Dhaka ০১:২৮ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ১৭ জুলাই ২০২৬, ১ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
শিরনাম:
আলোকিত জীবনের প্রতীক শায়খ আহমাদুল্লাহ: জ্ঞান, দাওয়াহ ও মানবসেবায় এক অনন্য অধ্যায় আইনি প্রক্রিয়ায় মান্দায় গাছ অপসারণ: সড়ক প্রশস্ত ও ফসলি জমি রক্ষার উদ্যোগ হরিণাকুণ্ডুতে নানা আয়োজনে ‘জুলাই শহীদ দিবস’ পালিত, সমাধিস্তুপে শ্রদ্ধাঞ্জলি ও আলোচনা সভা চট্টগ্রামে সড়ক সম্প্রসারণের সুফল আঁটকে গেছে দখল ও অবৈধ পার্কিংয়ে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান হত্যাকাণ্ড: ৪৫ বছর পর গ্রেপ্তার সাবেক মেজর মো. মোজাফফর হোসেন ৪৫ বছর পর গ্রেপ্তার জিয়াউর রহমান হত্যা মামলার মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত মেজর (অব.) মোজাফফর আটক ফেনী চ্যারিটি ফাউন্ডেশনের পক্ষ থেকে জেলা প্রশাসক ও পুলিশ সুপার কে ফুলের শুভেচ্ছা টেক্সটাইল খাত বাঁচাতে বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে বিটিএমএর ১০ দফা দাবি মসজিদের মাইকে ঘোষণা, পুলিশের ওপর হামলার অভিযোগ; আহত ওসিসহ ২ ময়মনসিংহ মেডিকেলে র‍্যাব-১৪-এর অভিযান দালাল চক্রের ১৪ সদস্য আটক
বিজ্ঞাপন :
জেলা-উপজেলা ও বিভাগীয় চীফ নিয়োগ দেয়া হচ্ছে। সাংবাদিকতায় আগ্রহীরা দ্রুত যোগাযোগ করুন। পরীক্ষামূলক সম্প্রচার ও নিবন্ধন প্রক্রিয়াধীন । সম্পদক-ইমদাদুল হক তৈয়ব-01711576603, সিভি পাঠান এই ইমেইলে- editor.manobjibon@gmail.com

১৯৭১ থেকে অদ্যাবধি: বিজয়ী বাংলাদেশের অর্জন, সংকট ও ভবিষ্যৎ পথচলা

  • Reporter Name
  • সময়: ১১:১২:২৯ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ১৬ ডিসেম্বর ২০২৫
  • ২১৯ Time View

 

অ্যাডভোকেট মোঃ কামরুজ্জামান ভূঁইয়া,

১৯৭১ সাল বাংলাদেশের ইতিহাসে শুধু একটি সাল নয়—এটি একটি জাতির পুনর্জন্মের ঘোষণা। নয় মাসের রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধ, ত্রিশ লাখ শহীদের আত্মত্যাগ, দুই লাখ মা-বোনের সম্ভ্রমহানি এবং কোটি মানুষের উদ্বাস্তু জীবনের মধ্য দিয়ে জন্ম নেয় স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশ। এই স্বাধীনতার মূল চেতনা ছিল—স্বাধীনতা, সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক ন্যায়বিচার। আজ প্রশ্ন উঠছে—বিজয়ের এত বছর পর আমরা কোথায় দাঁড়িয়ে আছি?

স্বাধীনতার পরপরই বাংলাদেশকে মোকাবিলা করতে হয় ভয়াবহ বাস্তবতা। যুদ্ধবিধ্বস্ত অর্থনীতি, ধ্বংসপ্রাপ্ত অবকাঠামো, দুর্ভিক্ষ ও প্রশাসনিক অরাজকতা ছিল তখনকার নিত্যদিনের চিত্র। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে সংবিধান প্রণয়ন, রাষ্ট্রের মৌলিক কাঠামো নির্মাণ এবং আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি অর্জনের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ একটি রাষ্ট্র হিসেবে দাঁড়াতে শুরু করে। ১৯৭২ সালের সংবিধানে গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র, জাতীয়তাবাদ ও ধর্মনিরপেক্ষতা—এই চার মূলনীতির সংযোজন ছিল জাতির ভবিষ্যৎ দর্শনের ভিত্তি।

