কাছে আসার জন্য তাগিদ দেওয়ার অভিযোগও উঠেছে।
একদিকে গ্যারেজ লুটের মামলা থেকে বাঁচার জন্য শামীম রেজাকে দীর্ঘদিন জেলে রাখতে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের ব্যবহার করে অন্য মামলায় গ্রেপ্তার দেখানো এবং তার পরিবারের সদস্যদের গ্রেপ্তারের ভয় দেখিয়ে ঘুষ নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। অন্যদিকে তাকে নতুন মামলায় না জড়ানোর নিশ্চয়তা দিয়েও তার পরিবারের কাছে অর্থ দাবি করা হয়েছে বলে অভিযোগ করা হয়েছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বিষয়গুলো গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করা প্রয়োজন।
সর্বশেষ আদালতে তার বিরুদ্ধে সরাসরি চাঁদাবাজির মামলা হয়েছে এবং আদালত পিবিআইকে তদন্তের নির্দেশ দিয়েছেন। এর একদিন পরই তাকে সাভার মডেল থানা থেকে সরিয়ে ঢাকা জেলা পুলিশ লাইনে সংযুক্ত করার ঘটনা নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। এর আগে তাকে সংশ্লিষ্ট মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা থেকেও অপসারণ করে সতর্ক করেন ঢাকা জেলার পুলিশ সুপার শামীমা পারভীন। তার ক্লোজ হওয়ার খবরে থানার পুলিশ কর্মকর্তা ও ফোর্সদের মাঝে স্বস্তি বিরাজ করছে। এছাড়াও সাভার থানাসহ এলাকার বাসিন্দাদের মধ্যে নীরব আনন্দের পরিবেশ দেখা গেছে বলে জানা গেছে।
এর আগে নেয়ামত উল্লাহ গণমাধ্যমের কাছে তার বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগগুলোকে মিথ্যা বলে দাবি করেছিলেন।
তবে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে—একজন পুলিশ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে এতগুলো গুরুতর অভিযোগ ওঠার পরও কেন এতদিন তিনি একই থানায় দায়িত্ব পালন করে গেলেন? অভিযোগগুলো নিয়ে আগে তদন্ত হলে কি পরিস্থিতি এতদূর গড়াত?
এসআই নেয়ামত উল্লাহকে পুলিশ লাইনে সংযুক্ত করার মধ্য দিয়ে আপাতত তাঁর মাঠপর্যায়ের দায়িত্বের অবসান হয়েছে। এখন সাভারবাসীর প্রত্যাশা, অভিযোগগুলোর নিরপেক্ষ তদন্ত হবে এবং সত্য-মিথ্যা প্রমাণের মাধ্যমে প্রকৃত চিত্র সামনে আসবে।
Reporter Name 






















