শেখ মাহতাব হোসেন,
ডুমুরিয়া (খুলনা) প্রতিনিধি
দক্ষিণাঞ্চলের ব্যবসা-বাণিজ্য ও ভোমরা স্থলবন্দরের পণ্য পরিবহনের অন্যতম প্রধান ধমনী খুলনা-সাতক্ষীরা মহাসড়ক। তবে গুরুত্বপূর্ণ এই মহাসড়কের ডুমুরিয়া উপজেলার টিপনা নতুন রাস্তা বাজার ও চুকনগর বাজারসংলগ্ন বিস্তীর্ণ এলাকা এখন পরিণত হয়েছে চরম দুর্ভোগ ও আতঙ্কের অপর নামে।
মহাসড়কের এই অংশে পিচ ও সুরকি উঠে গিয়ে ছোট-বড় অসংখ্য বিপজ্জনক গর্তের সৃষ্টি হয়েছে। এতে প্রতিদিন সৃষ্টি হচ্ছে যানজট এবং বাড়ছে দুর্ঘটনার ঝুঁকি।
সরেজমিনে দেখা যায়, জিরো পয়েন্ট থেকে চুকনগর হয়ে সাতক্ষীরাগামী ব্যস্ত এই মহাসড়কে পণ্যবাহী ভারী ট্রাক, দূরপাল্লার বাস ও স্থানীয় ইজিবাইকগুলোকে ঝুঁকি নিয়ে গর্ত পার হতে হচ্ছে। বর্ষার পানি কিংবা সামান্য বৃষ্টিতেই এসব গর্ত জলাবদ্ধ হয়ে একেকটি মরণফাঁদে পরিণত হচ্ছে।
ভুক্তভোগীদের আক্ষেপ: ‘নিয়মিত ট্যাক্স দিয়েও জীবনের ঝুঁকি নিয়ে চলতে হয়’
খানাখন্দ ও দুর্ভোগের তীব্র চিত্র উঠে এসেছে পথচারী ও স্থানীয় যানচালকদের বক্তব্যে।
প্রতিদিন যাতায়াতকারী পথচারী আব্দুল গনি গাজী ও মো. ফরহাদ সরদার ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “টিপনা নতুন রাস্তা বাজার আর চুকনগরের এই মোড়গুলো দিয়ে হাঁটাই এখন কষ্টকর। গাড়ি গর্তে পড়লেই চাকা থেকে কাদাপানি ছিটকে পথচারীদের গায়ে এসে লাগে। তাছাড়া বাইক ও ইজিবাইক উল্টে প্রায়ই ছোট-বড় দুর্ঘটনা ঘটছে। আমরা নিয়মিত সরকারি ট্যাক্স-টোল দিই, কিন্তু সামান্য একটু চলাচলের ভালো রাস্তা পাব না—এটা কেমন কথা? রাস্তাটি দ্রুত মেরামত না করলে বড় কোনো প্রাণহানি ঘটে যেতে পারে।”
জনপ্রতিনিধির ক্ষোভ: ‘স্থায়ী সমাধান না হলে দুর্ভোগ কমবে না’
মহাসড়কের বেহাল দশা ও সাধারণ মানুষের ভোগান্তি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন ডুমুরিয়া উপজেলার আটলিয়া ইউনিয়নের চেয়ারম্যান শেখ হেলাল উদ্দিন।
তিনি বলেন, “খুলনা-সাতক্ষীরা মহাসড়ক শুধু ডুমুরিয়ার নয়, গোটা দক্ষিণাঞ্চলের অর্থনীতির প্রাণকেন্দ্র। অথচ টিপনা নতুন রাস্তা বাজার এবং চুকনগরের মতো গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক পয়েন্টে সড়কের আজ এই বেহাল দশা। প্রতিদিন হাজার হাজার মানুষ ও যানবাহন এই পথ দিয়ে যাতায়াত করে। খানাখন্দের কারণে এখানে প্রায়ই যানবাহন বিকল হয়ে দীর্ঘ যানজটের সৃষ্টি হয়।”
তিনি আরও বলেন, “মাঝে মাঝে জোড়াতালি দিয়ে ইট-বালু ফেলা হলেও বৃষ্টি হলে তা ধুয়ে গিয়ে পরিস্থিতি আরও করুণ হয়ে পড়ে। আমরা অবিলম্বে এই সড়কের টেকসই কার্পেটিং ও পূর্ণাঙ্গ সংস্কার দাবি করছি।”
সড়ক বিভাগের আশ্বাস: ‘দ্রুততম সময়ে সংস্কার কার্যক্রম শুরু হচ্ছে’
