
লেখক: অ্যাডভোকেট মোঃ কামরুজ্জামান ভূঁইয়া
আইনজীবী, লেখক ও সমাজবিশ্লেষক
ভূমিকা: নীরব কষ্টের দেশ বাংলাদেশ আজ পরিণত হয়েছে এক নীরব দীর্ঘশ্বাসের দেশে।রাস্তায় ভিক্ষুক বেড়েছে, বাজারে হাহাকার, অফিসে হতাশা, ঘরে ঘরে মানসিক চাপ।মনে হচ্ছে, পুরো জাতি যেন ক্লান্ত এক সংগ্রামী যাত্রায়—
যেখানে প্রতিদিন বেঁচে থাকাটাই এক ধরনের বিজয়, কিন্তু আনন্দহীন।
যে মানুষ একসময় হাসতো, এখন সে হিসাব করে শ্বাস নেয়।কারণ, চাল, ডাল, তেল, গ্যাস, ওষুধ—সবকিছুই নাগালের বাইরে চলে যাচ্ছে।সরকার বলে “অর্থনীতি ঘুরে দাঁড়াচ্ছে,”কিন্তু বাস্তবতা বলছে—মানুষ জীবনযুদ্ধে হেরে যাচ্ছে।
দ্রব্যমূল্য: নিয়ন্ত্রণহীন বাজারের দানব:প্রতিদিন বাজারে যাওয়া মানে এখন মানসিক যন্ত্রণার যাত্রা।যেখানে এক কেজি ডিম ১৮০ টাকা, চাল ৭৫ টাকা, পেঁয়াজ ১৪০ টাকা, তেল ২২০ টাকা,সেখানে একজন নিম্ন বা মধ্যম আয়ের মানুষ কীভাবে তার পরিবার চালাবে?
বাজারে সিন্ডিকেট, মজুতদারি, কালোবাজারি—সবাই সক্রিয়।কিন্তু নিয়ন্ত্রণ সংস্থা, প্রশাসন, কিংবা নীতিনির্ধারক—সবাই যেন অদৃশ্য দর্শক।
“বাজার মনিটরিং” কেবল মুখের কথা, বাস্তবে তা জনগণের কষ্টে কোনো প্রভাব ফেলছে না।
বেকারত্ব: স্বপ্নহীন তরুণ প্রজন্ম:বাংলাদেশের তরুণ প্রজন্ম এখন অদৃশ্য হতাশার জালে বন্দী।আছে, যোগ্যতা আছে, কিন্তু কাজ নেই।সরকারি চাকরিতে পদসংখ্যা কম, বেসরকারি খাতে বেতন কম আর নিরাপত্তা নেই।
একটি জরিপে দেখা গেছে (BIDS, ২০২৫) —বাংলাদেশে শিক্ষিত তরুণদের মধ্যে বেকারত্বের হার ৩৪%,যা দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে অন্যতম সর্বোচ্চ।এই তরুণেরা আজ নিজের দেশেই নিজেকে অপ্রয়োজনীয় মনে করছে।যার ফলে ব্রেইন ড্রেইন বা দেশত্যাগের প্রবণতা আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে।
দুর্নীতি ও প্রশাসনিক অব্যবস্থা: অদৃশ্য শৃঙ্খল:দুর্নীতি আজ এক মহামারি।
চাকরি পেতে ঘুষ, হাসপাতাল থেকে রিপোর্ট আনতে ঘুষ,প্রকল্প অনুমোদন, স্কুলে ভর্তিও এখন টাকার খেলা।“সার্ভিস চার্জ” নামের আবরণে এখন সরকারি সেবাও বাণিজ্যে পরিণত হয়েছে।
ফলে সাধারণ মানুষ রাষ্ট্র থেকে দূরে সরে যাচ্ছে,তাদের মনে হচ্ছে—“এই দেশটি হয়তো কেবল ক্ষমতাবানদের জন্য”।
