Dhaka ০৬:০২ অপরাহ্ন, রবিবার, ০৯ অগাস্ট ২০২৬, ২৫ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
শিরনাম:
বগুড়ায় দাড়িয়ে থাকা ট্রাকের পিছনে ধাক্কায় নিহত- ৩,আহত-২! কোরআন ও হাদিসের আলোকে পবিত্র ঈদে মিলাদুন্নবী (সাঃ) উনছিপ্রাং রোহিঙ্গা ক্যাম্পে সশস্ত্র মহড়া, চাঁদাবাজি ও নির্যাতনের অভিযোগ নাদিম হত্যা মামলার আসামিদের চার্জশিটে অন্তর্ভুক্তির দাবি ত্রিশালে ১ কেজি গাঁজাসহ মাদক কারবারি গ্রেপ্তার সোমবার সকাল ১০টায় এসএসসি ও সমমানের ফল প্রকাশ জো বাইডেনের শরীরে ছড়িয়ে পড়েছে ‘চরম যন্ত্রণাদায়ক’ ক্যানসার জুলাই শহীদদের স্বপ্নের বাংলাদেশ গড়তে সবাইকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে: শফিকুর রহমান মেসির ক্যারিয়ার বদলে দেওয়া সেই সিদ্ধান্তের নেপথ্যে ছিলেন বাবা হোর্হে ৫ দিনের সফরে দক্ষিণ সুদান ও আবেই গেলেন সেনাপ্রধান
বিজ্ঞাপন :
জেলা-উপজেলা ও বিভাগীয় চীফ নিয়োগ দেয়া হচ্ছে। সাংবাদিকতায় আগ্রহীরা দ্রুত যোগাযোগ করুন। পরীক্ষামূলক সম্প্রচার ও নিবন্ধন প্রক্রিয়াধীন । সম্পদক-ইমদাদুল হক তৈয়ব-01711576603, সিভি পাঠান এই ইমেইলে- editor.manobjibon@gmail.com

৬ মাসে ২৫৭টি সহিংসতার ভয়ংকর চিত্র: নিরাপত্তাহীনতা ও অস্তিত্ব সংকটে সংখ্যালঘুরা

  • Reporter Name
  • সময়: ০২:৪৪:৫৮ অপরাহ্ন, শনিবার, ৮ অগাস্ট ২০২৬
  • ১০ Time View

মানিক লাল ঘোষ

“রাষ্ট্র যখন তার নিজ ঘরের কোণে কান্নার আওয়াজ শুনতে পায় না, তখন সেই অট্টালিকা দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে না। আজ স্বাধীন দেশের মাটিতে দাঁড়িয়ে নিজের অস্তিত্বের জন্য বুক চাপড়ে কান্নার এই দৃশ্য আমাদের জাতীয় বিবেকের কাছে এক চিরন্তন ও লজ্জাজনক প্রশ্ন হয়ে বিঁধছে।”

বাংলাদেশ হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদের সাম্প্রতিক সংবাদ সম্মেলনে প্রকাশিত তথ্য কেবল কিছু নির্মোহ পরিসংখ্যান নয়; এটি একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের ভিত্তি কাঁপিয়ে দেওয়ার মতো এক দুঃসহ বাস্তবতার নির্মম দলিল। সংগঠনটির তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে (জানুয়ারি থেকে জুন) দেশের বিভিন্ন প্রান্তে অন্তত ২৫৭টি সাম্প্রদায়িক সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে, যার শিকার হয়েছেন ২৬১ জন মানুষ। রক্তে ভেজা এই পরিসংখ্যান আজ নতুন বাংলাদেশে প্রতিটি নাগরিকের সমান অধিকার ও পূর্ণ নিরাপত্তার মৌলিক দাবির মুখে এক বিরাট ও প্রলম্বিত প্রশ্নচিহ্ন এঁকে দিয়েছে।

প্রকাশিত তথ্যের গভীরতা আরও বেশি শিউরে ওঠার মতো। বছরের প্রথম অর্ধেকে ঘটে যাওয়া এসব ঘটনার মধ্যে ৪০টি পৃথক হত্যাকাণ্ডে প্রাণ হারিয়েছেন ৪৪ জন সংখ্যালঘু নাগরিক। শুধু জীবন কেড়ে নেওয়ার লোমহর্ষক ঘটনাই নয়; বরং সংখ্যালঘু নারীদের ওপর ৫টি ধর্ষণ ও সংঘবদ্ধ ধর্ষণ, উপাসনালয়ে হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাটের ৬২টি ঘটনা এবং উপাসনালয়ের জমি দখলের ১৫টি ঘটনা নথিভুক্ত করা হয়েছে।

