শেখ মাহতাব হোসেন (ডুমুরিয়া, খুলনা)
খুলনা জেলার ডুমুরিয়া-ফুলতলা এবং যশোরের মণিরামপুর, অভয়নগর ও কেশবপুর—এই বিস্তীর্ণ অঞ্চলের মানুষের জন্য ‘জলাবদ্ধতা’ আর কোনো সাময়িক বা মৌসুমি দুর্যোগ নয়; বরং এটি দীর্ঘ চার দশকেরও বেশি সময় ধরে চেপে বসা এক স্থায়ী অভিশাপ। স্থানীয় জলবায়ু ও ভৌগোলিক বাস্তবতায় ভবদহ স্লুইসগেট আজ দীর্ঘস্থায়ী এই মানবিক ও অর্থনৈতিক সংকটের এক চরম প্রতীকে পরিণত হয়েছে। সাম্প্রতিক তথ্যানুযায়ী, ভবদহ ও সংলগ্ন এলাকায় প্রায় ১০ লক্ষাধিক মানুষ সরাসরি এই পলিজনিত কৃত্রিম জলাবদ্ধতায় বন্দি হয়ে জীবনযাপন করছেন।
সম্প্রতি এই সংকট নিরসনে একটি সুনির্দিষ্ট বৈজ্ঞানিক ও বিশ্লেষণধর্মী পর্যালোচনায় জলাবদ্ধতার মূল কারণ, অতীতের সীমাবদ্ধতা এবং সম্ভাব্য দীর্ঘমেয়াদী সমাধানের উপায় উঠে এসেছে।
বাংলাদেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম বিল ‘বিল ডাকাতিয়া’সহ ভবদহ অঞ্চলের হাজার হাজার হেক্টর কৃষিজমি বছরের সিংহভাগ সময় পানির নিচে তলিয়ে থাকে। মুক্তেশ্বরী, টেকা, শ্রী, হরি, ভদ্রা ও শালতা নদীর তলদেশ পলি জমে উঁচু হয়ে যাওয়ায় বিল থেকে স্বাভাবিক পানি নিষ্কাশনের পথ সম্পূর্ণ অবরুদ্ধ।
এর প্রত্যক্ষ প্রভাব পড়ছে অঞ্চলটির সামগ্রিক কাঠামোর ওপর—
অর্থনৈতিক বিপর্যয়: ফসল, মাছের ঘের ও সবজি চাষ বিনষ্ট হয়ে ধসে পড়েছে স্থানীয় গ্রামীণ অর্থনীতি।
অবকাঠামোগত ক্ষয়ক্ষতি: রাস্তাঘাট, বসতবাড়ি, হাটবাজার ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বছরের পর বছর প্লাবিত থাকছে।
স্বাস্থ্য ও সুপেয় পানির সংকট: স্যানিটেশন ব্যবস্থা ভেঙে পড়ায় এবং নিরাপদ পানির উৎসে দূষণ ঘটায় পানিবাহিত রোগের প্রাদুর্ভাব বাড়ছে।
সামাজিক অস্তিত্বের ঝুঁকি: প্রায় ২০ লাখ মানুষ প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে আর্থ-সামাজিক ও সাংস্কৃতিক অস্তিত্ব সংকটের মুখোমুখি।
মূল কারণ বিশ্লেষণ
পোল্ডার ব্যবস্থার অনভিপ্রেত ফল
১৯৬০-এর দশকে জোয়ার-ভাটা ও বন্যা থেকে সুরক্ষার জন্য নির্মিত পোল্ডার (বাঁধ-ঘেরা এলাকা) ব্যবস্থার কারণে জোয়ারের পলি প্লাবনভূমিতে ছড়িয়ে পড়তে পারেনি। ফলে পলি সরাসরি নদীখাতে জমে নদীগুলোকে ভরাট করে ফেলেছে।
পলি প্রবাহ ও অপরিকল্পিত অবকাঠামো
উজান থেকে মিষ্টি পানির প্রবাহ হ্রাস, অবৈধ নদী দখল, নদীর চরে ইটের ভাটা স্থাপন এবং বিলে অননুমোদিত নেট-পাটা দিয়ে মাছ চাষ নদীগুলোর নাব্যতা হ্রাসের প্রক্রিয়াকে দ্রুততর করেছে।
পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) বিভিন্ন সময়ে নেওয়া স্বল্পমেয়াদি খনন ও রেগুলেটর নির্মাণ প্রকল্পগুলো সঠিক রক্ষণাবেক্ষণ, তদারকি ও প্রাতিষ্ঠানিক সমন্বয়হীনতার অভাবে স্থায়ী ফল দিতে ব্যর্থ হয়েছে।
সমাধান হিসেবে ‘TRM’: সম্ভাবনা ও আস্থার সংকট
স্থানীয় কৃষকদের অভিজ্ঞতালব্ধ উদ্ভাবন টাইডাল রিভার ম্যানেজমেন্ট (TRM) বা জোয়ারাধার পদ্ধতি হলো কারিগরিভাবে সবচেয়ে কার্যকর সমাধান। এতে সাময়িকভাবে পোল্ডারের বাঁধ কেটে জোয়ারের পলিযুক্ত পানি বিলে প্রবেশ করতে দেওয়া হয়। ফলে পলিতে বিল উঁচু হয় এবং নদীখাত পলিমুক্ত হয়ে নাব্য থাকে।
আস্থার সংকট প্রধান বাধা
বিল ভায়না ও সাতক্ষীরার পাখিমারা বিলে TRM-এর সাফল্য থাকলেও সামাজিক ও প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থাপনার অভাবে এতে ক্ষোভ সৃষ্টি হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত জমির মালিকদের সময়মতো ও স্বচ্ছভাবে ক্ষতিপূরণ না দেওয়া এবং বৈজ্ঞানিক মডেলিং মেনে সমন্বিতভাবে কাজ না করায় স্থানীয় জনগণের মধ্যে আস্থার সংকট তৈরি হয়েছে।