মহাসড়কের বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে খুলনা সড়ক ও জনপথ (সওজ) বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. আনিসুজ্জামান মাসুদের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি জানান, খুলনা-সাতক্ষীরা মহাসড়কের টিপনা নতুন রাস্তা ও চুকনগর অংশের ক্ষতিগ্রস্ত স্থানগুলোর বিষয়ে তারা অবগত রয়েছেন।
তিনি বলেন, “অতিরিক্ত ভারী যানবাহন চলাচল এবং আবহাওয়াজনিত কারণে সড়কের কিছু জায়গায় বিটুমিন উঠে গর্তের সৃষ্টি হয়েছে। ইতোমধ্যে আমাদের টিম সরেজমিনে পরিদর্শন করে ক্ষয়ক্ষতি মূল্যায়ন করেছে।”
তিনি আরও বলেন, “সড়কটিকে নিরাপদ করতে আমরা আপৎকালীন ‘প্যাচ ওয়ার্ক’ বা গর্ত ভরাটের কাজ দ্রুতই শুরু করব। পাশাপাশি পূর্ণাঙ্গ ও দীর্ঘমেয়াদি মেরামতের জন্য প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক ও টেন্ডার প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত করা হচ্ছে। দ্রুততম সময়ের মধ্যেই ঠিকাদার নিয়োগ করে স্থায়ী সংস্কারের কাজ শেষ করা হবে, যাতে জনগণের যাতায়াতে কোনো বিঘ্ন না ঘটে।”
স্থায়ী সমাধানের দাবি
দক্ষিণাঞ্চলের যোগাযোগের অন্যতম প্রধান এই মহাসড়কের বেহাল দশা শুধু যাতায়াত ব্যবস্থাকেই ব্যাহত করছে না, স্থানীয় অর্থনীতিতেও নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। জিরো পয়েন্ট থেকে চুকনগর পর্যন্ত অংশে অতিরিক্ত ভারী যানবাহন চলাচল নিয়ন্ত্রণের ঘাটতি ও সময়মতো রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে বারবার এমন দুর্ভোগের সৃষ্টি হচ্ছে বলে স্থানীয়দের অভিযোগ।
দুর্ভোগ কমাতে জরুরি ভিত্তিতে কয়েকটি পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন—
- জরুরি ভিত্তিতে সাময়িক মেরামত: ভারী বৃষ্টির কথা বিবেচনায় নিয়ে পাথর ও বিটুমিন দিয়ে বিপজ্জনক গর্তগুলো দ্রুত ভরাট করা।
- স্থায়ী ড্রেনেজ ব্যবস্থা: বাজারসংলগ্ন এলাকায় পানিনিষ্কাশন ব্যবস্থা উন্নত করা, যাতে বৃষ্টির পানি সড়কে জমে পিচ নষ্ট করতে না পারে।
- ওভারলোডিং নিয়ন্ত্রণ: পণ্যবাহী ট্রাকে নির্ধারিত ওজনের অতিরিক্ত মালামাল বহন রোধে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া।
- টেকসই সংস্কার: সাময়িক মেরামতের পাশাপাশি দ্রুত দীর্ঘমেয়াদি ও টেকসই সংস্কারকাজ সম্পন্ন করা।
স্থানীয়দের প্রত্যাশা, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নিয়ে খুলনা-সাতক্ষীরা মহাসড়কের এই গুরুত্বপূর্ণ অংশটি সংস্কার করবে এবং নিরাপদ ও স্বাভাবিক যান চলাচল নিশ্চিত করবে।
শেখ মাহতাব হোসেন ডুমুরিয়া, খুলনা 





