পাশাপাশি, বাড়িঘর ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে হামলা, ভাঙচুর, লুটপাট ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটেছে ৪৭টি। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে জোরপূর্বক সম্পত্তি দখল (২১টি), অপহরণ, চাঁদা দাবি ও নির্যাতন (১০টি) এবং ধর্ম অবমাননার মিথ্যা অভিযোগে গ্রেপ্তার ও নির্যাতনের (৯টি) মতো ঘটনাগুলো। সংখ্যালঘুরা সব সরকারের আমলেই কম-বেশি নির্যাতিত হয়ে আসছেন।

২০২৪ সালের ৫ আগস্ট রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর সংখ্যালঘুদের ওপর নির্যাতনের নতুন করে ভয়াবহতা নেমে আসে। বিগত অন্তর্বর্তীকালীন আমলের মতো বর্তমান বিএনপি সরকারের শাসনকালেও সংখ্যালঘুদের ওপর নির্যাতনের সেই পরিচিত স্টিম রোলার অবিরত সচল রয়েছে। রাজনৈতিক ক্ষমতার হাতবদল ঘটেছে ঠিকই, কিন্তু মাঠপর্যায়ে বিচারহীনতার সংস্কৃতি, অপরাধীদের রাজনৈতিক বা সামাজিক আশ্রয়-প্রশ্রয় পাওয়ার পুরোনো প্রবণতা এবং প্রশাসনের কাঠামোগত উদাসীনতা একটুও বদলায়নি।

আরও পড়ুনঃ  খুলনায় ৩,৯৫৮ পিস ইয়াবাসহ চার মাদক ব্যবসায়ী গ্রেপ্তার

নীতিনির্ধারকরা বারবার অসাম্প্রদায়িক ও সাম্যভিত্তিক রাষ্ট্রের স্লোগান দিলেও বাস্তবের জমিনে সংখ্যালঘুরা প্রতিনিয়ত নিরাপত্তাহীনতা, আতঙ্ক ও অস্তিত্ব সংকটে ভুগছেন। অপরাধীদের বিরুদ্ধে দ্রুত ও দৃশ্যমান প্রশাসনিক বা আইনগত ব্যবস্থা না নেওয়ার কারণে দুর্বৃত্তদের মনোবল দিন দিন আরও চাঙ্গা হয়ে উঠছে।

একটি রাষ্ট্রে বৈষম্য দূর করতে হলে শুধু মুখের বুলি যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন সুদৃঢ় রাজনৈতিক সদিচ্ছা এবং আইনের কঠোর প্রয়োগ। রাষ্ট্র যদি তার প্রতিটি নাগরিকের জানমালের পূর্ণ নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ব্যর্থ হয়, তবে যেকোনো রাজনৈতিক পরিবর্তন বা উন্নয়নের বয়ান সম্পূর্ণ অর্থহীন হয়ে পড়ে।

সময় ফুরিয়ে যাওয়ার আগেই সরকারকে এই ভয়ংকর পরিসংখ্যানের অন্তর্নিহিত বার্তা উপলব্ধি করতে হবে এবং অপরাধীদের কঠোর শাস্তির আওতায় এনে প্রকৃত অসাম্প্রদায়িক ও আস্থার বাংলাদেশ গড়ে তোলার পথে দৃঢ় পদক্ষেপ নিতে হবে।

মানিক লাল ঘোষ: সাংবাদিক, কলামিস্ট ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক। ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়নের সাবেক সহ-সভাপতি।

Tag :
জনপ্রিয় নিউজ

বগুড়ায় দাড়িয়ে থাকা ট্রাকের পিছনে ধাক্কায় নিহত- ৩,আহত-২!

৬ মাসে ২৫৭টি সহিংসতার ভয়ংকর চিত্র: নিরাপত্তাহীনতা ও অস্তিত্ব সংকটে সংখ্যালঘুরা

সময়: ০২:৪৪:৫৮ অপরাহ্ন, শনিবার, ৮ অগাস্ট ২০২৬

মানিক লাল ঘোষ

“রাষ্ট্র যখন তার নিজ ঘরের কোণে কান্নার আওয়াজ শুনতে পায় না, তখন সেই অট্টালিকা দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে না। আজ স্বাধীন দেশের মাটিতে দাঁড়িয়ে নিজের অস্তিত্বের জন্য বুক চাপড়ে কান্নার এই দৃশ্য আমাদের জাতীয় বিবেকের কাছে এক চিরন্তন ও লজ্জাজনক প্রশ্ন হয়ে বিঁধছে।”

