দেশের চলমান বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকটে সবচেয়ে বেশি চাপে পড়েছে শিল্প খাত। উৎপাদন ব্যাহত হওয়া থেকে শুরু করে রপ্তানি পণ্য সময়মতো সরবরাহ করতে না পারায় উদ্বেগ বাড়ছে ব্যবসায়ীদের মধ্যে। এমন পরিস্থিতিতে সংকট মোকাবিলায় দ্রুত সরকারের সঙ্গে বসে কার্যকর পরিকল্পনা করার দাবি জানিয়েছেন ব্যবসায়ী, জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ও বিদ্যুৎ খাতের সংশ্লিষ্টরা।
সংশ্লিষ্টদের মতে, দীর্ঘমেয়াদি প্রকল্পের পাশাপাশি এখনই কিছু স্বল্পমেয়াদি পদক্ষেপ নেওয়া গেলে বিদ্যুৎ ও গ্যাসের সংকট অনেকটাই কমানো সম্ভব। এ জন্য তেল ও কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের উৎপাদন বাড়ানো, অবৈধ সংযোগ বন্ধ এবং দ্রুত রুফটপ সোলার স্থাপনের মতো প্রস্তাব সামনে এসেছে।
তেলভিত্তিক বিদ্যুৎ বাড়ানোর পরামর্শ
বাংলাদেশ প্রাইভেট পাওয়ার প্রডিউসার অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি ডেভিড হাসনাত বলেন, বর্তমানে তেলভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে প্রায় ২ হাজার ২০০ থেকে ২ হাজার ৩০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ পাওয়া যাচ্ছে। এসব কেন্দ্রের সক্ষমতা কাজে লাগানো গেলে উৎপাদন প্রায় ৫ হাজার মেগাওয়াট পর্যন্ত বাড়ানো সম্ভব।
তার মতে, তেলভিত্তিক কেন্দ্র থেকে উৎপাদন বাড়ালে গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের ওপর চাপ কমবে। এতে সাশ্রয় হওয়া গ্যাস শিল্পকারখানায় সরবরাহ করা সম্ভব হলে একসঙ্গে বিদ্যুৎ ও গ্যাস—দুই সংকটেই কিছুটা স্বস্তি মিলতে পারে।
তিনি আরও দাবি করেন, বর্তমান আন্তর্জাতিক বাজারদর বিবেচনায় তেলভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদন এলএনজিভিত্তিক উৎপাদনের তুলনায় প্রায় ৫ থেকে ৬ শতাংশ কম ব্যয়বহুল হতে পারে।
দ্রুত সমাধানে রুফটপ সোলার
তবে তেলভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র দীর্ঘ সময় চালিয়ে যাওয়ার সীমাবদ্ধতা রয়েছে। তাই দ্রুত বিকল্প হিসেবে সরকারি স্থাপনা ও অন্যান্য ভবনের ছাদে সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা স্থাপনের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মতে, সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনে আমদানি করা জ্বালানির প্রয়োজন হয় না। ফলে একদিকে বিদ্যুৎ সরবরাহ বাড়বে, অন্যদিকে বৈদেশিক মুদ্রার ওপরও চাপ তুলনামূলক কম থাকবে।
গ্যাস সংকটে শিল্পে বাড়ছে চাপ
বিদ্যুৎ ও গ্যাসের ঘাটতির কারণে শিল্পকারখানার উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। বিশেষ করে পোশাক খাতের উদ্যোক্তারা বলছেন, নির্ধারিত সময়ে উৎপাদন শেষ করতে না পারায় অনেক প্রতিষ্ঠানকে রপ্তানি পণ্যের শিপমেন্টের সময় পিছিয়ে দিতে হচ্ছে।
বিকেএমইএর সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বলেন, সরকার, জ্বালানি মন্ত্রণালয় ও ব্যবসায়ীদের মধ্যে দ্রুত একটি বৈঠক হওয়া প্রয়োজন। সংকট কতদিনে এবং কীভাবে কমানো সম্ভব, সে বিষয়ে স্পষ্ট পরিকল্পনা থাকলে শিল্প উদ্যোক্তারা নিজেদের উৎপাদন ও রপ্তানি পরিকল্পনা সে অনুযায়ী সাজাতে পারবেন।