সাম্প্রতিক অগ্রগতি ও সীমাবদ্ধতা
সম্ভাব্যতা সমীক্ষা: দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার অংশ হিসেবে ইনস্টিটিউট অব ওয়াটার মডেলিং (IWM)-কে সমীক্ষার দায়িত্ব দেওয়া হয়।
সেনাবাহিনীর তত্ত্বাবধানে খনন: ভবদহ ও সংলগ্ন ৫টি নদীর ৮১.৫ কিলোমিটার অংশ পুনঃখননে সেনাবাহিনী তদারকি করছে।
বাস্তবায়নে ধীরগতি: টেকসই TRM সিদ্ধান্ত গ্রহণে প্রশাসনিক বিলম্বের কারণে সম্প্রতি স্থানীয় সংগঠনগুলো দ্রুত কার্যকরের দাবি জানিয়ে স্মারকলিপি প্রদান করেছে।
সমন্বিত সমাধান-কাঠামো ও সুপারিশ
দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের এই অভিশাপ দূর করতে একটি ত্রি-মুখী পদক্ষেপ গ্রহণ করা জরুরি—
১. চলমান ৮১.৫ কিলোমিটার নদী পুনঃখনন কাজ দ্রুত শেষ করা।
২. তীব্র প্লাবিত বিলগুলোতে পাম্পের মাধ্যমে পানি নিষ্কাশন ও তাৎক্ষণিক ত্রাণ নিশ্চিত করা।
৩. খাল-নদীর অবৈধ দখল ও অননুমোদিত মাছের ঘের বা নেট-পাটা উচ্ছেদ করা।
মধ্যমেয়াদি পদক্ষেপ
IWM-এর সমীক্ষা অনুযায়ী বৈজ্ঞানিক মডেলিং মেনে ধাপে ধাপে বিলে TRM চালু করা।
ক্ষতিগ্রস্ত ভূমিমালিকদের জন্য আমলাতান্ত্রিক জটিলতামুক্ত, স্বচ্ছ ও দ্রুত ক্ষতিপূরণ তহবিল গঠন করা।
স্থানীয় পানি নিষ্কাশন সংগ্রাম কমিটি ও কৃষকদের প্রকল্প পরিচালনা কমিটিতে অন্তর্ভুক্ত করা।
দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা প্রয়োজন
জলাবদ্ধতা নিরসনে শুধু নদী খনন বা পাম্প বসানোর মতো বিচ্ছিন্ন উদ্যোগ যথেষ্ট নয়। নদী, বিল, খাল ও জলাভূমির স্বাভাবিক পানি প্রবাহকে বিবেচনায় নিয়ে দীর্ঘমেয়াদি সমন্বিত পানি ব্যবস্থাপনা পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে।
TRM বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে স্থানীয় জনগণের মতামত, ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের স্বার্থ এবং পরিবেশগত প্রভাবকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে। একই সঙ্গে নদীর নাব্যতা রক্ষা, দখল ও দূষণ বন্ধ এবং পানি নিষ্কাশনের পথ সচল রাখার বিষয়ে সংশ্লিষ্ট সব সংস্থার মধ্যে কার্যকর সমন্বয় প্রয়োজন।
দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের জলাবদ্ধতা শুধু একটি পানি নিষ্কাশন সমস্যা নয়; এটি কৃষি, অর্থনীতি, জনস্বাস্থ্য, পরিবেশ ও মানুষের জীবন-জীবিকার সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ত একটি দীর্ঘমেয়াদি সংকট। তাই সমস্যাটির স্থায়ী সমাধানে রাজনৈতিক সদিচ্ছার পাশাপাশি প্রয়োজন বৈজ্ঞানিক গবেষণা, কার্যকর প্রশাসনিক সমন্বয়, স্থানীয় জনগণের অংশগ্রহণ এবং স্বচ্ছ ক্ষতিপূরণ ব্যবস্থা।
বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ ও স্থানীয় বাস্তবতা বিবেচনায় নিয়ে নদী পুনঃখনন, পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা উন্নয়ন এবং বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে ধাপে ধাপে TRM বাস্তবায়ন করা গেলে ভবদহসহ দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের দীর্ঘদিনের জলাবদ্ধতা সংকট থেকে মানুষকে বের করে আনা সম্ভব হতে পারে। এখন প্রয়োজন দ্রুত, সমন্বিত ও টেকসই সিদ্ধান্ত গ্রহণ।
Reporter Name 
























