ফারজানা ইসলাম
মানবসভ্যতার অগ্রযাত্রায় নারী ও পুরুষ সমান অবদান রাখলেও আজকের আধুনিক সমাজে নারীরা এখনও নানা সমস্যার মধ্য দিয়ে বেঁচে আছেন। প্রযুক্তির উন্নয়ন, শিক্ষার প্রসার কিংবা অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি সত্ত্বেও নারীরা প্রতিদিন বৈষম্য, সহিংসতা ও নিরাপত্তাহীনতার মুখোমুখি হচ্ছেন। সবচেয়ে বেদনাদায়ক হলো, এ বছরও আমরা সংবাদপত্রে একের পর এক এমন খবর পড়েছি যেখানে নারীরা তাদের স্বামী কিংবা ঘনিষ্ঠ স্বজনদের হাতে খুন হয়েছেন। পরিবার হওয়া উচিত নিরাপদ আশ্রয়, অথচ অনেক নারীর জীবন সেখানেই ঝরে পড়ছে। এই পরিস্থিতি শুধু নারীর জন্য নয়, পুরো সমাজের জন্যই গভীর সংকটের ইঙ্গিত বহন করে।
নারীদের সবচেয়ে বড় সমস্যা হচ্ছে পারিবারিক সহিংসতা। স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে মতবিরোধ হলে বেশিরভাগ সময়েই নারীর উপর নির্যাতনের ঘটনা ঘটে। কখনও যৌতুকের জন্য, কখনও সন্দেহের কারণে আবার কখনও অকারণে নির্যাতনের শিকার হন তারা। সাম্প্রতিক কয়েকটি হত্যাকাণ্ড প্রমাণ করেছে, অনেক নারী নিজ গৃহেই নিরাপত্তাহীন। অথচ রাষ্ট্র ও সমাজ যথেষ্ট কার্যকর ভূমিকা পালন করছে না।
শুধু পারিবারিক সহিংসতা নয়, বাইরে বের হলেই নারীরা ভিন্ন রকম ঝুঁকির সম্মুখীন হন। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে শুরু করে কর্মক্ষেত্র ও রাস্তাঘাট সব জায়গায় নারীরা হয়রানি ও ভীতি নিয়ে চলাফেরা করেন। শিক্ষার ক্ষেত্রে বৈষম্যও এখনো পুরোপুরি কাটেনি। শহরে মেয়েদের লেখাপড়া এগোলেও গ্রামাঞ্চলে অনেক পরিবার এখনও মনে করে মেয়েদের বেশি পড়াশোনার প্রয়োজন নেই, বরং অল্প বয়সেই তাদের বিয়ে দিয়ে দেওয়া হয়। এর ফলে তারা উচ্চশিক্ষা ও কর্মজীবন থেকে বঞ্চিত হয়।
অর্থনৈতিক দিক থেকেও নারীরা এখনও পিছিয়ে। অনেক নারী কর্মক্ষম হলেও চাকরি বা ব্যবসার সমান সুযোগ পান না। পরিবারে আর্থিকভাবে নির্ভরশীল হয়ে থাকায় তারা সিদ্ধান্ত গ্রহণে স্বাধীনতা হারান এবং নির্যাতন সহ্য করতে বাধ্য হন। এর সঙ্গে মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যাও বাড়ছে। নিয়মিত চাপ অবমূল্যায়ন ও সহিংসতা নারীদের মধ্যে হতাশা উদ্বেগ এবং আত্মহত্যার প্রবণতা সৃষ্টি করছে।
প্রশ্ন হলো এসব সমস্যায় সরকারের ভূমিকা কোথায়? নারী নির্যাতন দমন আইন থাকলেও তার কার্যকর প্রয়োগ নেই। অপরাধীরা প্রভাব খাটিয়ে অনেক সময় সহজেই ছাড়া পেয়ে যায়। থানায় অভিযোগ জানাতে গেলেও নারীরা যথাযথ সহযোগিতা পান না। সরকারের পক্ষ থেকে নারীর অধিকার নিয়ে সচেতনতা সৃষ্টির কর্মসূচি খুব সীমিত। নির্যাতনের শিকার নারীদের পুনর্বাসন বা আর্থিক সহায়তার জন্যও পর্যাপ্ত উদ্যোগ নেই। ফলে সমস্যার গভীরতা আরও বাড়ছে।
এখন সময় এসেছে নারী সমস্যার সমাধানে বাস্তব পদক্ষেপ নেওয়ার। প্রথমত আইনের কঠোর প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে। নারী নির্যাতন বা হত্যার ঘটনায় অপরাধীদের সর্বোচ্চ শাস্তি দিতে হবে এবং বিচার প্রক্রিয়া যেন দীর্ঘসূত্রতায় না পড়ে তা দেখা জরুরি। দ্বিতীয়ত শিক্ষার প্রসার বাড়াতে হবে। প্রতিটি পরিবারকে সচেতন হতে হবে যাতে মেয়েরা সমানভাবে শিক্ষা লাভ করতে পারে। তৃতীয়ত অর্থনৈতিকভাবে নারীদের সক্ষম করতে হবে। সরকারি বেসরকারি বিভিন্ন উদ্যোগে কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করতে হবে ক্ষুদ্রঋণ ও প্রশিক্ষণ সুবিধা দিতে হবে।
এর পাশাপাশি সমাজের দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তনও অত্যন্ত জরুরি। নারীকে বোঝা নয় সমান অধিকার সম্পন্ন মানুষ হিসেবে দেখতে হবে। পরিবারে এবং সামাজিকভাবে নারীর প্রতি শ্রদ্ধা ও মূল্যায়ন নিশ্চিত করতে হবে। মানসিক স্বাস্থ্য সেবাও একটি বড় বিষয়। নির্যাতিত বা বিপর্যস্ত নারীদের জন্য কাউন্সেলিং, হেল্পলাইন এবং চিকিৎসা ব্যবস্থা থাকা প্রয়োজন।
সবশেষে বলা যায়, নারী ছাড়া সমাজের অগ্রগতি কল্পনা করা যায় না। অথচ প্রতিদিনই নারীরা স্বামী, স্বজন কিংবা সমাজের অন্যায় আচরণের শিকার হয়ে জীবন হারাচ্ছেন। এটি একটি ভয়াবহ বাস্তবতা। কেবল আইন করলেই হবে না, পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রকে একযোগে দায়িত্ব নিতে হবে। সরকারকে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে আইন প্রয়োগকারী সংস্থাকে দায়িত্বশীল হতে হবে এবং সমাজকে নারীর প্রতি শ্রদ্ধাশীল হতে হবে। নারীর প্রতি সহিংসতা বন্ধ হলেই সমাজে শান্তি উন্নয়ন ও অগ্রগতি সম্ভব হবে। অন্যথায় প্রতিটি নারী ভয়ের মধ্যে বেঁচে থাকবে, আর তার প্রভাব পড়বে পুরো জাতির ভবিষ্যতের ওপর।
Reporter Name 
