বিজিএমইএর সভাপতি মাহমুদ হাসান খানও সংকট মোকাবিলায় তেলভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র চালুর পাশাপাশি কিছু গ্যাসভিত্তিক কেন্দ্রের উৎপাদন কমিয়ে শিল্পে গ্যাস সরবরাহ বাড়ানোর বিষয়টি বিবেচনার পরামর্শ দিয়েছেন।
অবৈধ সংযোগ বন্ধের দাবি
সংকটের মধ্যে অবৈধ গ্যাস ও বিদ্যুৎ ব্যবহার বন্ধের ওপরও জোর দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।
সিপিডির গবেষণা পরিচালক ড. খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম বলেন, বিদ্যুৎচালিত থ্রি-হুইলারসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে থাকা অবৈধ সংযোগ দ্রুত বিচ্ছিন্ন করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে যেসব পুরোনো গ্যাসক্ষেত্র থেকে দ্রুত উৎপাদন বাড়ানো সম্ভব, সেগুলোকে কাজে লাগানোর পরামর্শ দিয়েছেন তিনি।
ভোলাসহ দ্রুত উৎপাদনে আনা সম্ভব এমন গ্যাসক্ষেত্র থেকেও সরবরাহ বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়ার কথা বলেছেন তিনি।
তেল-কয়লা দিয়ে সাময়িক চাপ সামলানোর উদ্যোগ
পেট্রোবাংলার সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, সংকটের কারণে বর্তমানে গ্যাসে রেশনিং করা হচ্ছে। পাশাপাশি সরকারের নির্দেশনায় তেল ও কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে উৎপাদন বাড়ানোর চেষ্টা চলছে।
এফবিসিসিআই প্রশাসক মো. ফজলুল হকের মতে, এই মুহূর্তে বিদ্যুৎ সরবরাহ বাড়ানোই সবচেয়ে জরুরি। পূর্ণ সক্ষমতায় না চলা তেল ও কয়লাভিত্তিক কেন্দ্রগুলো চালু করা গেলে জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ বাড়ানো সম্ভব। তবে এ উদ্যোগ বাস্তবায়নে সরকারের আর্থিক সক্ষমতাও বিবেচনায় রাখতে হবে।
অংশীজনদের সঙ্গে বৈঠকের তাগিদ
বিশেষজ্ঞদের মতে, বর্তমান সংকট শুধু একটি খাতের সমস্যা নয়। বিদ্যুৎ, গ্যাস, শিল্প ও রপ্তানি—সবকিছুই এর সঙ্গে জড়িত। তাই সরকারের উচিত ব্যবসায়ী, বিদ্যুৎ উৎপাদনকারী, জ্বালানি বিশেষজ্ঞসহ সংশ্লিষ্ট সব পক্ষকে নিয়ে দ্রুত বৈঠক করা।
ড. খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম বলেন, বিভিন্ন পক্ষের স্বার্থ এক না হলেও তাদের মতামত শোনা জরুরি। এতে সংকটের বাস্তব চিত্র সম্পর্কে সরকার আরও পরিষ্কার ধারণা পাবে এবং বাস্তবসম্মত সিদ্ধান্ত নেওয়া সহজ হবে।
এখন যেসব পদক্ষেপ জরুরি
- তেল ও কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের উৎপাদন বাড়ানো
- প্রয়োজন অনুযায়ী গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদনে রেশনিং করা
- শিল্পকারখানায় গ্যাস সরবরাহ বাড়ানো
- অবৈধ গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা
- অবৈধভাবে বিদ্যুৎচালিত থ্রি-হুইলার চার্জ বন্ধ করা
- সরকারি স্থাপনাসহ বিভিন্ন ভবনে দ্রুত রুফটপ সোলার স্থাপন
- দ্রুত উৎপাদন সম্ভব এমন গ্যাসক্ষেত্র থেকে উত্তোলন বাড়ানো
- সরকার ও অংশীজনদের মধ্যে নিয়মিত সমন্বয় বৈঠক করা
সব মিলিয়ে, চলমান বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকটে শিল্প খাতকে স্বস্তি দিতে এখন দ্রুত সিদ্ধান্ত ও বাস্তবভিত্তিক পদক্ষেপ প্রয়োজন। ব্যবসায়ীদের প্রত্যাশা, শুধু সংকট মোকাবিলার উদ্যোগ নয়—কত দিনে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হবে এবং কোন পথে এগোনো হবে, সে বিষয়ে সরকার একটি পরিষ্কার রোডম্যাপ দেবে।
Reporter Name 






















