হাফিজ মাছুম আহমদ দুধরচকী
নাহমাদুহু ওয়া নুসাল্লি আলা রাসূলিহিল কারীম, আম্মা বা’দ।
মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের সমগ্র সৃষ্টি তথা বিশ্বমানবের ইহকালীন ও পরকালীন জীবনের সার্বিক কল্যাণ ও মুক্তির পয়গাম নিয়ে ৫৭০ খ্রিস্টাব্দে ১২ রবিউল আওয়াল সোমবার প্রভাতের সময় মহাবিশ্বে আগমন করেন প্রিয় নবী, শেষ নবী, রহমাতুল্লিল আলামিন, শান্তির অগ্রদূত ও মানবতার মুক্তির দিশারি হজরত মুহাম্মদ মোস্তফা (সা.)।
সৃষ্টির শুরু থেকেই উভয় জগতে আল্লাহ তায়ালা তাঁর সব রহমত ও দয়া এ নবীর অসিলায় প্রবাহিত করছেন। মহানবী (সা.)-এর আগমনের দিন পবিত্র ১২ রবিউল আওয়াল বিশ্বভুবনের জন্য নিঃসন্দেহে রহমত ও বরকতময়।
মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামিন পবিত্র কোরআনে ইরশাদ করেছেন, ‘হে নবী, আমি আপনাকে সারাবিশ্বের জন্য রহমত হিসেবে প্রেরণ করেছি।’ (সূরা আল-আম্বিয়া: ১০৭)
আল্লাহ রাব্বুল আলামিন সর্বশেষ ও শ্রেষ্ঠ নবী মুহাম্মদ (সা.)-কে পৃথিবীতে প্রেরণ করেছেন বিশ্ব তথা মানবজাতির জন্য রহমত হিসেবে। হজরত আদম (আ.)-এর মাধ্যমে দুনিয়ার বুকে প্রথম নবীর আগমন এবং হজরত মুহাম্মদ মোস্তফা (সা.)-এর আগমনের মাধ্যমে পৃথিবীতে নবী-রাসুলের আগমন পর্বের সমাপ্তি হয়েছে। মহানবী মুহাম্মদ (সা.)-এর পর পৃথিবীতে আর কোনো নবী আসবেন না।
তিনি হলেন সমগ্র বিশ্ববাসীর জন্য মনোনীত নবী। কিয়ামত পর্যন্ত যত মানুষ পৃথিবীতে আসবে, তারা তাঁর উম্মতের মধ্যেই গণ্য হবে। মুহাম্মদ (সা.)-এর আগে যেসব নবী-রাসুল (আ.) এসেছেন, তাঁদের বিশেষ সম্প্রদায়ের নবী-রাসুল হিসেবে পৃথিবীতে পাঠানো হয়েছিল। কিন্তু আখেরি নবীর আগমন ঘটেছে সমগ্র মানবজাতির জন্য।
মহানবী (সা.) দুনিয়ায় এসেছিলেন মিথ্যা থেকে মানুষকে দূরে রাখতে এবং সত্যের পথের অনুসারীদের আখিরাতের জীবনে পুরস্কৃত হওয়ার সুসংবাদ দিতে। পবিত্র কোরআনে আল্লাহ পাক ইরশাদ করেন, ‘আমি আপনাকে সমগ্র জাতির জন্য সুসংবাদদাতা ও সতর্ককারীরূপে পাঠিয়েছি, অধিকাংশ মানুষ তা জানে না।’ (সূরা সাবা: ২৮)
রাসুল (সা.)-এর আগমনের কথা পবিত্র কোরআনের পূর্ববর্তী আসমানি কিতাবগুলোতেও উল্লেখ করা হয়েছে। এ বিষয়ে পবিত্র কোরআনে বলা হয়েছে, ‘হে বনী ইসরাইল! আমি তোমাদের প্রতি আল্লাহর পাঠানো রাসুল, সত্যতা বিধানকারী সেই তাওরাতের, যা আমার আগে এসেছে, আর সুসংবাদদাতা এমন একজন রাসুলের যে আমার পরে আসবে, যার নাম হবে আহমদ।’ (সূরা আস-সফ: ৬)
সর্বশেষ ও সর্বশ্রেষ্ঠ নবী হজরত মুহাম্মদ (সা.) কোনো একটি বিশেষ দল বা সম্প্রদায়ের নবী ছিলেন না; তিনি ছিলেন সমগ্র বিশ্বের মানুষের জন্য বিশ্বনবী। কারণ তাঁর পর দুনিয়ায় আর কোনো নবীর আগমন ঘটবে না।
মহানবী (সা.) পৃথিবীতে আবির্ভূত হন এমন এক কঠিন সময়ে, যখন সমগ্র পৃথিবী আইয়ামে জাহেলিয়াতের মধ্যে নিমজ্জিত ছিল। কোথাও শান্তি ছিল না, স্বস্তি ছিল না। ধর্মের নামে অধর্ম বিরাজ করছিল সর্বত্র। শিরক ও কুফরের বেড়াজালে আবদ্ধ হয়ে পড়েছিল মানুষ।