তবে ১৯৭৫ সালের রাজনৈতিক বিপর্যয় বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক অভিযাত্রাকে দীর্ঘ সময়ের জন্য বাধাগ্রস্ত করে। সামরিক শাসন, রাজনৈতিক অস্থিরতা ও ক্ষমতার দ্বন্দ্ব রাষ্ট্রের স্বাভাবিক বিকাশে ছেদ ঘটায়। নব্বইয়ের গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হলেও রাজনৈতিক সংস্কৃতি আজও সহনশীলতা ও জবাবদিহিতার ঘাটতিতে ভুগছে।

অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে বাংলাদেশ আজ এক ভিন্ন বাস্তবতার নাম। একসময়ের ‘তলাবিহীন ঝুড়ি’ আজ নিম্ন-মধ্যম আয়ের দেশে উন্নীত। তৈরি পোশাক শিল্প, প্রবাসী আয়, কৃষিতে স্বয়ংসম্পূর্ণতা ও অবকাঠামোগত উন্নয়ন অর্থনীতিকে গতিশীল করেছে। পদ্মা সেতু, মেট্রোরেল, বিদ্যুৎ উৎপাদনে অগ্রগতি জাতির সক্ষমতার পরিচয় বহন করে। দারিদ্র্যের হার কমেছে, মাথাপিছু আয় বেড়েছে—এগুলো নিঃসন্দেহে বিজয়ের গল্প।

তবে এই উন্নয়নের আড়ালে রয়েছে গভীর বৈষম্য। দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি, কর্মসংস্থানের সংকট, আয়বৈষম্য এবং মধ্যবিত্তের ক্রমাগত সংকোচন সামাজিক অস্থিরতা তৈরি করছে। উন্নয়নের সুফল সবার কাছে সমানভাবে পৌঁছাচ্ছে না—এটাই আজকের বড় বাস্তবতা।

মানবাধিকার ও সুশাসনের প্রশ্নে বাংলাদেশ এখনও বড় চ্যালেঞ্জের মুখে। নারী ও শিশু নির্যাতন, শ্রমিক অধিকার লঙ্ঘন, বিচারহীনতা এবং মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। স্বাধীনতার মূল চেতনা তখনই অর্থবহ হয়, যখন রাষ্ট্র নাগরিকের অধিকার নিশ্চিত করতে পারে। আইনের শাসন শক্তিশালী না হলে উন্নয়ন টেকসই হয় না—এই সত্য বারবার আমাদের স্মরণ করিয়ে দিচ্ছে বাস্তবতা।

আরও পড়ুনঃ  আলোকিত জীবনের প্রতীক শায়খ আহমাদুল্লাহ: জ্ঞান, দাওয়াহ ও মানবসেবায় এক অনন্য অধ্যায়

শিক্ষা ও স্বাস্থ্যখাতে অগ্রগতি থাকলেও গুণগত মান এখনো প্রশ্নবিদ্ধ। তরুণ প্রজন্ম আজ শিক্ষিত হলেও কর্মসংস্থানের নিশ্চয়তা পাচ্ছে না। এর ফলে হতাশা, মেধাপাচার ও সামাজিক অবক্ষয় বাড়ছে। স্বাধীনতার চেতনাকে ধারণ করতে হলে এই তরুণদের জন্য অর্থবহ ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করাই রাষ্ট্রের অন্যতম দায়িত্ব।

