দেশের মানুষ যাতে উন্নত চিকিৎসার জন্য বিদেশে যেতে বাধ্য না হন, সে লক্ষ্যে সরকার ও চিকিৎসকদের সম্মিলিতভাবে কাজ করার আহ্বান জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। দেশের প্রতিটি মানুষের জন্য মানসম্মত ও সহজলভ্য স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করে একটি চিকিৎসাবান্ধব বাংলাদেশ গড়ে তোলার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন তিনি।
শনিবার (৮ আগস্ট) রাজধানীতে ডক্টরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ড্যাব)-এর ৩৭তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে আয়োজিত চিকিৎসক সমাবেশে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, সরকারের স্বাস্থ্যনীতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো রোগ হওয়ার পর চিকিৎসার পাশাপাশি রোগ প্রতিরোধে গুরুত্ব দেওয়া। মানুষের মধ্যে রোগের কারণ, প্রতিরোধ এবং স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন সম্পর্কে আগেভাগে সচেতনতা তৈরি করা গেলে অনেক রোগের প্রকোপ কমানো সম্ভব।
এ প্রসঙ্গে টমাস এডিসনের একটি বক্তব্যের উল্লেখ করে তারেক রহমান বলেন, ভবিষ্যতের চিকিৎসাব্যবস্থায় শুধু ওষুধ দেওয়ার মধ্যেই চিকিৎসকের দায়িত্ব সীমাবদ্ধ থাকবে না। রোগীর খাদ্যাভ্যাস, শারীরিক যত্ন এবং রোগের কারণ ও প্রতিরোধ সম্পর্কে সচেতন করাও চিকিৎসার গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠবে।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, রোগ প্রতিরোধকে গুরুত্ব দিয়ে সরকার আরও এক লাখ স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগের উদ্যোগ নিয়েছে। এসব স্বাস্থ্যকর্মী জনগণকে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা, রোগ প্রতিরোধ এবং স্বাস্থ্য সচেতনতার বিষয়ে সহযোগিতা করবেন। স্বাস্থ্যকর্মীদের যথাযথ প্রশিক্ষণ নিশ্চিত করতে চিকিৎসকদের নেতৃত্ব দেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।
চিকিৎসকদের রাজনীতি নিয়ে সতর্ক করলেন প্রধানমন্ত্রী
চিকিৎসকদের রাজনৈতিক সম্পৃক্ততার বিষয়েও বক্তব্য দেন তারেক রহমান। তিনি বলেন, গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত মানুষের জীবনের বিভিন্ন ক্ষেত্রকে প্রভাবিত করে। ফলে বিভিন্ন পেশার মানুষ নিজেদের মতাদর্শ অনুযায়ী রাজনৈতিকভাবে সচেতন বা সংগঠিত হতে পারেন।
তবে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড যেন পেশাগত দায়িত্ব পালনে কোনো ধরনের বাধা সৃষ্টি না করে, সে বিষয়ে চিকিৎসকদের সতর্ক থাকার আহ্বান জানান তিনি। প্রধানমন্ত্রীর ভাষায়, চিকিৎসকদের প্রধান দায়িত্ব হলো মানুষের স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা।
তিনি বলেন, প্রচলিত রাজনীতির বাইরে গিয়ে রাজনীতির গুণগত পরিবর্তন এখন সময়ের দাবি। এই পরিবর্তন শুধু একটি খাতে নয়, রাষ্ট্র ও সমাজের প্রতিটি ক্ষেত্রেই প্রয়োজন।
