
বিশেষ প্রতিনিধি:
সাধারণত আমাদের চেনা সমাজব্যবস্থায় ধর্মীয় ও সামাজিক প্রতিষ্ঠানগুলো, বিশেষ করে মাদ্রাসাগুলো পরিচালিত হয় সাধারণ মানুষের দান-অনুদানের ওপর ভিত্তি করে। যুগ যুগ ধরে এই চেনা রূপটি দেখেই অভ্যস্ত দেশের মানুষ। কিন্তু চেনা সেই ছক আর প্রচলিত ধারণার দেয়াল ভেঙে এক অভূতপূর্ব মানবিক দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে রাজধানীর অন্যতম দ্বীনি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ‘মাদ্রাসা আবু হুরায়রা’। সমাজ থেকে শুধু গ্রহণ করার চিরাচরিত প্রথা পেছনে ফেলে এবার উল্টো সমাজের খেটে খাওয়া, সুবিধাবঞ্চিত মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছে প্রতিষ্ঠানটি।
পবিত্র ঈদুল আজহা উপলক্ষে তারা আয়োজন করেছিল সম্পূর্ণ ভিন্নধর্মী ও অভিনব এক প্রকল্প—‘কুরবানির সামাজিকীকরণ’। যার মূল লক্ষ্য ছিল, কুরবানিকে শুধু পশু জবাইয়ের আনুষ্ঠানিকতায় সীমাবদ্ধ না রেখে এর অন্তর্নিহিত ত্যাগ, সহমর্মিতা ও সামাজিক সম্পৃতির প্রকৃত সৌন্দর্যকে সমাজের স্তরে স্তরে ছড়িয়ে দেওয়া।

আত্মমর্যাদার প্রতি পরম সম্মান: কোনো লাইন নেই, মাংস গেল দোরগোড়ায়
কুরবানির ঈদে মাংস বিতরণের চেনা দৃশ্যটি হলো—কোনো এক জায়গায় মাংস রাখা হয়, আর সমাজের দুস্থ মানুষরা এসে লাইনে দাঁড়িয়ে তা সংগ্রহ করেন। কিন্তু মাদ্রাসা আবু হুরায়রা হেঁটেছে সম্পূর্ণ ভিন্ন ও সুশৃঙ্খল পথে। মাদ্রাসা কর্তৃপক্ষ এবং সম্মানিত অভিভাবকদের যৌথ অর্থায়ন ও উদ্যোগে এই বছর মোট ৪টি গরু কুরবানি দেওয়া হয়। তবে চমকপ্রদ বিষয় হলো, এই মাংস কোনো প্রচলিত বা সাধারণ নিয়মে বণ্টন করা হয়নি।
মাদ্রাসার শিক্ষক ও আলেমগণ সরাসরি খুঁজে বের করেছেন সমাজের সেইসব ‘নীরব সংগ্রামী’ মানুষদের, যারা চরম অভাবের মধ্য দিয়ে দিনাতিপাত করলেও প্রবল আত্মসম্মানবোধের কারণে কখনোই কারও কাছে হাত পাততে পারেন না। তীব্র রোদে কিংবা বৃষ্টিতে ভিজে জীবনযুদ্ধে লড়াই করা অটো রিকশা চালক, দিনমজুর, বাসা-বাড়ির গৃহকর্মী, কিংবা নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা দারোয়ানদের মতো নিম্নআয়ের প্রায় ৫০০টি পরিবারের তালিকা তৈরি করা হয়। এরপর কোনো রকম প্রচার বা কোলাহল ছাড়াই, অত্যন্ত সুশৃঙ্খলভাবে আলেমরাই সরাসরি চলে যান সেইসব মানুষদের কর্মস্থল কিংবা ঘরের দোরগোড়ায় এবং পৌঁছে দেন কুরবানির মাংসের পবিত্র হাদিয়া।


সমাজকে কিছু ফিরিয়ে দেওয়ার তাগিদ
ধারাবাহিকভাবে গত দুই বছর ধরে এই নীরব অথচ শক্তিশালী মানবিক বিপ্লব চালিয়ে যাচ্ছে প্রতিষ্ঠানটি। বর্তমান সময়ে যখন অনেক সামাজিক বা দাতব্য কার্যক্রম কেবল ‘প্রচার সর্বস্ব’ বা ক্যামেরা-কেন্দ্রিক হয়ে পড়েছে, তখন মানুষের আত্মসম্মান ও সম্মান রক্ষা করে পাশে দাঁড়ানোর এই পদ্ধতিটি যেকোনো সমাজের জন্য এক বড় শিক্ষা।
এই ব্যতিক্রমী উদ্যোগের নেপথ্য দর্শন নিয়ে মাদ্রাসার প্রতিষ্ঠাতা পরিচালক মুফতি মোহাম্মদ মুসা খান এক আবেগঘন বার্তায় বলেন:
> “কুরবানির সামাজিকীকরণই আমাদের এই উদ্যোগের মূল লক্ষ্য। আমরা চেয়েছি প্রকৃত অভাবগ্রস্ত অথচ প্রবল আত্মমর্যাদাশালী মানুষদের কাছে এই আনন্দ পৌঁছে দিতে। মাদ্রাসা কেবল সমাজ থেকে শুধু নিয়ে যাবে—এই একমুখী ধারণার বাইরে গিয়ে আমরা সমাজকে কিছু ফিরিয়ে দিতে চাই।”
>
তিনি আরও জানান, এ বছর শত শত পরিবারের মুখে হাসি ফোটানো সম্ভব হয়েছে এবং ভবিষ্যতে আরও বড় পরিসরে এই মানবিক ও সামাজিক কার্যক্রম ছড়িয়ে দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে তাঁদের।


নতুন এক সমাজ বিনির্মাণের বার্তা
বিশ্লেষক ও এলাকাবাসীর মতে, এই উদ্যোগ শুধু কিছু মাংস বিলিয়ে দেওয়ার আয়োজন নয়; এটি মূলত সমাজে মানবিক মূল্যবোধের এক নীরব পাঠশালা। উৎসবের দিনে যখন নানাবিধ কারণে সুবিধাবঞ্চিত ও পরিশ্রমী মানুষদের আনন্দ ম্লান হয়ে থাকে, তখন তাদের ঘরের দরজায় কুরবানির উপহার পৌঁছে যাওয়াটা এক পরম তৃপ্তির।
দেশের প্রতিটি অঞ্চলের শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, মাদ্রাসা কিংবা সামর্থ্যবান ব্যক্তিবর্গ যদি এই ‘কুরবানির সামাজিকীকরণ’ মডেল বা দর্শনটি অনুসরণ করেন, তবে কুরবানির প্রকৃত শিক্ষা—ত্যাগ, ভাগাভাগি ও মানবিকতা কোনো নির্দিষ্ট গণ্ডিতে আটকে থাকবে না। তা ছড়িয়ে পড়বে সমাজের প্রতিটি স্তরে, আর আমাদের সমাজটা সত্যি সত্যিই হয়ে উঠবে আরও বেশি সুন্দর, সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতিময় এবং প্রগাঢ় মানবিক।
Reporter Name 



























