মোঃ শফিয়ার রহমান, পাইকগাছা (খুলনা) প্রতিনিধি:
আজ ২ আগস্ট, বিশ্ববরেণ্য বিজ্ঞানী, শিল্পোদ্যোক্তা ও মহাপুরুষ আচার্য প্রফুল্ল চন্দ্র (পি. সি.) রায়ের ১৬৫তম জন্মবার্ষিকী। ক্ষণজন্মা এই মহান বিজ্ঞানীর জন্মদিন উপলক্ষে খুলনা জেলা প্রশাসন, পাইকগাছা উপজেলা প্রশাসন ও রাড়ুলী ইউনিয়ন পরিষদের সার্বিক ব্যবস্থাপনায় দিনব্যাপী বর্ণাঢ্য নানা কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়েছে।
আজ সকালে খুলনার পাইকগাছায় বিজ্ঞানীর প্রতিকৃতিতে পুষ্পমাল্য অর্পণ, তাঁর স্মৃতিবিজড়িত জন্মস্থান পরিদর্শন, জীবন ও কর্মের ওপর আলোকচিত্র ও ভিডিও প্রদর্শনী এবং বিশেষ আলোচনা সভার আয়োজন করা হয়েছে।
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থাকবেন খুলনা বিভাগীয় কমিশনার মোঃ আবদুল্লাহ হারুন। সভায় সভাপতিত্ব করবেন খুলনা জেলা প্রশাসক হুরে জান্নাত এবং বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত থাকবেন পাইকগাছা উপজেলা নির্বাহী অফিসার ওয়াসিউজ্জামান চৌধুরী।
বিজ্ঞানী প্রফুল্ল চন্দ্র রায় ১৮৬১ সালের ২ আগস্ট খুলনা জেলার পাইকগাছা উপজেলার রাড়ুলী গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা হরিশচন্দ্র রায় চৌধুরী এবং মাতা ভুবন মোহিনী দেবী। পিতার প্রতিষ্ঠিত স্কুলেই তাঁর শিক্ষাজীবনের সূচনা। পরবর্তীতে পরিবার কলকাতায় স্থানান্তরিত হলে তিনি হেয়ার স্কুল ও অ্যালবার্ট স্কুলে পড়াশোনা করেন এবং সেখান থেকে এন্ট্রান্স পাস করেন। ১৮৯১ সালে তিনি মেট্রোপলিটন ইনস্টিটিউট থেকে এফ.এ. পাস করে প্রেসিডেন্সি কলেজে বিএ শ্রেণিতে ভর্তি হন।
১৮৮২ সালে সম্মানজনক ‘গিলক্রাইস্ট’ বৃত্তি লাভ করে তিনি ইংল্যান্ডের এডিনবার্গ বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হন এবং ১৮৮৫ সালে বিএসসি ডিগ্রি অর্জন করেন। ১৮৮৭ সালে মৌলিক গবেষণার জন্য ডি.এসসি উপাধিতে ভূষিত হন এবং একই বছর বিশ্ববিদ্যালয় কেমিক্যাল সোসাইটির সহ-সভাপতি নির্বাচিত হন।
ইউরোপ সফর শেষে ১৮৮৮ সালে দেশে ফিরে তিনি দীর্ঘ ২৭ বছর (১৮৮৯–১৯১৬) প্রেসিডেন্সি কলেজে এবং পরবর্তী ২০ বছর (১৯১৬–১৯৩৬) বিজ্ঞান কলেজে ‘পালিত অধ্যাপক’ হিসেবে শিক্ষকতা করেন। ১৮৯৫ সালে বিজ্ঞান জগতের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ আবিষ্কার ‘মারকিউরাস নাইট্রাইট’ উদ্ভাবন করে তিনি বিশ্বজুড়ে আলোড়ন সৃষ্টি করেন।
শুধু বিজ্ঞান গবেষণাই নয়, দেশীয় শিল্পের বিকাশেও তিনি অনন্য অবদান রাখেন। ১৮৯২ সালে মাত্র ৮০০ টাকা মূলধন নিয়ে প্রতিষ্ঠা করেন বিখ্যাত ‘বেঙ্গল কেমিক্যাল অ্যান্ড ফার্মাসিউটিক্যালস’। ১৯৩৭ সালে মানিকতলায় প্রতিষ্ঠা করেন ‘স্যার প্রফুল্ল চন্দ্র রিসার্চ ল্যাবরেটরি’ এবং ১৯৩৪ সালে খুলনার সোনাডাঙ্গায় বেকার যুবকদের কর্মসংস্থানের লক্ষ্যে প্রতিষ্ঠা করেন ‘প্রফুল্ল চন্দ্র কটন মিল লিমিটেড’, যা পরবর্তীতে খুলনা টেক্সটাইল মিল নামে পরিচিতি লাভ করে।
সমাজসেবাতেও তাঁর অবদান ছিল অসামান্য। ১৯০৮ সালে নিজ গ্রামে সেন্ট্রাল কো-অপারেটিভ ব্যাংক, বাগেরহাটের পিসি কলেজ, খুলনার এ.পি.সি. শিশু বিদ্যালয়সহ অসংখ্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠা ও আর্থিক সহায়তা প্রদান করেন।
বিজ্ঞান ও সমাজে অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ লন্ডনের ডারহাম বিশ্ববিদ্যালয় ছাড়াও ভারতবর্ষের মহীশূর, বেনারস ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় তাঁকে সম্মানসূচক ডক্টরেট ডিগ্রিতে ভূষিত করে। ব্রিটিশ সরকার তাঁকে ১৯১২ সালে ‘সিআইই (CIE)’ এবং ১৯২৯ সালে ‘নাইট (Sir)’ উপাধিতে সম্মানিত করে।
ভারতবর্ষের এই মহান বিজ্ঞানী ১৯৪৪ সালের ১৬ জুন, ৮২ বছর বয়সে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। তাঁর কর্ম ও আদর্শ আজও বিজ্ঞানচর্চা, শিক্ষা এবং দেশীয় শিল্পোন্নয়নে অনুপ্রেরণার উৎস হয়ে আছে।
Reporter Name 




