চিকিৎসকদের বিভিন্ন দাবির কথা তুলে ধরলেন
চিকিৎসকদের পক্ষ থেকে সরকারের কাছে উত্থাপিত বিভিন্ন দাবির কথাও তুলে ধরেন প্রধানমন্ত্রী। এর মধ্যে বিশেষ বিসিএসের মাধ্যমে দ্রুত পাঁচ হাজার চিকিৎসক নিয়োগ, সরকারি চাকরিতে চিকিৎসকদের বয়সসীমা ৩২ থেকে ৩৪ বছর করা, অবসরের বয়স ৬১ থেকে ৬৫ বছরে উন্নীত করা এবং চিকিৎসক ও রোগীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সময়োপযোগী স্বাস্থ্যসেবা সুরক্ষা আইন প্রণয়নের দাবি রয়েছে।
এ ছাড়া উপজেলা ও প্রত্যন্ত অঞ্চলে কর্মরত চিকিৎসকদের জন্য বিশেষ ভাতা ও প্রণোদনা, বেসরকারি খাতে কর্মরত চিকিৎসকদের জন্য ন্যায্য ও সুনির্দিষ্ট বেতনকাঠামো এবং রাজধানীকেন্দ্রিক স্বাস্থ্যব্যবস্থার পরিবর্তে বিভাগ, জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে বিশেষায়িত হাসপাতাল প্রতিষ্ঠার দাবিও রয়েছে বলে জানান তিনি।
তারেক রহমান বলেন, চিকিৎসকদের উত্থাপিত দাবিগুলো পুরোপুরি অযৌক্তিক নয়। তবে এসব দাবি বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে দেশের বর্তমান অর্থনৈতিক ও প্রশাসনিক পরিস্থিতিও বিবেচনায় নিতে হবে।
জ্বালানি সংকট নিয়েও কথা
সরকার দায়িত্ব নেওয়ার সময় দুর্বল অর্থনীতি, বিভাজিত প্রশাসন এবং ভঙ্গুর শিক্ষা ও স্বাস্থ্যব্যবস্থা পেয়েছে বলে মন্তব্য করেন প্রধানমন্ত্রী। এই পরিস্থিতি থেকে দেশকে ঘুরে দাঁড় করাতে সরকার কাজ করছে বলেও জানান তিনি।
বক্তব্যে দেশের বর্তমান জ্বালানি পরিস্থিতির কথাও তুলে ধরেন তারেক রহমান। তিনি বলেন, বিদ্যুৎ ও গ্যাস নিয়ে মানুষের ভোগান্তির বিষয়টি সরকার অস্বীকার করছে না। অতীতে জ্বালানি খাতে অপরিকল্পিতভাবে বিভিন্ন প্রকল্প ও নীতি নেওয়ার কারণে বর্তমানে দেশকে এর খেসারত দিতে হচ্ছে।
নির্দিষ্ট কিছু মহলকে সুবিধা দিতে নেওয়া অতীতের নীতি ও প্রকল্পের প্রভাব এখনো রয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, জ্বালানি খাতের বর্তমান পরিস্থিতি থেকে বেরিয়ে আসতে সরকার কাজ শুরু করেছে। অপরিকল্পিত প্রকল্পগুলো পুনর্বিবেচনা করে দীর্ঘমেয়াদি ও কার্যকর পরিকল্পনার আওতায় জ্বালানি খাতকে নিয়ে আসার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
গ্যাস, পেট্রোলসহ সামগ্রিক জ্বালানি সংকট ধীরে ধীরে কাটিয়ে উঠতে সরকার পরিকল্পনা করছে বলেও জানান প্রধানমন্ত্রী।
তিনি বলেন, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও জ্বালানিসহ দেশের গুরুত্বপূর্ণ খাতগুলোকে আরও সক্ষম ও স্বনির্ভর করতে বাস্তবমুখী পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে এবং তা বাস্তবায়নের কাজ শুরু হয়েছে।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, সরকারের লক্ষ্য শুধু চিকিৎসাসেবা সম্প্রসারণ নয়; বরং এমন একটি স্বাস্থ্যব্যবস্থা গড়ে তোলা, যেখানে দেশের মানুষ প্রয়োজনীয় ও উন্নত চিকিৎসা দেশেই পাবেন এবং চিকিৎসার জন্য বিদেশে যাওয়ার প্রয়োজন কমে আসবে।
Reporter Name 





















