রফিকুল ইসলাম, কুষ্টিয়া প্রতিনিধি:
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নিয়মিত অভিযান সত্ত্বেও কুষ্টিয়ার দৌলতপুর সীমান্ত দিয়ে অবাধে দেশে প্রবেশ করছে বিভিন্ন ধরনের মাদক। সীমান্ত পেরিয়ে এসব মাদক জেলাজুড়ে ছড়িয়ে পড়ায় যুবসমাজ ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে গেছে বলে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন স্থানীয়রা।
সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, মাদক ব্যবসার সঙ্গে সমাজের প্রভাবশালী ও অসাধু কিছু ব্যক্তি জড়িত। দৌলতপুর সীমান্ত দিয়ে প্রতি মাসে কোটি কোটি টাকার মাদকের লেনদেন হচ্ছে। ভারত সীমান্তঘেঁষা এ উপজেলাকে ব্যবহার করে সংঘবদ্ধ সিন্ডিকেটের মাধ্যমে মাদক দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও স্থানীয়দের মতে, বর্তমানে মাদকসেবীদের নির্দিষ্ট স্থানে যেতে হয় না। একটি ফোন কলেই ‘হোম ডেলিভারি’ পদ্ধতিতে চাহিদা অনুযায়ী ইয়াবা, ফেনসিডিল, ট্যাপেন্টাডলসহ বিভিন্ন মাদক হাতে পৌঁছে যাচ্ছে।
গোয়েন্দা সূত্রের দাবি, এ অবৈধ বাণিজ্যের সঙ্গে প্রভাবশালী ব্যক্তি, দুর্নীতিগ্রস্ত কিছু আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য, নামধারী সাংবাদিক এবং রাজনৈতিক প্রভাবশালী ব্যক্তিদের একটি অংশ জড়িত।
চিলমারী ইউনিয়নের বাংলাবাজার সীমান্ত ও উদয়নগর বিওপি-সংলগ্ন পদ্মা নদীর তীব্র ভাঙনের কারণে সীমান্তের বিস্তীর্ণ এলাকা নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে। নদীর গতিপথ পরিবর্তনের ফলে কয়েকটি এলাকায় দুই দেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনীর টহল কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে। এ সুযোগে উদয়নগর সীমান্ত মাদক পাচারের অন্যতম রুটে পরিণত হয়েছে বলে জানিয়েছে বিজিবি ও পুলিশের গোয়েন্দা সূত্র।
এছাড়া আদাবাড়িয়া ইউনিয়নের ধর্মদহ ও পশ্চিম ধর্মদহ, প্রাগপুর ইউনিয়নের জামালপুর ও বিলগাতুয়া, রামকৃষ্ণপুর ইউনিয়নের চল্লিশপাড়া ও ভাগযোতসহ পদ্মা নদীর বিভিন্ন নৌপথ ব্যবহার করেও দেশে মাদক প্রবেশ করছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর দাবি।
একটি নির্ভরযোগ্য সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, দৌলতপুর উপজেলায় প্রতি মাসে প্রায় পাঁচ কোটি টাকার মাদক লেনদেন হয়।
সংশ্লিষ্টদের ভাষ্য, বর্তমানে মাদক কারবারিদের প্রধান লক্ষ্য ১৭ থেকে ৩৫ বছর বয়সী তরুণ-যুবকরা। ইয়াবা, ট্যাপেন্টাডল ও বিভিন্ন নেশাজাতীয় ট্যাবলেটের চাহিদা সবচেয়ে বেশি। আকারে ছোট হওয়ায় এসব মাদক সহজে বহন করা যায়। প্রশাসনের নজর এড়াতে সরাসরি বেচাকেনার পরিবর্তে ফোনের মাধ্যমে ‘হোম ডেলিভারি’ পদ্ধতিতে সরবরাহ করা হচ্ছে।
বিজিবির তথ্যমতে, ভারতের সীমান্তবর্তী এলাকা থেকে মাত্র ৫৫ পয়সায় সংগ্রহ করা কিছু নেশাজাতীয় ট্যাবলেট বাংলাদেশে এনে ১৫০ থেকে ৩০০ টাকা পর্যন্ত দামে বিক্রি করা হচ্ছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, সীমান্ত এলাকায় বহিরাগত মোটরসাইকেল আরোহী ও অপরিচিত মানুষের আনাগোনা বেড়েছে। বিশেষ করে বিকেল ও সাপ্তাহিক ছুটির দিনে সীমান্ত এলাকায় তরুণদের মাদকসেবনের প্রবণতা বৃদ্ধি পাওয়ায় নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
সংশ্লিষ্টরা জানান, বিজিবি ও পুলিশের নিয়মিত অভিযান চললেও মাদকের প্রবেশ পুরোপুরি বন্ধ করা সম্ভব হচ্ছে না। অন্যদিকে, মাদক মামলার আসামিরা সহজেই জামিন পেয়ে যাওয়ায় মাদক কারবারিরা আরও বেপরোয়া হয়ে উঠছে।