নারীদের সম্ভ্রম লুণ্ঠিত হচ্ছিল অবলীলায়, কন্যাসন্তানকে জীবন্ত কবর দেওয়া হতো। মারামারি, হানাহানি, খুন-খারাবির উন্মত্ততায় গোটা সমাজ ছিল টালমাটাল। পৃথিবীর সেই করুণ অবস্থা নিরসনের জন্য আল্লাহ রাব্বুল আলামিন তাঁর প্রিয় হাবিব হজরত মুহাম্মদ (সা.)-কে ‘সিরাজুম মুনিরা’ বা প্রদীপ্ত চেরাগরূপে প্রেরণ করেন।
এ প্রসঙ্গে মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামিন পবিত্র কোরআনে ইরশাদ করেন, “হে নবী! নিশ্চয়ই আমি আপনাকে সাক্ষ্যদাতা, সুসংবাদদাতা ও সতর্ককারীরূপে প্রেরণ করেছি; আর আল্লাহর অনুমতিক্রমে তাঁরই দিকে আহ্বানকারীরূপে এবং প্রদীপ্ত চেরাগরূপে।” (সূরা আল-আহজাব: ৪৫-৪৬)
সমগ্র সৃষ্টির প্রতি স্রষ্টার এই মহান করুণার জন্য মানবকুল তাঁর কাছে ঋণী। পরবর্তী পর্যায়ে যার মাধ্যমে এই রহমত ও নিয়ামতের অধিকারী হয়েছে, সেই মহামানব হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর কাছেও মানবজাতি ঋণী। তিনি মানবজাতিকে জ্ঞান-বিজ্ঞান শিক্ষা দিয়েছেন এবং পবিত্র করেছেন।
সমগ্র মানবকুল প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে তাঁর কাছে ঋণী। কে তাঁকে স্বীকার করল, কে করল না—সে কথা এখানে গৌণ। তিনি সকল মানুষ, সকল নবী এবং সকল আসমানি কিতাবকে স্বীকার করেছেন। কাউকে অস্বীকার করার মতো মানসিক দুর্বলতা তাঁর মধ্যে ছিল না। তাই তিনি বিশ্বনবী, শ্রেষ্ঠ নবী (সা.)। সকল মানবিক আশা-আকাঙ্ক্ষার মূর্ত প্রতীক ছিলেন তিনি।
রাসুল (সা.)-এর মন ছিল আকাশের মতো উদার, সত্যের প্রতি অবিচল। জীবনে কোনো দিন কোনো প্রতিজ্ঞা ভঙ্গ করেননি। কোনো মিথ্যা তাঁকে স্পর্শ করতে পারেনি। দান, জ্ঞান, বিচার ও সহানুভূতিতে তিনি ছিলেন অনন্য দৃষ্টান্ত। তাঁর পরিকল্পনাশক্তি ছিল অসাধারণ, সংকল্পও ছিল দৃঢ়। ন্যায় ও সত্যের পরিকল্পনাকে কার্যকর করে মহান আল্লাহর হুকুম কায়েম করাই ছিল রাসুল (সা.)-এর অন্যতম লক্ষ্য।
বিশ্বের সব মানুষের কাছে দ্বীনে মুহাম্মদীর প্রকৃত দিকনির্দেশনা পৌঁছে দেওয়ার প্রক্রিয়া ও কার্যক্রমই পবিত্র ঈদে মিলাদুন্নবী (সা.)-এর অন্যতম শিক্ষা। বর্তমান মুসলিম উম্মাহর সংকটময় অবস্থা থেকে উত্তরণ এবং ইসলামের হারানো গৌরব পুনরুদ্ধারের প্রধান উপায় হচ্ছে প্রিয় নবীকে ভালোবাসা ও অনুসরণ করা।
যেহেতু রাসুলের প্রতি ভালোবাসাকে আল্লাহ তাঁর প্রতি ভালোবাসার মাপকাঠি হিসেবে ঘোষণা করেছেন, সেহেতু রাসুলপ্রেম আল্লাহপ্রাপ্তির অন্যতম পূর্বশর্ত। শুধু বাহ্যিক সুন্নাহ পালনই রাসুলপ্রেম নয়; বাহ্যিক সুন্নাহর সঙ্গে আন্তরিক ও আত্মিক সম্পর্কও থাকতে হবে। সেই আত্মিক সম্পর্কের ফলে প্রেমিকের দৃষ্টিতে শুধু প্রেমাস্পদই বিরাজ করে।
আল্লাহপাক বান্দার কল্যাণার্থে অসংখ্য নিয়ামত ও রহমত প্রদান করেছেন। তার মধ্যে সর্বোত্তম ও সর্বশ্রেষ্ঠ নিয়ামত ও রহমত হচ্ছে আমাদের প্রিয় নবীজির ইহধামে শুভাগমন। এই নিয়ামত ও রহমত পেয়ে কৃতজ্ঞতা প্রকাশের মধ্যেই রয়েছে ইহকালীন শান্তি ও পরকালীন মুক্তির পথ।
যেহেতু প্রিয় নবীর শুভাগমন জগদ্বাসীর প্রতি আল্লাহর বিশেষ রহমত, তাঁর পদাঙ্ক অনুসরণে বিভ্রান্ত মানবজাতি আলোর পথের সন্ধান পেয়েছে। গোমরাহির অতলগহ্বরে নিমজ্জিত দিকভ্রান্ত বনি আদম তাঁরই অসিলায় আশরাফুল মাখলুকাত তথা সৃষ্টির শ্রেষ্ঠ জাতি হিসেবে মর্যাদা পেয়েছে।