ডিজিটাল বাংলাদেশ ধারণা রাষ্ট্র পরিচালনায় নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছে। প্রশাসনিক সেবা সহজ হয়েছে, তথ্যপ্রযুক্তির ব্যবহার বেড়েছে। তবে একই সঙ্গে ডিজিটাল নিরাপত্তা, গোপনীয়তা ও নাগরিক স্বাধীনতা রক্ষার প্রশ্নও সামনে এসেছে। প্রযুক্তি যেন নিয়ন্ত্রণের হাতিয়ার না হয়ে নাগরিক ক্ষমতায়নের মাধ্যম হয়—সেদিকে নজর দেওয়া জরুরি।

বিজয়ী বাংলাদেশ মানে শুধু অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি নয়; বিজয় মানে ন্যায়বিচার, মানবিকতা ও মর্যাদাপূর্ণ জীবন। ১৯৭১ আমাদের শিখিয়েছে—অন্যায়ের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোই জাতির প্রকৃত শক্তি। আজকের বাংলাদেশ যদি সেই চেতনাকে বাস্তব নীতিতে রূপ দিতে পারে, তবেই স্বাধীনতার বিজয় হবে পূর্ণতা পাবে।

 অ্যাডভোকেট মোঃ কামরুজ্জামান ভূঁইয়া
লেখক ও গবেষক
দৈনিক মানবজীবন 

Tag :
জনপ্রিয় নিউজ

আলোকিত জীবনের প্রতীক শায়খ আহমাদুল্লাহ: জ্ঞান, দাওয়াহ ও মানবসেবায় এক অনন্য অধ্যায়

১৯৭১ থেকে অদ্যাবধি: বিজয়ী বাংলাদেশের অর্জন, সংকট ও ভবিষ্যৎ পথচলা

সময়: ১১:১২:২৯ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ১৬ ডিসেম্বর ২০২৫

 

অ্যাডভোকেট মোঃ কামরুজ্জামান ভূঁইয়া,

১৯৭১ সাল বাংলাদেশের ইতিহাসে শুধু একটি সাল নয়—এটি একটি জাতির পুনর্জন্মের ঘোষণা। নয় মাসের রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধ, ত্রিশ লাখ শহীদের আত্মত্যাগ, দুই লাখ মা-বোনের সম্ভ্রমহানি এবং কোটি মানুষের উদ্বাস্তু জীবনের মধ্য দিয়ে জন্ম নেয় স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশ। এই স্বাধীনতার মূল চেতনা ছিল—স্বাধীনতা, সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক ন্যায়বিচার। আজ প্রশ্ন উঠছে—বিজয়ের এত বছর পর আমরা কোথায় দাঁড়িয়ে আছি?

স্বাধীনতার পরপরই বাংলাদেশকে মোকাবিলা করতে হয় ভয়াবহ বাস্তবতা। যুদ্ধবিধ্বস্ত অর্থনীতি, ধ্বংসপ্রাপ্ত অবকাঠামো, দুর্ভিক্ষ ও প্রশাসনিক অরাজকতা ছিল তখনকার নিত্যদিনের চিত্র। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে সংবিধান প্রণয়ন, রাষ্ট্রের মৌলিক কাঠামো নির্মাণ এবং আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি অর্জনের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ একটি রাষ্ট্র হিসেবে দাঁড়াতে শুরু করে। ১৯৭২ সালের সংবিধানে গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র, জাতীয়তাবাদ ও ধর্মনিরপেক্ষতা—এই চার মূলনীতির সংযোজন ছিল জাতির ভবিষ্যৎ দর্শনের ভিত্তি।

তবে ১৯৭৫ সালের রাজনৈতিক বিপর্যয় বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক অভিযাত্রাকে দীর্ঘ সময়ের জন্য বাধাগ্রস্ত করে। সামরিক শাসন, রাজনৈতিক অস্থিরতা ও ক্ষমতার দ্বন্দ্ব রাষ্ট্রের স্বাভাবিক বিকাশে ছেদ ঘটায়। নব্বইয়ের গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হলেও রাজনৈতিক সংস্কৃতি আজও সহনশীলতা ও জবাবদিহিতার ঘাটতিতে ভুগছে।

অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে বাংলাদেশ আজ এক ভিন্ন বাস্তবতার নাম। একসময়ের ‘তলাবিহীন ঝুড়ি’ আজ নিম্ন-মধ্যম আয়ের দেশে উন্নীত। তৈরি পোশাক শিল্প, প্রবাসী আয়, কৃষিতে স্বয়ংসম্পূর্ণতা ও অবকাঠামোগত উন্নয়ন অর্থনীতিকে গতিশীল করেছে। পদ্মা সেতু, মেট্রোরেল, বিদ্যুৎ উৎপাদনে অগ্রগতি জাতির সক্ষমতার পরিচয় বহন করে। দারিদ্র্যের হার কমেছে, মাথাপিছু আয় বেড়েছে—এগুলো নিঃসন্দেহে বিজয়ের গল্প।

তবে এই উন্নয়নের আড়ালে রয়েছে গভীর বৈষম্য। দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি, কর্মসংস্থানের সংকট, আয়বৈষম্য এবং মধ্যবিত্তের ক্রমাগত সংকোচন সামাজিক অস্থিরতা তৈরি করছে। উন্নয়নের সুফল সবার কাছে সমানভাবে পৌঁছাচ্ছে না—এটাই আজকের বড় বাস্তবতা।

মানবাধিকার ও সুশাসনের প্রশ্নে বাংলাদেশ এখনও বড় চ্যালেঞ্জের মুখে। নারী ও শিশু নির্যাতন, শ্রমিক অধিকার লঙ্ঘন, বিচারহীনতা এবং মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। স্বাধীনতার মূল চেতনা তখনই অর্থবহ হয়, যখন রাষ্ট্র নাগরিকের অধিকার নিশ্চিত করতে পারে। আইনের শাসন শক্তিশালী না হলে উন্নয়ন টেকসই হয় না—এই সত্য বারবার আমাদের স্মরণ করিয়ে দিচ্ছে বাস্তবতা।

আরও পড়ুনঃ  তারেক রহমান: শিক্ষাজীবন থেকে জাতীয় রাজনীতির নেতৃত্বে দীর্ঘ পথচলা

শিক্ষা ও স্বাস্থ্যখাতে অগ্রগতি থাকলেও গুণগত মান এখনো প্রশ্নবিদ্ধ। তরুণ প্রজন্ম আজ শিক্ষিত হলেও কর্মসংস্থানের নিশ্চয়তা পাচ্ছে না। এর ফলে হতাশা, মেধাপাচার ও সামাজিক অবক্ষয় বাড়ছে। স্বাধীনতার চেতনাকে ধারণ করতে হলে এই তরুণদের জন্য অর্থবহ ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করাই রাষ্ট্রের অন্যতম দায়িত্ব।

ডিজিটাল বাংলাদেশ ধারণা রাষ্ট্র পরিচালনায় নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছে। প্রশাসনিক সেবা সহজ হয়েছে, তথ্যপ্রযুক্তির ব্যবহার বেড়েছে। তবে একই সঙ্গে ডিজিটাল নিরাপত্তা, গোপনীয়তা ও নাগরিক স্বাধীনতা রক্ষার প্রশ্নও সামনে এসেছে। প্রযুক্তি যেন নিয়ন্ত্রণের হাতিয়ার না হয়ে নাগরিক ক্ষমতায়নের মাধ্যম হয়—সেদিকে নজর দেওয়া জরুরি।

বিজয়ী বাংলাদেশ মানে শুধু অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি নয়; বিজয় মানে ন্যায়বিচার, মানবিকতা ও মর্যাদাপূর্ণ জীবন। ১৯৭১ আমাদের শিখিয়েছে—অন্যায়ের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোই জাতির প্রকৃত শক্তি। আজকের বাংলাদেশ যদি সেই চেতনাকে বাস্তব নীতিতে রূপ দিতে পারে, তবেই স্বাধীনতার বিজয় হবে পূর্ণতা পাবে।

 অ্যাডভোকেট মোঃ কামরুজ্জামান ভূঁইয়া
লেখক ও গবেষক
দৈনিক মানবজীবন