কুষ্টিয়া ৪৭ বিজিবি ব্যাটালিয়নের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের ১ জানুয়ারি থেকে ২৯ জুলাই পর্যন্ত বিভিন্ন অভিযানে প্রায় ১৭ কোটি ৭৫ লাখ টাকা মূল্যের মাদকদ্রব্য জব্দ করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে ২ হাজার ২৭৯ বোতল বিদেশি মদ, ৩ হাজার ২৯৫ বোতল ফেনসিডিল, ১৬১ দশমিক ৩৭৫ কেজি গাঁজা, ২৫ হাজার ৭২টি ইয়াবা, ২ দশমিক ৩৮৫ কেজি হেরোইন, ১২ বোতল এলএসডি, ১ কেজি আফিম, ২৫০ গ্রাম কোকেন, ১ লাখ ১৬ হাজার ৩৬৮টি ট্যাপেন্টাডল ট্যাবলেট, ১ লাখ ৬ হাজার ১৭৯টি সিলডেনাফিল ট্যাবলেট, ৪৬ হাজার ৫০৩টি ডেক্সামেথাসন ট্যাবলেট এবং ৫১ হাজার ৭৮০টি সাইপ্রোহেপ্টাডিন ট্যাবলেট।
অন্যদিকে, দৌলতপুর থানা পুলিশের তথ্য বলছে, চলতি বছরের প্রথম সাত মাসে ১০৬টি মাদক মামলা দায়ের করা হয়েছে এবং ৭৭ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, মাদকের সহজলভ্যতার কারণে উপজেলাজুড়ে চুরি, ছিনতাইসহ নানা ধরনের অপরাধ বৃদ্ধি পেয়েছে।
এদিকে, গত ১৯ জুলাই আদাবাড়িয়া ইউনিয়নের গড়ুরা এলাকা থেকে জব্দ হওয়া ৪০০ বোতল ফেনসিডিল আত্মসাতের অভিযোগ ওঠে তেকালা পুলিশ ক্যাম্পের দায়িত্বপ্রাপ্ত উপপরিদর্শক (এসআই) ফিরোজ হোসেনের বিরুদ্ধে। পুলিশ জানিয়েছে, বিষয়টি তদন্তাধীন রয়েছে।
মাদকের বিস্তার নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে প্রাগপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আশরাফুজ্জামান মুকুল বলেন, আগের তুলনায় মাদকের বিস্তার অনেক বেড়েছে। এখন প্রকাশ্যেই মাদক বেচাকেনা হচ্ছে এবং এর সবচেয়ে বড় শিকার হচ্ছে তরুণ সমাজ।
দৌলতপুর সদর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মহিউল ইসলাম বলেন, মাদকের সঙ্গে কারা জড়িত তা অনেকেই জানেন। এখন প্রয়োজন কঠোর ও কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ।
দৌলতপুর উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. তৌহিদুল হাসান তুহিন বলেন, মাদকাসক্তরা আত্মনিয়ন্ত্রণ হারিয়ে বিভিন্ন অপরাধে জড়িয়ে পড়ছেন। একই সঙ্গে তারা নানা শারীরিক ও মানসিক জটিলতায় আক্রান্ত হচ্ছেন, যা সমাজের জন্য বড় হুমকি।
দৌলতপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) খালেদুর রহমান বলেন, মাদকের বিস্তার আগের তুলনায় বেড়েছে। এটি নিয়ন্ত্রণে সব আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন।
ভেড়ামারা সার্কেলের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার দেলোয়ার হোসেন জানান, সীমান্ত এলাকা হওয়ায় এখানে মাদকের বিস্তার তুলনামূলক বেশি। এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় আরও কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
কুষ্টিয়া ৪৭ বিজিবি ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল রাশেদ কামাল রনি বলেন, সীমান্তে মাদক প্রতিরোধে বিজিবির টহল ও জনবল বৃদ্ধি করা হয়েছে। নিয়মিত অভিযান চালিয়ে বিপুল পরিমাণ মাদক জব্দ করা হচ্ছে। তবে দেশের অভ্যন্তরে থাকা মাদক উদ্ধার ও নিয়ন্ত্রণে পুলিশের সহযোগিতার ওপর গুরুত্বারোপ করে তিনি বলেন, যৌথ অভিযানের মাধ্যমেই মাদকের বিস্তার কার্যকরভাবে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব।
Reporter Name 
