নির্যাতিত, নিষ্পেষিত ও লাঞ্ছিত মানবগোষ্ঠীকে তিনি চিরকল্যাণকর আদর্শের পথে আহ্বান করেছেন এবং সম্মান ও মর্যাদার উচ্চাসনে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। সুতরাং তাঁর আবির্ভাব উম্মতের জন্য কত বড় রহমত ও সর্বশ্রেষ্ঠ নিয়ামত, তা বলার অপেক্ষা রাখে না।
পবিত্র ঈদে মিলাদুন্নবী উদযাপন করে মহান রবের নিয়ামত প্রিয় নবীকে স্মরণ করে কৃতজ্ঞতা প্রকাশের মধ্যেই রয়েছে দুনিয়া ও আখিরাতের মুক্তির পথ ও পাথেয়। তাই মহানবী (সা.)-এর জীবনের সুমহান আদর্শের ওপর গভীর আলোকপাত করে মানবজীবনে তা বাস্তবায়নের প্রত্যয় নিতে হবে। তাহলেই তাঁর জীবনদর্শনের সঠিক মূল্যায়ন হবে।
রাসুলুল্লাহ (সা.) গোত্রীয় শাসনের স্বৈরাচারে দগ্ধ, মুষ্টিমেয় বিত্তশালীর শোষণে নিঃস্ব এবং সামাজিক দূরাচারে অতিষ্ঠ মানুষের মুক্তির স্বপ্ন দেখিয়েছেন। তিনি বঞ্চিত মানুষের অধিকার আদায়ের লক্ষ্যে তাওহিদের বাণী প্রচারের দায়ে স্বজাতির নির্যাতনে নিরুপায় হয়ে জন্মভূমি ছেড়ে মদিনায় হিজরত করতে বাধ্য হয়েছিলেন।
অতঃপর ঐতিহাসিক মদিনা সনদ প্রণয়নের মাধ্যমে ইহুদি, পৌত্তলিক, খ্রিস্টান ও মুসলমানদের নিয়ে মদিনায় একটি স্বাধীন-স্বতন্ত্র জাতি ও রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। অল্প সময়ের ব্যবধানে রাসুলের আদর্শিক জাগরণ সমগ্র আরবকে প্রভাবিত করে। রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, সামাজিক সুশাসন ও অর্থনৈতিক স্বাবলম্বন একটি সুদৃঢ় ভিত্তির ওপর প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল।
আজ যখন দেশের বিপুল মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে বসবাস করছে, যখন অন্ন-বস্ত্র-বাসস্থান-শিক্ষা-চিকিৎসার অভাব জনজীবনে প্রকট হয়ে উঠছে, যখন মানুষ একে অপরের দ্বারা নির্যাতিত ও অধিকারবঞ্চিত হচ্ছে—তখন ঈদে মিলাদুন্নবী (সা.)-এর শিক্ষা হোক এবং শপথ হোক রাসুল (সা.)-এর ভালোবাসার দাবিতে সংঘাত নয়; বরং তাঁর আদর্শের ভিত্তিতে ঐক্যবদ্ধ একটি শান্তিপূর্ণ সমাজ প্রতিষ্ঠা।
আমরা রাসুল (সা.)-এর সঙ্গে যত বেশি মহব্বতের সম্পর্ক গড়ে তুলতে পারব, যত বেশি দরুদ ও সালাম পাঠ করব, ততই বাতিল ও তাগুত আমাদের কাছ থেকে দূরে সরে যাবে।
পবিত্র ঈদে মিলাদুন্নবী (সা.) সবার জন্য হোক মুবারক—এটাই আমাদের প্রত্যাশা।
লেখক: বিশিষ্ট ইসলামী চিন্তাবিদ, লেখক ও কলামিস্ট হাফিজ মাছুম আহমদ দুধরচকী।
প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি: জকিগঞ্জ উপজেলা সচেতন নাগরিক ফোরাম, সিলেট।
সাবেক ইমাম ও খতীব: সিলেট নগরীর কদমতলী হযরত দরিয়া শাহ (রহ.) মাজার কেন্দ্রীয় জামে মসজিদ, সিলেট।
সাবেক প্রিন্সিপাল: হযরত শাহজালাল (রহ.) ৩৬০ আউলিয়া লতিফিয়া হাফিজিয়া মাদ্রাসা, উপশহর, সিলেট।
সাবেক প্রধান শিক্ষক: হযরত শাহজালাল (রহ.) লতিফিয়া দাখিল মাদ্রাসা, দক্ষিণ সুরমা, সিলেট।
Reporter Name 



