নারীর নিরাপত্তা ও সামাজিক মূল্যবোধের অবক্ষয়:নারীরা আজ শহরে, গ্রামে, অফিসে, রাস্তায়—সবখানেই অনিরাপদ।বেশিরভাগ নারী গৃহস্থালির ব্যয় মেটাতে আজ কাজ করছে,কিন্তু নিরাপত্তা, সম্মান, কিংবা স্বীকৃতি—সবকিছুই অনিশ্চিত।
অপরদিকে সামাজিক মূল্যবোধও ভেঙে পড়ছে।ভালোবাসা, আস্থা, বন্ধুত্ব—সবই এখন আর্থিক লেনদেনে পরিণত।মায়ের ভালোবাসা টিকে আছে, কিন্তু সমাজের সহমর্মিতা হারিয়ে গেছে।
চিকিৎসা ও জীবনযাত্রা: অসুস্থ সমাজের প্রতিচ্ছবি সরকারি হাসপাতালগুলিতে চিকিৎসা সেবা প্রায় ধ্বংসপ্রায়।অন্যদিকে বেসরকারি হাসপাতালগুলো এখন ব্যবসায়িক কর্পোরেট হাউস।রোগী এখন “গ্রাহক”,চিকিৎসা এখন “প্যাকেজ”।অর্থ না থাকলে চিকিৎসা নেই,আর যারা অর্থ জোগায়, তাদের কষ্টের মূল্য কেউ বোঝে না।
মানুষের মানসিক অবস্থা: ক্লান্ত, বিভ্রান্ত ও হতাশআজকের মানুষ হাঁটছে, কিন্তু গন্তব্য জানে না।তারা কাজ করছে, কিন্তু ফল পাচ্ছে না।তারা দেশ ভালোবাসে, কিন্তু রাষ্ট্রের ভালোবাসা পাচ্ছে না।মানুষ আজ অবসাদগ্রস্ত সমাজে একাকী যাত্রী।বাড়ছে আত্মহত্যা, মানসিক রোগ, পারিবারিক বিভক্তি ও সামাজিক দূরত্ব।
রাষ্ট্রের নৈতিক দায়বদ্ধতা ও নতুন দিকনির্দেশনারাষ্ট্র শুধু আইন প্রয়োগকারী শক্তি নয়—
রাষ্ট্র হলো মানুষের স্বপ্ন রক্ষক।আজ সেই স্বপ্ন ভেঙে যাচ্ছে,কারণ নীতি, নৈতিকতা ও মানবিকতা—সবই হারিয়ে গেছে রাজনীতির কোলাহলে।
এখন সময় এসেছে—
১) বাজার সিন্ডিকেট ও দালালচক্র দমন,
২) কর্মসংস্থান সৃষ্টি,
৩) সরকারি সেবায় দুর্নীতি রোধ,
৪) নিম্ন ও মধ্যবিত্তদের জন্য ভর্তুকি ও সামাজিক নিরাপত্তা জোরদার করা,
৫) শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও নৈতিকতার পুনর্জাগরণ ঘটানো।
উপসংহার: নীরব মানুষের কণ্ঠস্বর হোক রাষ্ট্রের অগ্রাধিকার এই দেশটা শুধু ধনী ও ক্ষমতাবানদের জন্য নয়,বরং সেই সব সাধারণ মানুষের জন্য,যারা ভোরে বেরিয়ে রাতে ফিরে—দেশটাকে টিকিয়ে রাখে, অথচ নিজেরা হারিয়ে যায় অন্ধকারে।বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ নির্ভর করছেএই ক্লান্ত মানুষের মুখে আবার হাসি ফেরানোয়।
শেষ বাক্য: “মানুষ এখন চায় না বিলাসিতা, চায় কেবল একটু শান্তি, একটু সম্মান, আর বাঁচার নিশ্চয়তা।”
অ্যাডভোকেট মোঃ কামরুজ্জামান ভূঁইয়া আইনজীবী, 
























