সংসারের অভাব ঘোচাতে ধারদেনা করে চার বছর আগে একমাত্র ছেলেকে সৌদি আরবে পাঠিয়েছিলেন বাবা-মা। স্বপ্ন ছিল, ছেলে বিদেশ থেকে ফিরে ঘর তৈরি করবেন, ছোট বোনের বিয়ে দেবেন এবং আনুষ্ঠানিকভাবে স্ত্রীকে ঘরে তুলে আনবেন। কিন্তু সেই স্বপ্ন আর পূরণ হলো না। সৌদি আরবের একটি সোফা কারখানায় অগ্নিকাণ্ডে প্রাণ হারিয়েছেন নাটোরের নলডাঙ্গা উপজেলার সাব্বির হোসেন (৩০)।
নিহত সাব্বির হোসেন উপজেলার খাজুরা ইউনিয়নের খাজুরাশ্রীপুর গ্রামের দরিদ্র কৃষক মো. গোলাম রব্বানীর ছেলে। জীবিকার তাগিদে বিদেশে পাড়ি দেওয়া সাব্বির এখন ফিরছেন নিথর দেহ হয়ে।
পরিবার ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, সৌদি আরব যাওয়ার দুই বছর পর পাশের নওগাঁ জেলার আত্রাই উপজেলার খাসখামার গ্রামের আব্দুল জলিলের মেয়ে জলি খাতুনের সঙ্গে মোবাইল ফোনের মাধ্যমে বিয়ে হয় সাব্বিরের। তবে আর্থিক সংকটের কারণে গত দুই বছরেও স্ত্রীকে আনুষ্ঠানিকভাবে নিজের বাড়িতে তুলে আনতে পারেননি তিনি।
পরিবারের সদস্যরা জানান, দেশে ফিরে প্রথমে ছোট বোনকে ধুমধাম করে বিয়ে দেওয়ার পরিকল্পনা ছিল সাব্বিরের। এরপর স্ত্রী জলি খাতুনকে আনুষ্ঠানিকভাবে ঘরে তুলে আনার কথা ছিল। কিন্তু সৌদি আরবের অগ্নিকাণ্ডে সেই স্বপ্ন থেমে গেল।
সাব্বিরের চাচা আয়চান আলী বলেন, ‘সাব্বির দেশে আসছে ঠিকই, তবে জীবিত নয়—লাশ হয়ে। ধুমধাম করে বিয়ের অনুষ্ঠান আর হবে না, এবার হবে তার দাফন-কাফন।’
তিনি জানান, পরিবারের আর্থিক অবস্থা খুবই খারাপ। পৈতৃক ভিটায় টিনের বেড়া ও ছাউনি দেওয়া দুটি ঘর থাকলেও সেগুলো বসবাসের উপযোগী নয়। এ কারণে সাব্বিরের বাবা গোলাম রব্বানী স্ত্রী ও মেয়েকে নিয়ে ঢাকার জিরানী বাজার এলাকায় ভাড়া বাসায় থাকেন এবং একটি গার্মেন্টসে চাকরি করেন।
সাব্বিরের বাবা গোলাম রব্বানী বলেন, ‘অনেক টাকা ঋণ রয়েছে। ছেলের একার পক্ষে সেই ঋণ পরিশোধ করা সম্ভব নয়। তাই আমি গার্মেন্টসে চাকরি করে স্ত্রী-মেয়েকে নিয়ে সংসার চালাই। আর ছেলে ঋণের টাকা পরিশোধ করত। আরও প্রায় এক বছর সময় লাগত ঋণ পরিশোধ করতে।’
তিনি বলেন, ‘একমাত্র মেয়ে নবম শ্রেণিতে পড়ে। ছেলে দেশে ফিরে বাড়িঘর করে স্ত্রীকে ঘরে তুলে আনবে—এটাই ছিল আমাদের স্বপ্ন। কিন্তু সব স্বপ্ন বিফলে গেল। ছেলে তার স্ত্রীকেও দেখতে পারল না, আর স্ত্রীও তার স্বামীকে শেষবারের মতো দেখতে পেল না।’
কান্নাজড়িত কণ্ঠে সাব্বিরের বাবা সরকারের কাছে ছেলের মরদেহ দ্রুত দেশে ফিরিয়ে আনার ব্যবস্থা করার দাবি জানান।
স্বজনদের ভাষ্য, সাব্বিরকে বিদেশে পাঠাতে গিয়ে পরিবারটি ব্যাংক ও এনজিও থেকে ঋণ নিয়েছিল। সেই ঋণের বোঝা এখনও রয়েছে। পরিবারের আর্থিক সংকট, ঋণ পরিশোধ এবং ছোট বোনের ভবিষ্যৎ গড়ার চিন্তায় নিজের সংসারও পুরোপুরি গুছিয়ে উঠতে পারেননি সাব্বির।
সাব্বিরের মা বলেন, ‘ছোটবেলায় মা-বাবাকে হারিয়েছি। মানুষের বাড়িতে কাজ করে, না খেয়ে-খেয়ে বড় হয়েছি। অনেক কষ্ট করে একমাত্র ছেলেকে চার বছর আগে সৌদি আরবে পাঠিয়েছিলাম। আমার সব স্বপ্ন ছিল ছেলেকে ঘিরে। প্রশাসনের কাছে আমার একটাই আবেদন—আমার ছেলেকে আমার বুকে ফিরিয়ে দিন।’
এদিকে সাব্বিরের মৃত্যুর খবরে শোকের ছায়া নেমে এসেছে তার নিজ গ্রামে। চাচাতো বোন আয়েশা আক্তার জানান, দুর্ঘটনার দিন রোববারও মোবাইল ফোনে সাব্বিরের সঙ্গে তার কথা হয়েছিল। পরিবারের সবার খোঁজখবর নেওয়া মানুষটির আকস্মিক মৃত্যুর খবর কোনোভাবেই মেনে নিতে পারছেন না স্বজনরা।
এখন পরিবারের অপেক্ষা একটাই—সাব্বিরের নিথর দেহ যেন দ্রুত দেশে ফিরে আসে এবং শেষবারের মতো তাকে আপনজনদের কাছে ফিরিয়ে দেওয়া হয়।
Reporter Name 





