বাংলাদেশ হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদের সাম্প্রতিক সংবাদ সম্মেলনে প্রকাশিত তথ্য কেবল কিছু নির্মোহ পরিসংখ্যান নয়; এটি একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের ভিত্তি কাঁপিয়ে দেওয়ার মতো এক দুঃসহ বাস্তবতার নির্মম দলিল। সংগঠনটির তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে (জানুয়ারি থেকে জুন) দেশের বিভিন্ন প্রান্তে অন্তত ২৫৭টি সাম্প্রদায়িক সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে, যার শিকার হয়েছেন ২৬১ জন মানুষ। রক্তে ভেজা এই পরিসংখ্যান আজ নতুন বাংলাদেশে প্রতিটি নাগরিকের সমান অধিকার ও পূর্ণ নিরাপত্তার মৌলিক দাবির মুখে এক বিরাট ও প্রলম্বিত প্রশ্নচিহ্ন এঁকে দিয়েছে।

প্রকাশিত তথ্যের গভীরতা আরও বেশি শিউরে ওঠার মতো। বছরের প্রথম অর্ধেকে ঘটে যাওয়া এসব ঘটনার মধ্যে ৪০টি পৃথক হত্যাকাণ্ডে প্রাণ হারিয়েছেন ৪৪ জন সংখ্যালঘু নাগরিক। শুধু জীবন কেড়ে নেওয়ার লোমহর্ষক ঘটনাই নয়; বরং সংখ্যালঘু নারীদের ওপর ৫টি ধর্ষণ ও সংঘবদ্ধ ধর্ষণ, উপাসনালয়ে হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাটের ৬২টি ঘটনা এবং উপাসনালয়ের জমি দখলের ১৫টি ঘটনা নথিভুক্ত করা হয়েছে।

পাশাপাশি, বাড়িঘর ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে হামলা, ভাঙচুর, লুটপাট ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটেছে ৪৭টি। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে জোরপূর্বক সম্পত্তি দখল (২১টি), অপহরণ, চাঁদা দাবি ও নির্যাতন (১০টি) এবং ধর্ম অবমাননার মিথ্যা অভিযোগে গ্রেপ্তার ও নির্যাতনের (৯টি) মতো ঘটনাগুলো। সংখ্যালঘুরা সব সরকারের আমলেই কম-বেশি নির্যাতিত হয়ে আসছেন।

২০২৪ সালের ৫ আগস্ট রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর সংখ্যালঘুদের ওপর নির্যাতনের নতুন করে ভয়াবহতা নেমে আসে। বিগত অন্তর্বর্তীকালীন আমলের মতো বর্তমান বিএনপি সরকারের শাসনকালেও সংখ্যালঘুদের ওপর নির্যাতনের সেই পরিচিত স্টিম রোলার অবিরত সচল রয়েছে। রাজনৈতিক ক্ষমতার হাতবদল ঘটেছে ঠিকই, কিন্তু মাঠপর্যায়ে বিচারহীনতার সংস্কৃতি, অপরাধীদের রাজনৈতিক বা সামাজিক আশ্রয়-প্রশ্রয় পাওয়ার পুরোনো প্রবণতা এবং প্রশাসনের কাঠামোগত উদাসীনতা একটুও বদলায়নি।

আরও পড়ুনঃ  বদলগাছীতে প্রধান শিক্ষকের বিরুদ্ধে শিক্ষার্থীকে ধর্ষণচেষ্টার অভিযোগ, স্কুলে ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ

নীতিনির্ধারকরা বারবার অসাম্প্রদায়িক ও সাম্যভিত্তিক রাষ্ট্রের স্লোগান দিলেও বাস্তবের জমিনে সংখ্যালঘুরা প্রতিনিয়ত নিরাপত্তাহীনতা, আতঙ্ক ও অস্তিত্ব সংকটে ভুগছেন। অপরাধীদের বিরুদ্ধে দ্রুত ও দৃশ্যমান প্রশাসনিক বা আইনগত ব্যবস্থা না নেওয়ার কারণে দুর্বৃত্তদের মনোবল দিন দিন আরও চাঙ্গা হয়ে উঠছে।

একটি রাষ্ট্রে বৈষম্য দূর করতে হলে শুধু মুখের বুলি যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন সুদৃঢ় রাজনৈতিক সদিচ্ছা এবং আইনের কঠোর প্রয়োগ। রাষ্ট্র যদি তার প্রতিটি নাগরিকের জানমালের পূর্ণ নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ব্যর্থ হয়, তবে যেকোনো রাজনৈতিক পরিবর্তন বা উন্নয়নের বয়ান সম্পূর্ণ অর্থহীন হয়ে পড়ে।

সময় ফুরিয়ে যাওয়ার আগেই সরকারকে এই ভয়ংকর পরিসংখ্যানের অন্তর্নিহিত বার্তা উপলব্ধি করতে হবে এবং অপরাধীদের কঠোর শাস্তির আওতায় এনে প্রকৃত অসাম্প্রদায়িক ও আস্থার বাংলাদেশ গড়ে তোলার পথে দৃঢ় পদক্ষেপ নিতে হবে।

মানিক লাল ঘোষ: সাংবাদিক, কলামিস্ট ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক। ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়নের সাবেক সহ-সভাপতি।